শরীফ মুহাম্মদ ।।
সুন্দর কথা শুনতে ভালো লাগে। কিন্তু এর বাস্তবতা যখন জটিল ও কঠিন হয়, তখন ওই সুন্দর কথাটাও তেতো লাগে। শোনার সময় হয়তো স্বাদের বিস্বাদটা টের পাওয়া যায় না, কিন্তু বিপরীত বাস্তবতা যখন সামনে চলে আসে তখন তার স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। মিষ্টি কথাটা তখন আর সুস্বাদু লাগে না, কানেও সুশ্রাব্য মনে হয় না। ফাঁপা মনে হয় সব কথা।
গত ১৬ অক্টোবর ঢাকায় বাংলাদেশ প্রেস ইনিস্টিটিউটে সাংবাদিকদের অনুসন্ধানমূলক রিপোর্টিংয়ের তিন দিনের এক প্রশিক্ষণের সমাপনী অনুষ্ঠানে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, ‘সাংবাদিকতার মূল বিষয় হচ্ছে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা। এ সাংবাদিকতা চলমান থাকুক। দুদক গণমাধ্যমের অনেক রিপোর্ট আমলে নিয়ে অনুসন্ধান ও তদন্ত করে।’
দুদক চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘আমি আপনাদের পক্ষে বলতে চাই। দুদকের বিরুদ্ধে হোক, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হোক, আমার বিরুদ্ধেই হোক, আপনারা লিখবেন। অনুসন্ধানের তথ্য যদি আপনারা না দেন তাহলে প্রতিষ্ঠান চলবে না। আপনারা নির্ভয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করুন।’
কথাগুলো শুনতে তো সুন্দরই শোনা গেছে। এমনকি তিনি এ কথাও বলেছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নামে যেটা হয়েছে, এখানে তথ্য সংগ্রহ, তথ্য প্র্রকাশের বিধি-নিষেধ এসেছে। তারপরও এটা নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। আপনারা নিরুসাহিত হবেন না। অনুসন্ধানী রিপোর্ট ছাড়া দুদকও কাজ করতে পারবে না। আপনারা আমাদের তথ্য দিন।’
দুদক চেয়ারম্যানের এই বক্তব্যটাকে শুধু বক্তব্যের জায়গায় রাখলে সেটা বেশ মধুর এবং সুন্দর। অনুপ্রাণিত হওয়ার মতো কথা রয়েছে এতে। অনুষ্ঠানে একই রকম কথা বলেন পিআইবির মহাপরিচালক শাহ আলমগীর। তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকতা কোনো আইন দিয়ে থেমে থাকেনি। আইন করে কোনো ভালো কাজকে আটকানো যাবে না। আইন হয় খারাপদের জন্য। কাজেই আইন নিয়ে ভীত হওয়ার কোনো কারণ নেই।’
তার কথাটাও শুনতে সুন্দর লেগেছে। কিন্তু গত কিছুদিন যাবত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে গণমাধ্যম-সমাজ ও সম্পাদক পরিষদের যে উদ্বেগ, এমনকি মানবাধিকার সংস্থাগুলো যে উদ্বিগ্নতার কথা প্রকাশ করেছে এবং যে ধরনের ভীতি ও আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছে, তার সঙ্গে মেলালে দুদকের মতো এতবড় প্রতিষ্ঠানের একজন কর্ণধারের কথার তাৎপরয যে কী বোঝা মুশকিল।তিনি যে বলেছেন, অনুসন্ধানী রির্পোট করবেন, দুর্নীতি তথ্য আমাদের সরবরাহ করবেন, আমাদের সহযোগিতা করবেন; এটা কি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সঙ্গে বৈপরীত্যপূর্ণ একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করে না? সাংবাদিকরা কার কথা শুনবে? তার কথা না কি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের হুমকির কথা? এ প্রশ্নটিকে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ আছে?
প্রসঙ্গত সাংবাদিক, সম্পাদক পরিষদ ও নাগরিকসমাজসহ বিভিন্ন পক্ষের আপত্তি উপেক্ষা করেই গত ১৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিল পাস করা হয়। এরপর প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর নিয়ে আইনটিকে চূড়ান্ত করা হয়। অথচ শুরু থেকেই সাংবাদিকসমাজ ও সম্পাদক পরিষদ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বেশ কয়েকটি ধারা সংশোধনের কথা সংবাদ সম্মেলনে এবং মানববন্ধন করে বলে এসেছেন। সাংবাদিকরা বলছেন বারবার। সংশোধনের জন্য দাবি জানানো ৩২ নম্বর ধারাটি হলো, যদি কোনো ব্যক্তি বেআইনি প্রবেশের মাধ্যমে কোনো সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ ও সংরক্ষণ করেন বা সহায়তা করেন, তাহলে সর্ব্বোচ ১৪ বছরের সাজা। ২৫ লাখ টাকা জরিমানা।
সম্পাদক পরিষদ এ ধরনের কয়েকটি আইনের ক্ষেত্রে বারবার সংশোধনী চেয়েছেন।তাদের চাওয়া কিছু কিছু সংশোধনীর সাথে আমাদের ভিন্নমত আছে। কিন্তু এটাতো সত্য যে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, দুর্নীতি উন্মোচনকারী সাংবাদিকতা এবং সমাজের ভেতরে যে কদাচার চেহারা রয়েছে, যেগুলোর কারণে দেশ ও নাগরিক সমাজ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেগুলো প্রকাশ করতে হলে তো তাদের গোপন তথ্য প্রকাশ করতেই হবে। প্রচার করতেই হবে। তা না হলে তারা এটা কীভাবে সংগ্রহ করবে, ধারন করবে, প্রকাশ করবে? অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ফলে সরকারি, আধা সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানের, অনেক ব্যক্তির তথ্যই সাংবাদিকদের কাছে চলে আসতে পারে। তারা সেগুলো ধারণ করবেন। প্রচার করবেন। এটাই তো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মধ্যে তো এগুলো থাকেই।আইনে তো এটা করতেই বারণ করা হয়েছে।অন্তত সাংবাদিকরা তাই মনে করছেন।
দুদক চেয়ারম্যান বলছেন, আপনারা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করে দুদককে সহযোগিতা করুন। আর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আছে, সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের গোপন তথ্য ধারণ ও প্রচার দণ্ডনীয়। সাংবাদিকরা আসলে কার কথা আমলে নেবে? কোন নির্দেশনা অথবা কথার ওপর আস্থা রাখবে? এ প্রশ্নের সমাধানটা তাহলে কে করবেন? কোন কথাটা সারবত্তাপূর্ণ কথা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ধারা না কি এখন যারা অনুসন্ধানী রিপোর্ট করার কথা বলছেন তাদের কথা! এটা মিলানো তো মুশকিল।
তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বাধন দিয়ে সাংবাদিকদের হাত-পা বেঁধে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করতে বলা, এটা কি দুদক চেয়ারম্যানের কথার কথা? না তার কথার মধ্যে কোনো আন্তরিকতা রয়েছে? সারবত্তা রয়েছে? এ কথার যদি কিছু বাস্তবতাও থাকে, তা হলে আমার মনে হয় দুদকের চেয়ারম্যান শুধু নন, যারা সমাজের দুর্নীতির উন্মোচন চান, তারা যে যেখানেই থাকুন, তারা সর্বোচ্চ যেটা করতে পারেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিকদের সংযত রাখা এবং তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশে একটা সীমারেখা দিতে পারেন। কিন্তু এভাবে শাস্তি প্রদানের ধারা বিদ্যমান রেখে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করতে বললেই কি সাংবাদিকদের উদ্বেগ দূর হবে?
আমরা মনে করি, সাংবাদিকদের হাত-পা বেঁধে তাদের যত উপদেশই দেওয়া হোক, যত অপ্রাতিষ্ঠানিক কথাই মঞ্চ থেকে বলা হোক, এগুলো বাস্তবতার নিরিখে সারবত্তাহীন বলে প্রতীয়মান হয়। দুদক চেয়ারম্যানের হয়তো এ বিষয়ে ব্যক্তিগত আন্তরিকতা রয়েছে, কিন্তু কঠোর একটা আইনের সংশোধনের কথা না বলে শুধু যদি তারা তাদের সদিচ্ছার কথাগুলোই বলেন, সাংবাদিকদের প্রখর তথ্য-সচেতন হওয়ার ব্যাপারে গুরুত্বের সঙ্গে অগ্রসর হতে বলেন, প্রশ্ন জাগে, তারা তথ্যসংগ্রহের প্রতি উৎসাহিত করতে চান, না তরুণ অনুসন্ধানী সাংবাদিকদেরকে জেল-জরিমানার একটা মহাঝামেলার মধ্যে এবং মহাসংকটের মধ্যে ফেলতে চান।
আসলে বড় পদের মানুষদের সুন্দর সুন্দর কথার সঙ্গে আইন, পরিবেশ, পরিস্থিতি সবদিকই সুন্দর হওয়া দরকার। যদি তা না হয় তাহলে এসব সুন্দর কথার বাস্তবে কোনো অর্থ থাকে না। সব ফাঁপা মনে হয়। হাত-পা বেঁধে রাখুন, সমস্যা নেই! দোহাই, হাত-পা বেঁধে সাঁতার কাটতে বলবেন না। এসব কথা পরিহাসের মতো লাগে।
















