কওমি সনদের স্বীকৃতি কতটা ভালো, সেটার জন্য অপেক্ষা করতে হবে —অধ্যক্ষ আ. খ. ম. আবুবকর সিদ্দীক

বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান দিয়েছে। সনদের এই স্বীকৃতির কারণে কওমি মাদরাসার শিক্ষাধারার ঐতিহ্যে কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে কি না, এ বিষয়ে মতামত নেওয়ার জন্য ইসলাম টাইমসের পক্ষ থেকে একটি বিখ্যাত আলিয়া মাদরাসার প্রিন্সিপালের সঙ্গে যোগাযোগ করার সিদ্ধান্ত হয়। সে হিসেবে কথা হয় দারুননাজাত সিদ্দীকিয়া কামিল মাদরাসা ঢাকা-এর প্রিন্সিপাল অধ্যক্ষ আ. খ. ম আবুবকর সিদ্দীকের সঙ্গে। তার সেই বক্তব্য নিয়েই এই মুখকলাম।

সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্সের (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান প্রদান করেছে। দীর্ঘদিন থেকে কওমি মাদরাসা বোর্ড (বেফাক) এটির দাবি জানিয়ে এসেছে। ওলামায়ে কেরাম চেয়েছেন, সিলেবাসে কোনো পরিবর্তন ছাড়াই যেন সরকার তাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি সম্মানজনক স্বীকৃতি প্রদান করে। অনেক দিন পরে হলেও সরকার সেটি দিয়েছে। এবং কওমি ওলামায়ে কেরাম যেভাবে চেয়েছেন সেভাবেই দিয়েছে। এটিকে আমি কওমি মাদরাসা বোর্ড ও কওমি ওলামায়ে কেরামের প্রাথমিক বিজয় মনে করি।

কওমি মাদরাসার জন্য সরকারি স্বীকৃতি একটি সাফল্যময় অর্জন। তবে এটি  কতটা সাফল্য বয়ে আনবে এখনই বলা যাচ্ছে না। সামনে হয়তো ব্যাপারটি আরো পরিষ্কার হবে। আপাতত যেটা হয়েছে সেটাকেই ইতিবাচক মনে করি। এর মাধ্যমে সরকারের সঙ্গে তাদের একটা সুসম্পর্ক হয়েছে। কওমি মাদরাসাগুলো সরকারের স্বীকৃতিতে এসেছে। কওমি অঙ্গন তো কোনো ছোটখাটো অঙ্গন নয়। একটা বিশাল অঙ্গন। সনদের স্বীকৃতির মাধ্যমে এই অঙ্গনটা সরকারি তালিকায় এসেছে। কওমির জন্য এটা একটা বড় দিক। অবশ্যই ভালো দিক। তবে কতটা ভালো সেটার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

স্বীকৃতি এখন যেভাবে আছে এখন পর্যন্ত এতে খারাপের কিছু নেই বলেই মনে হচ্ছে। বাকি সিলেবাসে কোনো পরিবর্তন করা ছাড়া এই স্বীকৃতি বহাল থাকবে কি না, থাকলেও কতদিন থাকবে, সেটা একটা আশঙ্কার কথা। বিষয়টি আরও ভালোভাবে বুঝা যাবে সময় গেলে। অনেক সময় রাজনৈতিকভাবেও অনেক সিদ্ধান্ত হয়। কওমি সনদের স্বীকৃতি সে-রকম কিছু কিনা সেটাও এখনই বলা যাচ্ছে না।

আমি বলব, সনদের স্বীকৃতি কওমি মাদরাসার জন্য একটি আশার বিষয়। সেইসঙ্গে আশঙ্কারও। বর্তমানে আলিয়া মাদরাসাগুলোতে পড়ালেখার মানগত বিপন্নতা চলছে। দীনি স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলার বিপর্যয় চলছে। আলিয়া মাদরাসাগুলো তো একসময় এমন ছিল না। আজকে অধিকাংশ আলিয়া মাদরাসায় পর্দা-পুশিদা নাই। আরও নানা রকম সমস্যা। প্রথমদিকে আলিয়া মাদরাসাগুলোতে এ ধরনের কোনো সমস্যা ছিল না। এগুলো তো অনেক পরে হয়েছে। তখন কেউ আজকের এই বিপর্যয়ের আশঙ্কাও করেননি। কিন্তু সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা গ্রহণ করায় আলিয়া মাদরাসাগুলো ধীরে ধীরে আজকের এই পরিণতিতে এসে দাঁড়িয়েছে। আমার আশঙ্কার কথা হলো, সনদের স্বীকৃতি যেন কওমি মাদরাসাকে আলিয়ার পরিণতির দিকে নিয়ে না যায়। বরং স্বীকৃতি পাওয়ার পরেও কওমি মাদরাসা যেন তার আদর্শের ওপর অটুট থাকে।

সরকার তো সনদের স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু কওমি মাদরাসাগুলো যদি নিজেদের পড়ালেখার মান উন্নয়ন না করে, সার্টিফিকেটের মান রক্ষা না করে, তা হলে এটা একটা চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। অন্যরা যখন এ বিষয়টা দেখবে এবং আঙুল তুলবে তখন তো কওমি সনদের মানের বিষয়টা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে।

আমি আশা করব, সরকারি স্বীকৃতির কারণে যেন কওমি শিক্ষাধারায় কোনো অবক্ষয় না আসে, এ ব্যাপারে কওমি ওলামায়ে কেরাম মনোযোগী হবেন। সনদের যেন কোনো অপব্যবহার না হয় এ ব্যাপারে সচেতন থাকবেন। কওমি মাদরাসার পড়ালেখা যেন আরও মানসম্পন্ন হয় সেদিকে খেয়াল রাখবেন। কেউ যেন কোনো বিষয় চাপিয়ে দিয়ে কওমির ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা নষ্ট না করতে না পারে এ বিষয়ে তারা সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবেন।

অনুলিখন : সাদ আবদুল্লাহ মামুন