ইসলাম টাইমস ডেস্ক ।।
প্রচণ্ড খরা ও অনাবৃষ্টির কারণে আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা দিয়েছে মানবিক বিপর্যয়। খরার প্রভাবে জীবনযাপন অসাধ্য হওয়ায় গৃহছাড়া হচ্ছে হাজার হাজার আফগানি। সরকারি বাহিনী এবং তালেবানের মধ্যকার সংঘাতের কারণে এ বছর যত লোক গৃহহীন হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি লোক গৃহছাড়া হয়েছে কয়েক মাসব্যাপী খরার দরুণ।
আফগানিস্তানের হেরাত থেকে বিবিসির সাংবাদিক সিকান্দার কিরমানির এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানা যায়।
সাদি মুহাম্মদ নামের ৭০ বছর বয়সী এক আফগান বৃদ্ধ আফগানিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের হেরাত আশ্রয় শিবিরে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলছিলেন তার অবর্ণনীয় দুর্দশার কথা।
‘ক্ষুধা-তৃষ্ণায় আমাদের জীবন ওষ্ঠাগত। বাড়ি থেকে সামান্য জিনিসপত্র নিয়ে পথে নেমেছিলাম, বাদবাকি সব ছেড়ে এসেছি বাড়িতে। পথে আসতে আসতে সঙ্গে আনা সামান্য জিনিসও খোয়াতে হয়েছে। এখন আমাদের কাছে আর কিছুই নেই। এখানের একটা ছোট তাবুতে আমাদের আট জনের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে।
‘আমার স্ত্রী এবং ভাই পথিমধ্যে মারা গেছে। ছেলেমেয়ের কয়েকজনকে সাথে আনতে পেরেছি, বাকিরা পেছনে রয়ে গেছে।’
খরার কারণে আফগানিস্তানের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার মানুষ তাদের বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছে। এসব এলাকায় পানি নেই, ফসল ফলানোর জমিতে বৃষ্টি হচ্ছে না অনেক দিন থেকে। ফলে এলাকাগুলোতে দেখা দিয়েছে মানবিক বিপর্যয়। দুর্ভিক্ষের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ায় লোকজন নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয় নিচ্ছে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে।

২০০১ সালে আমেরিকা নিয়ন্ত্রিত বাহিনী কর্তৃক আফগানিস্তানে তালেবানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রতি বছর বহু মানুষ তাদের বাড়িঘর ছেড়ে বিভিন্ন শরণার্থী শিবির, আশ্রয়কেন্দ্র বা পুনর্বাসনকেন্দ্রে আশ্রয় নেয়। তবে খরার কারণে এ বছর যে যে পরিমাণ মানুষ গৃহছাড়া হয়েছে, তা এই সতেরো বছরে সর্বোচ্চ পরিমাণ।
উল্লেখ্য যে, ২০০১ সালের হামলার পর তালেবান কর্তৃপক্ষ বর্তমান সময়ে আফগানিস্তানের সবচেয়ে বেশি অঞ্চল দখল করে নিয়েছে।
হেরাতে জাতিসংঘের খাদ্য কর্মসূচির ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন কাদির আসেমি। তিনি বলেন, ‘এখানে কাজ করার অভিজ্ঞতা ভয়াবহ। কারণ বিপর্যয় মারাত্ম আকার ধারণ করেছে।’
জাতিসংঘ দুর্যোগ কবলিত প্রায় ২২ লাখ আফগানির জন্য সাড়ে তিন কোটি ডলার ত্রাণ সহযোগিতা প্রদান করছে। বর্তমানে জাতিসংঘের খাদ্য কর্মসূচি খরা কবলিত মানুষের মাঝে খাবার কেনার জন্য অর্থসাহায্য প্রদান করছে।
হেরাত আশ্রয়কেন্দ্রের সামনে আগত মানুষদের জন্য খোলা হয়েছে নিবন্ধনকেন্দ্র। নিবন্ধকেন্দ্রের পাশে চার সন্তানসহ বসে ছিলেন এক আফগান নারী। কথা বলে জানতে পারলাম তিনি এসেছেন উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ ফারিয়াব থেকে।
তিনি বলছিলেন, ‘যদি আমাদের কাছে টাকা থাকতো তবে কখনোই এই আশ্রয়কেন্দ্রে আসতাম না। আমাদের ওখানে এক বছর ধরে বৃষ্টি হয় না। সবকিছু শুকিয়ে ঠনঠনে। নলকূপ, নদী বা কুয়ায় পানি নেই। শিশুদের মুখে দেয়ার মতো পানিও পাওয়া যায় না। তাছাড়া তালেবান আর সরকারি বাহিনীর মাঝে লড়াই তো লেগেই আছে।’

অন্য আরও অনেকে বলছিলেন তাদের দুর্দশার কথা। তারা জীবন বাঁচাতে বেচে দিয়েছেন তাদের গবাদি পশু কিংবা ধার-দেনা করে চলেছেন এতদিন। কিন্তু কৃষিই ছিল তাদের আয়ের অন্যতম উৎস। খরা ও অনাবৃষ্টির কারণে প্রায় এক বছর ধরে তাদের জমিতে কোনো ফসল ফলছে না। ফলে তারা সবাই প্রায় নিঃস্ব হয়ে গেছেন।
আগামী ২০ অক্টোবর আফগানিস্তানে অনুষ্ঠিত হবে সংসদ নির্বাচন। অথচ অধিকাংশ মানুষ দাবি করছেন, রাজনৈতিক নেতারা তাদের সমস্যা বিষয়ে তেমন কোনো উদ্যোগই গ্রহণ করছেন না।
এর মধ্যে দরজায় কড়া নাড়ছে আরেক সমস্যা। খুব শিগগির শুরু হবে শীত মৌসুম। কাদির আসেমি আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, আফগানিস্তানের শীত খুবই ভয়াবহ। এ সামান্য তাঁবুতে এত মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকবে, সেটা ভাবতেই শিউরে উঠছি। গত ১৮ বছরে এমন মানবিক বিপর্যয় আর দেখা যায়নি। একমাত্র আল্লাহর সাহায্য ছাড়া এখন আর কোনো উপায় নেই।
।। বিবিসি অবলম্বনে
















