এইমাত্র কাউসার মাহমুদ একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়লেন। অফিসে কাজের ফাঁকে একটা বই নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলেন। এক সহকর্মী এসে জানতে চাইলেন, কী পড়েন ?
: গল্পের বই। সহকর্মী বইয়ের উপর উঁকি দিয়ে বললেন, ‘পর্ব সিস্টেম’ না ‘একটানা’?
ছোটগল্প যখন ‘পর্ব সিস্টেম’ আর উপন্যাস বা বড় গল্প ‘একটানা’ তখন সাহিত্যের কথা মুখে কেন মনে আনাও তো পাপ। কাউসার মাহমুদের মুখে তাই কোনো কথা এল না। নিঃশ্বাসটা দীর্ঘ হল শুধু। সব সহকর্মীর অবস্থা প্রায় একই। পার্থক্য উনিশ-বিশের। বেতন, বোনাস, ইনক্রিমেন্ট, সন্তান, সন্তানের স্কুল, ভবিষ্যৎ, বড়জোর কোনো টিভি সিরিয়াল ছাড়া অন্য কোনো আলাপে তাদের মন লাগে না বললেই চলে। তাতে কোনো অসুবিধা নেই। আজন্ম পরিচিত এই শহরে ভালোই আছেন কাউসার মাহমুদ। স্ত্রী, সন্তান, সংসার, থাকার একটু জায়গা, ব্রহ্মপুত্রের বিশুদ্ধ বাতাস সবই আছে তার। শুধু পুরনো সেই দিনগুলোর কথা মনে হলেই মন হঠাৎ কেমন করে ওঠে। সেই দিনগুলো ‘অপচয়’ না ‘অর্জন’ তা নিয়েও দ্বিধায় পড়ে যান মাঝে মাঝে।
পড়ালেখা শেষে সবাই যখন ঝাপিয়ে পড়ল চাকরির পিছনে কাউসার মাহমুদ তখন ঝাপিয়ে পড়লেন লেখা ছাপানোর পিছনে। সবাই বায়োডাটা নিয়ে দৌড়াচ্ছে এক অফিস থেকে অন্য অফিসে, কাউসার মাহমুদ গল্প হাতে নিয়ে দৌড়াচ্ছেন এক পত্রিকা অফিস থেকে অন্য পত্রিকা অফিসে। দৌড়াতে দৌড়াতে কিছু গল্প ছাপাও হল। আহ, কী যে আনন্দে ভেসে যেত মন, যেদিন লেখা ছাপা হত। একদিন তো একসঙ্গে তিন পত্রিকায় তিনটি লেখা ছাপা হয়ে গেল। আনন্দের বন্যায় ভেসে গেল সব। রিকশাওয়ালার পাঁচ টাকার ভাড়া পনের টাকা হয়ে গেল।
এভাবে দৌড়াতে দৌড়াতে কিছু লেখক-বন্ধু জুটে গেল। কবি, ছড়াকার, গল্পকার। কথায় কথায় দিন হয়ে যায় রাত। রাত হয়ে যায় গভীর রাত। তবু ঘরে ফিরতে চায় না মন। কী নেশা-ধরা দিনই না ছিল সেগুলো। তাদের কেউ একেবারেই নিভে গেছেন। এখন ব্ল্যাকহোল (যেমন : কাউসার মাহমুদ)। কেউ সবচেয়ে দূরবর্তী তারার মতো মিটমিট জ্বলছেন। কিন্তু শুকতারা হতে পারেন নি কেউ।
সেসময় একদিন কমলাপুর স্টেশনে এক ক্লাসমেটের সঙ্গে দেখা কাউসার মাহমুদের। তার ডান হাতে একটা ব্যাগ, বাম হাতের বুড়ো আঙুলটি ধরে আছে ফুটফুটে একটা মেয়ে। গা ঘেষে দাঁড়ানো সাজগোজ করা মেয়েটি যে এই মেয়ের মা তা বুঝিয়ে দেওয়ার আগেই বুঝে গেলেন কাউসার মাহমুদ।
বন্ধুটি বলল, কী খবর বন্ধু, বিয়ে করেছ?
: না, এত তাড়াহুড়া কীসের?
: এখনো তাড়াহুড়া বলছ, তা হলে ‘দেরিটা’ কবে হবে? কাউসার মাহমুদ বোকার মতো তাকিয়ে রইলেন। তাই তো। সময় তো কম যায় নি। বউ পাশে পাওয়ার ব্যাপারটা তো মন্দ না। তারও এমন একটা বউ, একটা, দুটো ছেলেমেয়ে থাকতে পারত। কাউসার মাহমুদের মনে হল সাহিত্যের সাথে একজন সাথীও দরকার। চাকরির চিন্তা, চেষ্টা যে ছিল না তা নয়। চেষ্টা আরো বাড়ালেন। পড়ার পাশাপাশি চাকরির পড়াশোনাও করতে লাগলেন। একদিন একটা চাকরি জুটেও গেল। সেই চাকরি নিয়ে এই শহর, সেই শহর করতে করতে এখন এই শহরে। ব্রহ্মপুত্রের তীরে।
অফিস থেকে বাড়ি ফিরলেন কাউসার মাহমুদ। হাত-মুখ ধুয়ে সোফায় বসলেন আরাম করে। চায়ের সঙ্গে টা হিসেবে জুটল আলুর চপ। দুটোই স্ত্রীর হাতের তৈরি। কাউসার মাহমুদ তাকিয়েই আরাম পেলেন। মুখে দিয়ে আরো। চপটা খেয়ে চায়ের কাপটা ঠোঁটের কাছে নিতে নিতে বাম হাতে টিভির রিমোটটা টিপে দিলেন। উদ্দেশ্য সারা দিনের খবরাখবরটা একটু জানা। খবর জানা এখন কত সহজ। রিমোট টিপে দিলেই হল। চ্যানেল পাল্টে নিউজ চ্যানেলে চলে গেলেন তিনি। কিন্তু সেখানেও বিজ্ঞাপন। হঠাৎ টিভি স্ক্রলে চোখ আটকে গেল কাউসার মাহমুদের। ছড়াকার শিহাব সুমন মারা গেছেন। ঠোঁট থেকে চায়ের কাপ পিরিচে নেমে গেল বিনা চুমুকেই। রিমোট টিপে এই চ্যানেল সেই চ্যানেল দৌড়েও বাড়তি তেমন কিছু জানা গেল না। শুধু জানা গেল মৃত্যুকালীন বয়সটা। মাত্র ৩৯ বছর। টিভির ভলিউম কমিয়ে কাউসার মাহমুদ ঝিম মেরে বসে রইলেন। কাপে চা ঠান্ডা হতে থাকল। মানুষের চলে যাওয়াটা বিস্ময়কর কিছু না হলেও সুমনের চলে যাওয়াটা বিস্ময়করই মনে হচ্ছে তাঁর কাছে। শিহাব সুমন একটা কিশোর পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন এক সময়। তখন কাউসার মাহমুদের বেশ কিছু গল্প ছেপেছিলেন তিনি। সেই সুবাদে ঘনিষ্ঠতাও হয়েছিল। সেই সুমন চলে গেলেন! মৃত্যু এত সহজ!
স্ত্রী এসে বলল, কী ব্যাপার চা খাও নি কেন? চা তো বরফ হয়ে গেছে। কাউসার মাহমুদ টিভির পর্দায় চোখ রেখেই বললেন, শিহাব সুমন মারা গেছেন।
: শিহাব সুমন কে?
: ওই যে ছড়া লিখতেন। তোমাকে বলেছিলাম তো উনার কথা। আমাদের বিয়েতেও তো এসেছিলেন। ওই যে দেখ টিভি স্ক্রলে দেখাচ্ছে।
: তাই নাকি! কী হয়েছিল?
: কি জানি। : চা গরম করে দেব?
: না থাক। বস। পাঁচ মিনিট পর খবর হবে। দেখি কী বলে। খবরেও তেমন কিছু জানা গেল না। শুধু জানা গেল একটা দৈনিকে তিনি কাজ করতেন। অফিসে কর্মরত অবস্থায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে সহকর্মীরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু নেয়ার আগেই সব শেষ। সুদর্শন সুমনের কয়েকটা ছবিও দেখাল। মনটা আরো হাহাকার করে উঠল।
কাউসার মাহমুদ টিভি বন্ধ করে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লেন। তারাশঙ্করের বাসন্তীর মতো তারও মনে হল, ‘জীবন এত ছোট কেনে’।
সুমনের খবরটা বিস্তারিত জানার জন্য মন অস্থির হয়ে গেল। কী করা যায়? কারো মোবাইল নম্বরও নেই যে যোগাযোগ করবেন। অনেকটা ইচ্ছে করেই বিচ্ছিন্ন ছিলেন কাউসার মাহমুদ।
সন্ধ্যার দিকে পুরনো একটা টেলিফোন ইন্ডেক্স পাওয়া গেল বিছানার নিচে। সেখানে দুটো মোবাইল নম্বর আছে যারা সুমনের খবর দিতে পারবে হয়তো। কিন্তু নম্বরগুলো পুরনো। ১০ ডিজিটের। আরো একটা ১ বা ২ যোগ করে চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।
১ যোগ করে একটা নম্বরে ফোন করলেন কাউসার মাহমুদ। বাহ, রিং হচ্ছে। হ্যাঁ, ধরেছেন।
: কাউসার মাহমুদ বলছি। চেনা যায়?
: কী যে বলেন কাউসার ভাই। আপনাকে চিনব না। ১০০ বছর পরে ফোন করলেও আপনাকে ঠিকই চিনে ফেলব। হা হা হা। তারপর কেমন আছেন? বহু দিন পর। বলে, থামলেন আহসান কবির।
: দিন নয়, দিন নয়, বলেন বছর।
: হ্যাঁ, বছরই তো। বলেন, আপনার খবর বলেন।
: আমার আর খবর কী। মফস্বলের মানুষ আমি। ঢাকার খবর বলেন। শিহাব সুমন তো চলে গেলেন।
: হ্যাঁ। : বিয়ে করেছিলেন?
: হ্যাঁ, একটা মেয়েও আছে।
: ইশ্! আচ্ছা, কী হয়েছিল সুমনের?
: হার্টের সমস্যা ছিল। : চিকিৎসা করান নি?
: করিয়েছিলেন বোধহয়। এর আগেও তো একবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। কলিগদের সহায়তায় আল্লাহর রহমতে বেঁচে গেছেন তখন।
: তা হলে তো তাঁর সতর্ক হয়ে চলা উচিত ছিল।
: হ্যাঁ, সেটাই তো কথা। উনি তো আসলে নিজেই নিজের সর্বনাশ করেছেন।
: মানে? : থাক কাউসার ভাই। যিনি চলে গেছেন তার দুর্নাম নাইবা করলাম।
: না, একটু বলেন। আমার খুব জানতে ইচ্ছে হচ্ছে। অমন তরতাজা মানুষটা কেমন করে চলে গেলেন।
: আপনি তো অনেক আগে দেখেছেন। শেষে আর তরতাজা ছিলেন না।
: অ্যাডিক্টেট হয়ে পড়েছিলেন নাকি।
: হ্যাঁ। সুমন আসলে লাইনচ্যুত হয়ে পড়েছিলেন। ধার-দেনার কারণে অনেক বন্ধুরাও সরে গিয়েছিল। কেউ কেউ চেষ্টা করেছেন, ফেরাতে পারেন নি।
কাউসার মাহমুদ ফোন রেখে দিলেন। বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে সদ্য রঙ করা ধবধবে শাদা ছাদটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কোত্থেকে যেন একটা মাকড়শা এসে শাদার উপর একটা কালো দাগ হয়ে বসে রইল। মানুষের জীবনের এই কালো দাগ মুছে ফেলার জন্য কত ছড়াই না লিখে গেলেন শিহাব সুমন। কিন্তু নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় কালো দাগটাই মুছতে পারলেন না।
















