জামাল খাশোগির অন্তর্ধান ইস্যুতে যা কিছু ঘটতে পারে

সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর ।।   

সৌদি সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী জামাল খাশোগির ঘটনা নিয়ে ট্রাম্প এবং পশ্চিমা প্রশাসন দারুণ বেকায়কায় পড়ে গেছে। ট্রাম্প প্রশাসন আগে থেকেই যুবরাজ ইস্যুতে কিছুটা নাকাল। এ কারণে মিডিয়ার সামনে সৌদি আরব বা যুবরাজ মুহাম্মদ সম্পর্কে মাঝে মাঝে কিছু অত্যুক্তিও ট্রাম্পকে করতে হয়। যেমন সপ্তাহ দুয়েক আগে সৌদির সঙ্গে তার মাখামাখি লুকাতে তিনি সগৌরবে বলেছিলেন, আমেরিকার সাহায্য ছাড়া সৌদি আরব দুই সপ্তাহও টিকবে না। প্রত্যুত্তরে যুবরাজ বলেছিলেন, আমেরিকার কোনো প্রকার সাহায্য ছাড়াই সৌদি আরব দুই হাজার বছর টিকে থাকবে।

এগুলো এক অর্থে কথার কথা। এসব কথার কোনো বাজারমূল্য নেই। বিশ্বরাজনীতির এই দুই খেলুড়ে নিজ দেশ এবং বিশ্বের মানুষের আবেগকে কব্জায় রাখতে এসব কথা মাঝে মাঝে বলে থাকেন। তবে হঠাৎ হঠাৎ বেকায়দায় পড়ে যাওয়ার মতো যেসব ঘটনা ঘটে, সেগুলো সামাল দেয়া শক্ত হয়ে দাঁড়ায়। জামাল খাশোগির ঘটনা তেমনই বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে উভয়ের দেশের শীর্ষ নেতৃত্বকে।

যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান সম্প্রতি সৌদি আরবে যেসব সাহসী (?) উদ্যোগ নিয়েছেন, যেমন সিনেমা হল চালু করা, মেয়েদের গাড়ি চালানোর অনুমতি প্রদান, পাবলিক প্লেসে মেয়েদের অংশগ্রহণ, টিভিতে নারীদের সংবাদপাঠ এবং আরও কথিত পশ্চিমা আধুনিক উদ্যোগ তিনি গ্রহণ করেছেন, সেসবের জন্য তিনি পশ্চিমা বিশ্বে বেশ বাহবা পেয়ে আসছিলেন। রাজনৈতিক পরিমণ্ডল থেকে শুরু করে পশ্চিমা জনগণও তাকে ব্রাভো ব্রাভো করে আসছিল। তিনিও বেশ ঘটা করে আমেরিকা-জাতিসংঘসহ বিভিন্ন জায়গায় তার তোষামোদের পিঠ পেতে রেখেছিলেন।

কিন্তু যুবরাজের চেহারার আরেকটা দিকও আছে। সৌদি আরবের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদটি অধিকার করার পর থেকে তিনি তার পরিবারের সন্দেহভাজন ভাই-বেরাদর তো বটেই, তার আধুনিক মতবাদের বিরুদ্ধে যারাই বক্তব্য দিয়েছেন সবাইকে হয় চৌদ্দ শিকে ভরেছেন নয়তো দেশছাড়া করেছেন। সাম্প্রতিক সৌদি আরবে এর ব্যত্যয় ঘটেনি। অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিজীবী, আলেম, অ্যাক্টিভিস্টকে এই করাতের নিচে পড়তে হয়েছে। বিশ্বের কোথাও কোথাও তাদের নিয়ে সংবাদ পরিবেশন হয়েছে, কিন্তু হতাশ্বাস লক্ষ করা যায়নি বিশ্বমিডিয়ার চৌহদ্দিতে।

খাশোগি অন্তর্ধান বিষয় নিয়ে বেকায়দায় সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান

অনেক দিন থেকেই চলছে এই দমনের ঘটনা। কিন্তু এ দমন-পীড়নের দিকটা নিয়ে পশ্চিমারা খুব একটা রাও করেনি এতদিন। বৃহত্তর স্বার্থে তারা ক্ষুদ্রতম স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেয়ার মহান সবক অনেক আগেই শিখেছে। আধুনিক সৌদির মহান যুবরাজের অর্থনৈতিক আধিপত্যের সাম্রাজ্যে এমন পাপ হাত দিয়েই মুছে ফেলা যায়। পশ্চিমা মিডিয়া এ কাজে বরাবরই পারঙ্গম।

দুই

কিন্তু এবারকার ঘটনাটি অন্যরকম। সাংবাদিক জামাল খাশোগির অন্তর্ধানের (হত্যাকাণ্ড) ঘটনাটি ঘটেছে এমন দেশে যে দেশের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সৌদি আরব এবং যুবরাজ মুহাম্মদের সম্পর্ক বেশ শীতল। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ান ঘটনার শুরু থেকেই শক্তপোক্ত হয়ে এঁটে বসেছেন। যেদিন থেকে খাশোগির সংবাদ প্রচারমাধ্যমে আসতে শুরু করেছে সেদিন থেকে তুরস্কের অবস্থান অনড়। এই ইস্যুতে তারা যুবরাজকে যে বিন্দুমাত্র ছাড় দেবে না, সেটা তাদের গত কয়েকদিনের বক্তব্য এবং তৎপরতা দেখে বুঝা গেছে।

ব্যক্তি খাশোগি এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো অন্তর্ধানের ঘটনা। আবার অন্যদিক থেকে তিনি এখন টক অব দ্য ওয়ার্ল্ডে পরিণত হয়েছেন। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অনেক মারপ্যাঁচ আছে, স্বার্থোদ্ধারের অনেক দূরভিসন্ধি আছে, আছে আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের গভীর কূটকৌশল। ২ অক্টোবর খাশোগি অন্তর্ধানের পর দিন যত যাচ্ছে রাজনীতির নানা হিসাব নিকাশের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিষয় ততই সামনে চলে আসছে।

কাতারের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক খারাপ বছর দুই থেকে। আঞ্চলিক আধিপত্য এবং প্রতিবেশীসুলভ মোড়লিপনার ফলে সৌদি-মিশর-আমিরাত জোট দুই বছর আগে কাতারের সঙ্গে বয়কট আরোপ করে রেখেছে। মধ্যপ্রাচ্যে কাতার নতুন শক্তি। বিশ্ব রাজনীতি এবং প্রচারমাধ্যমে তার অবস্থানও বেশ শক্ত। সুতরাং মৈত্রীজোটের বয়কটের আঁচড় তার গায়ে তেমন একটা লাগেনি।

খাশোগি ইস্যুতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান রয়েছেন শক্ত অবস্থানে

এই কাতারের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক আবার জোরদার। বয়কটের ঘটনায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান দ্বিধাহীনচিত্তে কাতারের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। এছাড়াও কাতারের সঙ্গে বাণিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক নানা কাজে জড়িত তুরস্ক। যেহেতু খাশোগির ঘটনা ঘটেছে তুরস্কে এবং ঘটনার গোপন চাবিকাঠিও তাদের হাতে, সেহেতু এই ঘটনায় বদলে যেতে পারে তুরস্ক এবং কাতারের সঙ্গে সৌদি সরকারের পররাষ্ট্রীয় মনোভাব। পর্দার আড়ালের রাজনীতিতে সে ফলাফল খারাপও হতে পারে, আবার ভালো কিছুও বয়ে আনতে পারে। এরই মধ্যে সৌদি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ তুরস্কে গিয়ে দেন-দরবার শুরু করেছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে।

তিন

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে যুবরাজ মুহাম্মদের আমেরিকাতোষণ এবং ধর্ণা দেয়ার প্রবণতা এ অঞ্চলের কেউই ভালো চোখে দেখে না। কোনো মুসলিম দেশই যে আমেরিকাকে তাদের বন্ধু ভাবে না, এ কথা অজানা কিছু নয়। কিন্তু মুসলিম দেশগুলো কামনা করে মুহাম্মদের এই তোষণ-প্রবণতা সীমার মধ্যে থাকুক। পশ্চিমা তোষণ এবং সব কাজে তাদের সম্পৃক্ততা থেকে বেরিয়ে এসে সৌদি আরব এ অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলোর অভিভাবকের পদ গ্রহণ করুক।

‘সৌদ সাম্রাজ্য’ প্রতিষ্ঠার পর গত প্রায় এক শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিচয়ে খুব একটা আগ্রহ নেই যুবরাজের। পবিত্র হারমাইনের রক্ষণাবেক্ষণকারী হিসেবে মুসলিমবিশ্বের অভিভাবক হওয়ার মতো ধর্মীয় পরিচয়ও তার কাছে মুখ্য কোনো বিষয় নয়। তিনি এমন এক আরবের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন যে আরব পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে চোস্ত ইংরেজিতে হলিউডীয় সিনেমা বানাবে। সেখানে টিপিক্যাল মুসলিম পরিচয়ে আবদ্ধ থাকাটা তার জন্য বড় বেমানান হবে-এটা তো স্বাভাবিক বিষয়।

কিন্তু যুবরাজ মুহাম্মদ যে পথে পা বাড়িয়েছেন, সে পথ থেকে তিনি ফিরে আসতে পারবেন কিনা, সেটা ধোঁয়াশায় ঘেরা। কেননা যুবরাজের আধুনিক সৌদি গড়ার সুদূরপ্রসারী উচ্চাভিলাষ পূরণে আমেরিকার ছায়া ছাড়া গতি নেই।

চার

এখন কথা হলো, খাশোগির ঘটনায় আমেরিকা যদি সৌদির নাটাই ছেড়ে দেয় তাহলে কি যুবরাজ প্রশাসন সত্যি কোনো বিপাকে পড়বে? তারও আগের প্রশ্ন : যদি খাশোগির ঘটনায় সৌদি আরব এবং যুবরাজ মুহাম্মদ দোষী হিসেবে প্রমাণিত হন তাহলে কি আমেরিকা যুবরাজের গলা থেকে রক্ষাকবচ খুলে ফেলবে? কিংবা আমেরিকার বিমাতাসুলভ আচরণ দেখলে সৌদি যুবরাজের মোহ কি ভঙ্গ হবে? হলে তার প্রভাব কী হবে?

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি খাশোগি ইস্যুতে কড়া মন্তব্য করেছেন

আন্তর্জাতিক রাজনীতি হল Give & Take-এর রাজনীতি। এখানে মানুষের জীবন, দেশপ্রেম, নৈতিকতা, ধর্ম-সব বিকোয় রাজনৈতিক স্বার্থে। এ কথা মাথায় রেখে বলা যায়, খাশোগিকে নিয়ে এরই মধ্যে রাজনীতির কৌশলী আলাপ শুরু হয়ে গেছে। রাজনীতিবিদ হিসেবে মুহাম্মদ হয়তো এরদোয়ানের মতো তুখোড় নন, কিন্তু বৈশ্বিক রাজনীতিতে তার অবস্থানও ফেলনার নয়। অন্যদিকে তার মিত্র হিসেবে আমেরিকা এবং ব্রিটেন-ফ্রান্স তাকে সঙ্গ দিতে প্রস্তুত থাকবে। এ ঘটনার ‘সহিহ’ মীমাংসার ফিস হিসেবে পশ্চিমারাও যুবরাজের কাছ থেকে উসুল করে নেবে নতুন কোনো ব্যবসায়িক লাভ কিংবা অস্ত্র কেনাবেচার নতুন কোনো চুক্তি।

সবদিক বিবেচনায় বলা যায়, খাশোগির অন্তর্ধানের বিষয়টি পর্দার সামনে মীমাংসা হওয়ার চেয়ে পর্দার অন্তরালেই মীমাংসা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এতে ঘটনা মোড় নিয়ে বলির পাঁঠা বানানো হতে পারে নির্দোষ কাউকে।

বাদবাকি মীমাংসা না হলে সৌদি-তুরস্ক সম্পর্ক আগের চেয়ে আরও শীতল পর্যায়ে নেমে যাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর আমেরিকা? আমেরিকা আগেও যেমন ‘মহান’ ছিল, তেমনি মহানই রয়ে যাবে। আমেরিকার গায়ে কখনো পাপের আঁচড় লাগে না। এটাই এখন এই পৃথিবীর নিয়ম।

 

পূর্ববর্তি সংবাদকীটনাশকের অভাবে খুলনায় নষ্ট হচ্ছে ৩০ হাজার মেট্রিক টন গম
পরবর্তি সংবাদনভেম্বরে ঢাকায় জাতীয় সমাবেশ করবে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম : শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বৈঠকে সিদ্ধান্ত