আবরার আবদুল্লাহ ।।
পৃথিবীর বুকে জেরুজালেম একমাত্র নগরী যা একই সঙ্গে তিনটি পৃথক ধর্মাবলম্বীদের নিকট পবিত্র। ইহুদিদের বিশ্বাস এখানে স্থাপিত হয়েছিলো প্রথম পবিত্র মন্দির। খ্রিস্টানদের বিশ্বাস হজরত ঈসা আ. শূলে চড়ানোর পর এখানে আবির্ভূত হন। আর মসজিদুল আকসা মুসলমানের প্রথম কিবলা ও হজরত মুহাম্মদ সা. এর মেরাজ গমনের সময় যাত্রা বিরতির স্থান হিসেবে পবিত্র।
ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরূপ এ শহরটি এভাবেই কোটি মানুষের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে যারা কখনও জেরুজালেমকে দেখেনি। হয়তো কখনো দেখবে না। কিন্তু জেরুজালেমকে তারা নিজেদের মতো করে ভাবতে চায় এবং দেখতে চায়। এ প্রত্যাশাই ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংকট সমাধানের পথে বাধা এবং শহরের সবকিছুতে রাজনীতি টেনে এনেছে। কারণ, তাদের প্রতিনিধিত্ব করছে শহরের অধিবাসীরা।
প্রত্যাশার এই সংঘাত ও তার রাজনৈতিক প্রতিফলনের মধ্যেও প্রাচীন জেরুজালেম শহর তার ব্যস্ত বাজার ও স্পন্দনশীল সড়ক নিয়ে এখনো বেঁচে আছে। তবে আবদ্ধ শহরের মুখ থেকে কখনও দুশ্চিন্তার ছাপ মুছে যায়নি। শহরের বুকে দাঁড়ালে জেরুজালেমের পবিত্রতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে গালগল্প ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না। খুব কম সংখ্যক ফিলিস্তিনি এ বিষয়ে একমত হবে যে, পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের কাছে জেরুজালেমের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। তারা এ শহরকে পবিত্র মনে করে। যদিও ফিলিস্তিনিরা এখনো জেরুজালেমকে তাদের রাজধানী হিসেবে দেখতে চায়।
কেন তাদের হতাশা? কারণ তারা দেখছে একটি শহর তার জীবন রক্ষায় প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছে। তার সবকিছুতেই যুদ্ধ ও রাজনীতি চড়াও হয়েছে। এমনকি খাদ্যাভাস নিয়েও বিতর্ক হচ্ছে সেখানে। যা একটি শহরের একান্ত পরিচয়, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে ধারণ করে।
ফিলিস্তিনিদের জন্য -যাদের রাষ্ট্র ও জাতীয় পরিচয়কে অস্বীকার করা হয় এবং যারা সাংবিধানিকভাবে নিগৃহীত- তাদের জন্য খাবার এখন আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এমনকি অর্ধেক আরব -যারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছে এবং যাদের পিতা ও পিতামহ আরবদের সঙ্গে বসবাস করতো, আঞ্চলিক অনেক সংস্কৃতির মতো একই খাদ্যে অভ্যস্ত ছিলো- তারাও রাজনৈতিক পরিচয়ের সামনে তাদের খাদ্যাভাসসহ আরবীয় সংস্কৃতি খুব সহজেই বিসর্জন দিয়েছে।
ভূখণ্ড কেড়ে নেয়ার পর ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে সাংস্কৃতি যুদ্ধ। আরবীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে উপড়ে ফেলতেই নতুন যুদ্ধের সূচনা করেছে ইসরাইলিরা। তবে কেউ আত্মসমর্পণ করছে না। যেমন শত বছর যুদ্ধ করে, অবিরাম হেরে গিয়েও আত্মসমর্পণ করেনি মুসলিম আরবরা।
জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলিরা খাদ্যকে তাদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের বাহক হিসেবে গ্রহণ করেছে; বলা যায় সবকিছুকেই।
একজন নবাগত যখন এ শহরে আসে তখন যুদ্ধটা প্রকট হয়। ইসরাইলি ইহুদি, ফিলিস্তিনি মুসলিম, আর্মেনিয়ান ও ফিলিস্তিনি খ্রিস্টান সবাই নিজ নিজ বিশ্বাস ও পরিচায়ক খাদ্য দ্বারা আপ্যায়ন করে এবং নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও রীতির সঙ্গে পরিচিত করার চেষ্টা করে। যা তাদের হৃদয়ের বিভক্তিকে স্পষ্ট করে তোলে।
ভাগ্যাহত আরব মুসলিমরা পারবে তো এ যুদ্ধে টিকে থাকতে?
তথ্যসূত্র : আল জাজিরা
















