মাওলানা জাহেদ রাশিদি ।।
ঈমানি বিষয়ে সংশয় ও সন্দেহ বর্তমান সময়ের বড় ধরনের একটি ফেতনা। একটি মন ও মানসগত সংকট। বর্তমান আধুনিক শিক্ষিতদের অনেকেই এ ফেতনার শিকার। এটাকে চিন্তা ও মানসগত ধর্মান্তরও বলা হয়। হজরত মাওলানা সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদভি রহ. ‘ধর্মান্তরের ঝড় বইছে, নেই কোনো আবু বকর’ শিরোনামে একটি পুস্তিকা লিখে এ বিষয়টার দিকেই উম্মতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। চিন্তা ও মানসিক ধর্মান্তর বিশ্বব্যাপী দিন দিন বাড়ছেই। এর একটা বড় কারণ ও ভিত্তি, ধর্মীয় জ্ঞানের প্রতি অনীহা এবং আধুনিক জ্ঞানের ব্যাপকতা।
আধুনিক জ্ঞানের রাজ্য ও পরিধি ক্রমাগত বিপুল ও ব্যাপক হচ্ছে। অপরদিকে ইলমিচর্চা ও আলোচনা সীমিত ও সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। ফলে জ্ঞান-বিজ্ঞানকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পর্যালোচনা করা এবং আধুনিক প্রজন্মকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে জ্ঞান ও চিন্তা বিষয়ে পথনির্দেশ করার বিষয়টি জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এ বিষয়ে আমাদের মাদরাসাগুলো সতর্কতা ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মনোযোগী হতে পারছে না।
হাকিমুল উম্মত হজরত থানভি রহ. এ বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, মুতাকাল্লিমরা যেই ইলমে কালাম (যুক্তিবিদ্যা) উদ্ভাবন করেছেন তাতে সবকিছুই রয়েছে। তাদের নির্ধারণ করা রীতি-নীতি দ্বারাই সব ধরনের সংশয় ও সন্দেহের জবাব দেওয়া যায়। এর ওপর ভিত্তি করেই আধুনিক যুক্তিবিদ্যা বা দর্শনশাস্ত্র সহজেই উদ্ভাবন করা যায়।
আমি নিজের থেকেই আমার জানা বেশ কিছু দ্বিধা-সন্দেহের জবাব লিখে ‘আল-ইনতিবাহাতুল মুফিদাহ আনিল ইশতিবাহাতিল জাদিদা’ নামের একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছি। এতে এমন পদ্ধতি ও নীতি বলে দিয়েছি, যার দ্বারা আমার মতে এ ধরণের যত সংশয়-সন্দেহ সৃষ্টি হবে, সহজেই সেগুলোর জবাব ও প্রতিউত্তর দেওয়া যাবে।
হজরত থানভি রহ. আরও বলেন, এখন আমার মধ্যে শক্তি কোথায়? কাজের লোক তো আছে অনেক কিন্তু তারা যদি কাজ না করেন তা হলে এর সমাধান কী? আরামপ্রিয়তার দ্বারা তো কাজ হয় না। কাজ তো কাজ করার দ্বারাই হয়। ভালো-মন্দ যে রকমই হোক আমি কিছুটা দ্বীনি খেদমত করার চেষ্টা করেছি। এখন এ বিষয়ে আরও যেসব কাজ বাকি, সেটা অন্যরা করতে পারেন। তারা আমার চেয়ে আরও ভালো করতে পারবেন। কিন্তু তারা যদি ‘আজাদ আলী শাহ’ বনে বসে থাকেন তা হলে তো আর এর সমাধান নেই।
হজরত থানভি রহ. পুরনো যুক্তিবিদ্যার মধ্যে সব বিষয় থাকার পরও আধুনিক দর্শনশাস্ত্র উদ্ভাবনের প্রয়োজন অনুভব করেছেন। এবং এটির প্রাথমিক কাজও তিনি করে দিয়ে গেছেন। কিন্তু তার অভিযোগ, কাজকে আগে বাড়ানোর জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন, সেটা করা হচ্ছে না। যারা কাজ করতে পারেন তারা এখন আরামপ্রিয়তার শিকার।
হজরত থানভি রহ. বলেন, রাষ্ট্রপরিচালনার রীতি-নীতি, ডাক-যোগাযোগ ও রেল যোগাযোগ পরিচালনার নিয়ম-কানুন (পৌরনীতি) মাদরাসার সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এটি আমার বহু পুরনো অভিমত। কিন্তু কে শোনে, কে মানে! –(আল-ইজাফাতুল ইয়াওমিয়া : ৬/৫৩৪)

বর্তমানে আমাদের জন্য ভাষার ব্যাপারটিও একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইংরেজি ভাষায় মানসম্মত আলোচনা ও লেখালেখি তো একদিকে থাক, কিছু প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিলে অধিকাংশ মাদরাসায় আরবি ভাষায় আলোচনা ও লেখালেখি চর্চার তেমন কোনো ব্যবস্থাপনা নেই। এর ফলাফল হলো, আমাদের মাদরাসাগুলোর অধিকাংশ শিক্ষাসমাপনকারীরই আরবি ভাষায় আলোচনা করার এবং আরবিতে মানসম্মত লেখালেখি করার যোগ্যতা নেই। এমনকি তারা মাতৃভাষায়ও বিষয়ভিত্তিক মানসম্মত আলোচনা করা এবং কাঙ্ক্ষিত ও প্রভাববিস্তারী মানের লেখালেখি করার যোগ্যতা রাখেন না।
আমি এ বিষয়ে ‘আদআফুল ঈমান’ বা সবচেয়ে নিম্নস্তরের অর্জনীয় যে বিষয়টির কথা বলব সেটি হচ্ছে, আমাদের শিক্ষাসমাপনকারীরা কমপক্ষে মাতৃভাষায় শিক্ষিত লোকদের পরিবেশে যোগ্যতার সঙ্গে যেন আলোচনা করতে পারে এবং সংবাদের ভাষার মতো সহজ-সরলভাবে যে কোনো বিষয় নিয়ে লিখতে পারে। এমনিভাবে মিডিয়া ও সাংবাদিকতার ভাষা ও প্রকাশরীতিও যেন তারা আয়ত্ত্ব করে নেয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পৃথিবীর যেসব দেশে বেশিরভাগই অমুসলিম, সেসব দেশের মুসলমানদের আহকাম ও মাসায়েলের সমাধান দেওয়া। যেসব দেশ ও সমাজে হানাফি মাজহাবের লোক বেশি, সেখানে সাধারণ আহকাম ও বিধি-বিধান তো অবশ্যই হানাফি মাজহাবের ভিত্তিতেই হবে এবং হচ্ছে, তবে যেসব দেশে বেশিরভাগই শাফেয়ি, মালেকি, হাম্বলি বা জাহেরি মাজহাবের লোক রয়েছে, তারা তাদের মাজহাব অনুযায়ী আমল করবে।
বর্তমানে পৃথিবীর বহু দেশে মিশ্রিত সোসাইটি ও সমাজ আছে। বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোতে। অধিকাংশ দেশের অবস্থা হলো, এক মসজিদের মধ্যেই হানাফি, শাফেয়ি, মালেকি, হাম্বলি ও সালাফি মুসলমান একত্রে নামাজ পড়েন। ব্যবস্থাপনাতেও সব ধরনের লোকজন থাকেন। ওসব জায়গার মাসয়ালা-মাসায়েলের সমাধান কাদের ভিত্তিতে হবে? এবং বিভিন্ন মাজহাবের সঙ্গে সম্পৃক্ত মাসয়ালার সমাধানের জন্য সম্মিলিত ফিকহি বিধান কী হবে?
এটি একটি জরুরি বিষয়। যে বিষয়ে ফুকাহায়ে কেরাম ও মাদরাসাগুলোকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। আজকে বিশ্ব পরিস্থিতি এবং মুসলিম উম্মাহর সামগ্রিক প্রয়োজনকে সামনে রেখে তারা এ বিষয়টি নিয়ে ভাবা দরকার।
আমাদের দেশের মাদরাসায় তাখাচ্ছুছ ফিল ফিকহ বা তাখাচ্ছুছ ফিল ইফতা (উচ্চতর ইসলামি আইন অধ্যয়ন) নামে একটি বিভাগ চালু আছে। কিন্তু এটির গণ্ডি ও গন্তব্য বলা যায় নির্দিষ্ট এবং প্রকাশিত ফলাফলও সীমিত। আমাদের দেশ ও সমাজ চাহিদার বাস্তবতায় যোগ্য মুফতি তৈরির জন্য এ কোর্স খুবই উপকারী ও ফলদায়ক। অনেক মাদরাসার ইফতার নেসাব ও প্রশিক্ষণ মানসম্পন্নও বটে।
কিন্তু আজকের বিশ্ব পরিস্থিতি ও মিশ্র সোসাইটিতে বাস করা অন্যান্য (শাফেয়ি, মালেকি, হাম্বলি এবং সালাফি) মাজহাবের লোকদের সমস্যা সমাধান করার মতো সামর্থ্য আমাদের মাদরাসাগুলো থেকে ইফতার কোর্স সমাপনকারীদের মধ্যে তেমন একটা পাওয়া যায় না। অথচ এই যোগ্যতা অর্জন না হলে আমাদের মুফতি সাহেবরা আধুনিক বিশ্বে তাদের দায়িত্ব সঠিক ও পূর্ণাঙ্গভাবে পালন করতে পারবেন বলে আমার মনে হয় না।
এ বিষয়ে আমার ছাত্রসুলভ মতামত হলো, তাখাচ্ছুছ ফিল ফিকহের পাঠ্যসূচিতে উম্মতের স্বীকৃত অন্য মাজহাবের মাসয়ালাগুলো পরিষ্কারভাবে জানার পাশাপাশি বর্তমান বিশ্ব পরিবেশ-পরিস্থিতি ও বিভিন্ন দেশের সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষাপট গভীরভাবে জানাও ইফতার নেসাবের মধ্যে শামিল করা একটি জরুরি বিষয় ।

যখন যুক্তিবিদ্যা সুশৃঙ্খল হয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি এবং ফিকহ শাস্ত্রকে শুধু আহকামের সীমানায় সীমাবদ্ধ করা হয়নি, সে-সময় ফিকহ’র পরিভাষা অনেক ব্যাপক অর্থে ব্যবহার হতো। তখন ফিকহের মধ্যে ফিকহুল আকাইদ ও ফিকহুন নফস (ইসলাহে নফস)-কেও ফিকহের অংশ মনে করা হতো। পরবর্তীতে ফিকহুল আকাইদ তো যুক্তিবিদ্যা নামে আলাদাভাবে সংরক্ষিত ও সংকলিত হয়ে পাঠ্যসূচির অংশ হয়ে গেছে।
কিন্তু ফিকহুন নফস অর্থাৎ ইসলাহে নফসের বিষয়টিকে আমাদের পাঠ্যসূচির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এটিকে বরং ব্যক্তি ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আমার ছাত্রসুলভ মত হলো, ইসলাহে নফসকে পূর্ব যুগের মতো মাদরাসাসমূহে চলমান সকল বিভাগ-বিষয়ের মতো নিয়মতান্ত্রিকভাবে পাঠ্যভুক্ত করা উচিত। বর্তমান অবস্থায় এর প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে অনেক অনেক গুণ বেড়ে গেছে।
সময়ের এসব চাহিদা ও প্রয়োজন আমি এই খেয়ালে নিবেদন করছি যে, ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি এসব প্রয়োজনীয় বিষয়েও মাদরাসার শিক্ষকগণের মনোযোগ দেওয়া জরুরি। বাকি এটা জরুরি না যে সবাই এসব কাজের প্রতি নিবিষ্ট হয়ে যাবেন। এটা সম্ভবও নয় যে এসব প্রয়োজন পূরণ করার জন্য তারা নিজেদের পুরো সময় ব্যয় করবেন। কিন্তু এটা জরুরি, আজকের পৃথিবীর এসব প্রয়োজন ও চাহিদা সম্পর্কে মাদরাসার শিক্ষকদের খবর ও জ্ঞান রাখা। এ বিষয়গুলোকে অনুভব করা। এসব বিষয়ে কিছু না কিছু করার আগ্রহ বোধ করা।
যদি মাদরাসার শিক্ষকরা এসব জরুরি বিষয়গুলো সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন, চেষ্টা ও চিন্তা করতে থাকেন এবং ছাত্রদেরকে পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে সুযোগ ও প্রয়োজন মোতাবেক এ বিষয়ে মনোযোগ নিবিষ্ট করার জন্য শিক্ষা ও চিন্তার পথনির্দেশনা করার বিষয়টি আমল বানিয়ে নেন, তাহলে এতটুকুতেই অনেক উপকার হবে। আধুনিক পৃথিবীর অনেক ধর্মীয় চাহিদা পূরণ হওয়ার পথ তৈরি হয়ে যাবে।
।। উর্দু থেকে ভাষান্তর করেছেন সাদ আবদুল্লাহ মামুন
[মাওলানা জাহেদ রাশিদি পাকিস্তানের চিন্তক আলেমদের একজন। তিনি ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি আধুনিক পৃথিবীর নিত্য-নতুন জ্ঞানে পণ্ডিতব্যক্তি। সমসাময়িক যে কোনো বিষয়ে ইসলামের ব্যাখ্যা ও সমাধান পেশ করেন সাবলীলতার সঙ্গে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার রচনা ও ধর্মীয় সমাধান সমাদৃত হয়ে আসছে।]
















