জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চাও হতে পারে নেকআমল : মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক

[বিগত ১৫ জুমাদাল আখিরাহ ১৪৩৯ হিজরী/৪ মার্চ ২০১৮ ঈসায়ী তারিখে মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকার মিরপুরের ভবনে এসএসসি পরীক্ষা সমাপনকারী ছাত্রদের  নিয়ে দিনব্যাপী একটি দ্বীনী শিক্ষা মজলিস অনুষ্ঠিত হয়। মজলিসে মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা-এর আমীনুত তালীম মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বয়ান পেশ করেন। এতে মাদরাসার তালিবুল ইলম ও জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চাকারী উভয় শ্রেণির জন্য রয়েছে অতি প্রয়োজনীয় পথনির্দেশনা। এখানে সেই বয়ানের সারনির্যাস পেশ করা হলো।]


 

أَرْبَعٌ إِذَا كُنّ فِيكَ فَلَا عَلَيْكَ مَا فَاتَكَ مِنَ الدنْيَا: حِفْظُ أَمَانَةٍ، وَصِدْقُ حَدِيثٍ، وَحُسْنُ خَلِيقَةٍ، وَعِفّةٌ فِي طُعْمَةٍ.

-মুসনাদে আহমাদ, হাদীস : ৬৬৫২; শুআবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস ৪৪৬৩; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস ৭৮৭৬

সংক্ষিপ্ত একটি হাদীস। হাদীসটির আলোকে কিছু কথা শেষে বলব ইনশাআল্লাহ। শুরুতে যে বিষয়টি বলতে চাচ্ছি তা হল, আমরা ছাত্র। দ্বীনী মাদরাসায় যারা পড়াশুনা করি আমাদের নাম তালিবে ইলম। তালিবে ইলম মানে ইলম অন্বেষণকারী। ইসলামের পরিভাষায় ইলম বলা হয় ইল্মে ওহীকে। ওহীর ইলম, ওহীর জ্ঞান- ওহীর মাধ্যমে যে জ্ঞান মানুষ পেয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে। কুরআন ও সুন্নাহ্র ইলমকে বলা হয় ইলম। তালিবে ইলম সে, যে ঐ ইলম অন্বেষণ করে; ঐ ইলম নিয়ে মেহনত করে। আর একটা হল জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞান। এই জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়ে যারা মেহনত করে, এটা শিখতে চায়, শেখে তারাও তালিবে ইলম। এক প্রকারের তালিবে ইলম। কিন্তু পরিভাষার বিষয় আছে। যেহেতু আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট আসল ইলম হল ওহীর ইলম, কুরআন সুন্নাহ্র ইলম তাই ইলম বললে ওটাকেই বুঝায় এবং তালিবে ইলম  বললে- যারা কুরআন-সুন্নাহর ইলম শেখে থাকে তাদেরকে বুঝায়। কিন্তু এর অর্থ এই নয়, যারা জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞান অর্জন করে তাদের এই কাজটা কোনো কাজ নয়। শরীয়তের দৃষ্টিতে, ইসলামের দৃষ্টিতে এমন ধারণা করা একেবারেই অন্যায় ও ভুল। বরং জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞান যারা চর্চা করে, তাদেরও যদি নিয়ত সহীহ থাকে এবং পদ্ধতি সঠিক হয় তাহলে তাদের এ চর্চাও আমলে সালেহ তথা নেক আমল।

জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্বেষণ এবং এ নিয়ে চর্চা করা, মেহনত করা এটাও নেক আমল- আমলে সালেহ। শর্ত কী? নিয়ত হতে হবে সহীহ এবং পদ্ধতি হতে হবে সঠিক। সহীহ নিয়ত এবং সঠিক পদ্ধতি যদি হয় তাহলে ওটাও নেক আমল। আর যদি নিয়ত সহীহ না হয়, তাহলে যে নিয়তে জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞান আপনি অর্জন করেছেন তাই পাবেন।

আমলে সালেহ হতে হলে নিয়ত সহীহ হতে হবে- এ কথা শুধু জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের জন্য না। আমাদের এই ইল্মে নবুওত, ইল্মে ওহী হাসিল করার জন্য যারা মাদরাসায় পড়ে তাদের জন্যও একই কথা। পড়ছে কুরআন-সুন্নাহ্র ইলম, দ্বীনী ইলম, কিন্তু আল্লাহর দরবারে তার এই মেহনত কবুল হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত। সহীহ নিয়ত হতে হবে। এখানে যদি সহীহ নিয়ত জরুরি হয়, জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে জরুরি হবে না?

কী নিয়ত? আমরা যারা স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে পড়াশুনা করছি, কেন করছি? আমাদের নিয়তটা কী? কী নিয়ত হলে সহীহ  নিয়ত হবে, কী নিয়ত হলে স্থূল নিয়ত হবে, কী নিয়ত হলে একবারেই গলত এবং নাজায়েয নিয়ত হবে- এটা জানতে হবে। নিয়ত তিন ধরনের হতে পারে:

১. সহীহ নিয়ত ২. স্থূল নিয়ত আর ৩. একেবারেই গলত নিয়ত।

স্থূল নিয়ত কী?

আগে ওটাই বলি। স্থূল নিয়তই মনে হয় মানুষের মাঝে বেশি; আমি জানি না। স্থূল নিয়ত হল, পড়াশুনা না করলে ভবিষ্যতে করবে কী? ভবিষ্যতের একটা ব্যবস্থার জন্য, নিজের পায়ে নিজে দাঁড়ানোর জন্য, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য পড়াশোনা করতে হবে। ছেলে যদি পড়াশুনা করতে না চায় তাকে উদ্বুদ্ধ করা হয় এই কথা বলে- করবি কী? কী করে খাবি? কী করে খাবে তুমি ভবিষ্যতে?

ঠিক এই ভাষায় হয়ত বলে না, কিন্তু এ ভাষাও ব্যবহৃত হয়। বাকি বিষয়টা মাথায় থাকে। নিজের পায়ে নিজেকে দাঁড়াতে হবে। ভবিষ্যতে কিছু একটা করতে হবে। তাহলে তোমাকে শিখতে হবে। এটা হল একবারেই স্থূল নিয়ত। এই নিয়তটার মধ্যে ভদ্রতা নেই। ভালো রুচির পরিচয় নেই। এই নিয়তের মধ্যে কোনো গভীরতা নেই। একেবারে স্থূল একটা চিন্তা।

কেন এই নিয়ত স্থূল, এটা বেশি ব্যাখ্যা করতে হবে না। সংক্ষেপে বলি, এই যে নিজের পায়ে নিজে দাঁড়ানোর কথা বলছি, প্রথম কথা হচ্ছে, আপনি কীভাবে বললেন, নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াবেন? কে দান করেছেন এই পা? আল্লাহ দান করেছেন। এই পায়ের নিআমত কত বড় নিআমত। কখন বুঝা যায়? এক্সিডেন্ট হয়ে যদি পা ভাঙে তখন বুঝা যায়, এটা কতবড় নিআমত আল্লাহর পায়ের নিআমত তো আল্লাহ দান করেছেন। চলা-ফেরার তাওফীক আল্লাহ দিচ্ছেন। কিন্তু এখন আপনি পায়ের বিষয়টা একেবারেই ফয়সালা করে ফেলেছেন। এটা আমার পা। নিজের পা। দাঁড়ানোটা? দাঁড়াতেই হবে, দাঁড়ানোর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। নিজের পায়ে নিজে দাঁড়ানো এত সহজ! যিনি পা দিয়েছেন তাঁকে ভুলে নিজের পায়ে নিজে দাঁড়িয়ে যাব আমি!! নিজের পায়ে নিজে দাঁড়ানো এটা তো সুন্দর কথা হল না। আশাটাও তো সুন্দর না- নিজের পায়ে নিজে দাঁড়ানো।

তেমনিভাবে- ‘ভবিষ্যত’। ভবিষ্যতে কী করব, ভবিষ্যতের চিন্তায় পড়াশুনা করতে হবে আমাকে। কোনো না কোনো বিষয়ে আমাকে পণ্ডিত হতে হবে। কাকে বলে ভবিষ্যত? ভবিষ্যত কী জিনিস? একজন আল্লাহর বান্দার ভবিষ্যত এত সীমিত কেন? ভবিষ্যত কার? আমার, আমার সংসারের! কত দিন পর্যন্ত? কবরে যাওয়া পর্যন্ত! ব্যস, সীমিত ভবিষ্যত! মুমিনের দৃষ্টি এত সীমিত হয়? আমি তো আল্লাহ্র মুমিন বান্দা, আমার দৃষ্টি এত সীমিত কেন? আমার ভবিষ্যত মৃত্যু পর্যন্ত? আমার ভবিষ্যত মানে আমি আর আমার পরিবার? একজন মুমিনের ভবিষ্যত হবে পুরো উম্মতের ভবিষ্যত। পুরো উম্মতের ভবিষ্যত তার নিজের ভবিষ্যত। আর তার ভবিষ্যত মউত পর্যন্ত নয়; তার ভবিষ্যত তো শুরু হয় মউতের পর থেকে। মউতের আগ পর্যন্ত তো আজ। যখন থেকে কাল শুরু হবে (মউতের পর) সেটা আগামীকাল। কুরআন মাজীদে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন-

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَ لْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ ،  وَ اتَّقُوا اللهَ   اِنَّ اللهَ خَبِیْرٌۢ بِمَا تَعْمَلُوْنَ.

-সূরা হাশর (৫৯) : ১৭

অর্থাৎ, আল্লাহকে ভয় কর। তোমাদের প্রত্যেকে যেন ভাবে- আগামীকালের জন্য কী পাঠিয়েছে। আগামীকালের জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছে।

আগামীকাল আমরা কোথায় থাকব? আখেরাতে। তো আখেরাতের জন্য কোনো সঞ্চয় কি আছে আমাদের? ওখানে পাঠিয়েছি কিছু? আল্লাহ বলছেন, প্রত্যেককেই এটা ভাবতে হবে, আগামীকালের জন্য আমি কী প্রস্তুতি নিয়েছি, কী পাঠিয়েছি। আগামীকাল- মৃত্যুর পর থেকেই আগামীকাল। এর আগ পর্যন্ত পুরোটা আজ।

তো মুমিনের ভবিষ্যত তো মৃত্যুর পর থেকে। আমি কীভাবে ভবিষ্যত-চিন্তা করছি; মৃত্যুর পরের জীবনকে বাদ দিয়ে ভবিষ্যত চিন্তা করছি?  এটা তো একেবারেই সংকীর্ণতা হয়ে গেল। এজন্য ওটা স্থূল নিয়ত। ঐ নিয়তে কোনো গভীরতা নেই।

 

গলত নিয়ত কী?

গলত নিয়ত হল- আরে জ্ঞান তো এটাই; আর কোনো জ্ঞান আছে নাকি! জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞান যে শিখবে সেই তো জ্ঞানী। এর বাহিরে তো কোনো জ্ঞান নেই!! যারা অন্য কিছু শিখে তারা তো জ্ঞানী না। দেখেন না পত্র-পত্রিকায়? আমার অবশ্য প্রায় ১০ বছরের মত হয়ে গেছে পত্রিকা পড়ার সুযোগ হয় না; পড়ি না- ঠিক এ ভাষায় বললাম না। পড়ার  সুযোগ হয় না। আগে যে সময় পড়তাম, ঐ সময় দেখতাম আলেমদের মধ্যে দুই ভাগ করা হয়; বুদ্ধিজীবিরা দুই ভাগ করে- শিক্ষিত আলেম আর অশিক্ষিত আলেম। জ্ঞানী আলেম আর মূর্খ আলেম। এর মানে কী? এর মানে এই যে, মাদরাসার যে ইলম এটা ইলমই না!! এটা কোনো জ্ঞানের হিসেবেই আসে না। জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞান শিখলেই সে জ্ঞানী হবে, নচেৎ জ্ঞানী হবে না। সেজন্য মূর্খতা থেকে বাঁচতে হলে কী করতে হবে? এই পড়া-শুনা করতে হবে। এই নিয়তে যদি কেউ জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের রাস্তা অবলম্বন করে, এটা হবে গলত নিয়ত। ‘গলত নিয়ত’ হালকা ভাষায় বললাম; এটা আসলে বেঈমানী নিয়ত। কুফরি নিয়ত। সহীহ নিয়ত নয়।

 

সহীহ নিয়ত কী?

সহীহ নিয়ত হল, আমরা আল্লাহর বান্দা, আল্লাহর সৃষ্টি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে আখেরাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু থাকতে দিয়েছেন দুনিয়াতে। এই জগতে। এই জগতে কেন থাকতে দিলেন?

এই জগতে থেকে আমরা আখেরাতের প্রস্তুতি নিব। এই জগৎটা তো কোনো অর্থহীন বিষয় নয়। এই জগতে থাকতে দিয়েছেন কেন? ‘তাযাওয়াদু লিল আখিরাহ’-আখেরাতের পাথেয় গ্রহণ কর। অনেক আয়াত ও হাদীসে এই মর্মটা এসেছে যে, আখেরাতের প্রস্তুতি তোমরা এই দুনিয়া থেকেই গ্রহণ করো। এই জগতে থাকতে হলে মানুষের দুই ধরনের জ্ঞানের দরকার।

১. ওহীর মাধ্যমে যে হেদায়েত আল্লাহ তাআলা দান করেছেন; হালাল, হারাম, জায়েয, নাজায়েয, ঈমান, আমল যাবতীয়। একজন মুমিন একজন মুসলিম তার ঈমানী জিন্দেগী, তার ইসলামী জিন্দেগী কীভাবে গড়বে, গড়ে তুলতে হবে- সেই ইলম।

২. মানুষের দুনিয়াবি যত জরুরত আছে তার জ্ঞান। এই দু’ধরনের জ্ঞানের সমন্বয়ে একজন মানুষ জগতে বাস করতে পারে।

ধরুন, নামায-সালাত আল্লাহ তাআলা আমাদের উপর ফরয করেছেন। সালাতের জন্য কী কী শর্ত আছে আপনারাও জানবেন। কিছু না কিছু পড়েছেন। আমল তো করেনই। অনেক কিছু জানাও আছে। কিছু জিনিস আছে জানা থাকে না, কিন্তু আমল ঠিকই করা হচ্ছে। বলতে গেলে হয়ত বলতে পারছে না। যেমন- সতর ঢাকা সালাতের একটি শর্ত। সতর ঢাকবে কী দিয়ে? পোশাক দিয়ে। জায়গা পাক হতে হবে নামায পড়তে হলে। এটা একটা শর্ত তাই না?- জায়গা পাক। জায়গা পাক যে হবে, জায়গাটা কোন্ জায়গা। নামাযের মূল জায়গা, আসল জায়গা কোন্টা? মসজিদ। মসজিদেই তো নামায পড়ব। মসজিদ তো একটা স্থাপনা, একটা ঘর। তো আপাতত এই দুই শর্তের কথাই বলি। এখন সালাতের জন্য যে পোশাক পরতে হবে, পোশাক আসবে কোত্থেকে? পোশাক কে তৈরি করবে?

জ¦ী, পোশাক তৈরি করতে হবে না? তাহলে পোশাকের শিল্প এটা জরুরি কি জরুরি না? জরুরি। এই পোশাকশিল্পের জ্ঞান কে অর্জন করবে? মসজিদ যে বানাবে এটার জন্য কয়েক প্রকার জ্ঞানের দরকার। ইঞ্জিনিয়ার দরকার, আবার মিস্ত্রী দরকার। আরো কত পর্ব আছে। ওটার ছামানাগুলো তৈরি করবে কারা? একটা ঘর তৈরি হওয়ার জন্য কতটা শিল্পের জরুরত। তো শরীয়ত আমাদেরকে পোশাক পরতে বলে- বিবস্ত্র থাকা যাবে না। নামায ছাড়াই তো পোশাক পরা জরুরি। সতর ঢাকা ফরয না?! নামায ছাড়াই তো সতর ঢাকা ফরয। তো শরীয়ত পোশাক পরা ফরয করেছে তাহলে পোশাকশিল্প কি শরীয়তে নিষিদ্ধ হবে?

মসজিদ নির্মাণ করার ফজিলতও আছে-

مَنْ بَنَى لِلهِ مَسْجِدًا بَنَى اللهُ لَهُ بَيْتًا فِي الْجَنّةِ.

যে আল্লাহ্র জন্য একটি মসজিদ বানাল আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে বাড়ি নির্মাণ করবেন। -সহীহ বুখারী, হাদীস ১২৯১

মসজিদ নির্মাণের ফযিলতের কথাও আছে, সওয়াবের কথাও আছে। উদ্বুদ্ধও করা হয়েছে। কিন্তু এই শিল্প নিষেধ! এই বিজ্ঞান নিষেধ! এটা হয়?! কখনো হয় না।

জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞানকে শরীয়ত কখনো নিষেধ করে না। চিকিৎসার কথা বলা হয়েছে। হাদীস শরীফে আছে, আল্লাহ তাআলা রোগ দেন আবার রোগ দূর করেনও। তো আল্লাহ কোন্ জিনিসে শিফা রেখেছেন- এটার নিশ্চিত বাস্তবিক ইলম আল্লাহ ছাড়া কারোরই  নেই। শুধু সাধারণ একটা জ্ঞান ডাক্তারদেরকে আল্লাহ তাআলা দান করেছেন। সে হয়ত ঠিক ঠিক ঔষধ প্রয়োগ করতে পারে। শেফা হয় আল্লাহর হুকুমে । এই যে ডাক্তারী বিষয়টা- রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীসেও রয়েছে। হাদীসের কিতাবে একটা অধ্যায়ের শিরোনাম ‘আততিব’। শিরোনাম কী? আততিব। তিব মানে চিকিৎসা বিজ্ঞান। একজন তালিবে ইলম, একজন ছাত্র যখন জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের লাইনে যাবে এবং সেই বিষয়ে পণ্ডিত্য অর্জন করবে তার নিয়ত কী হবে? নিয়ত হবে, আমি এর মাধ্যমে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের মাখলুকের সেবা করব।

দ্বীন-ঈমান এবং শরীয়তের অনেক বিধি-বিধান আছে, যেগুলোর সাথে জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সম্পর্ক। উম্মাতে মুসলিমার সফলতা দুইটা মিলে। মূল সফলতা ঈমানের মধ্যে। সফলতা কিন্তু মুমিন হিসেবে। সে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে তার জাগতিক অনেক কিছুরই প্রয়োজন হয়ে যাচ্ছে। আমি ঐ অংশটা পুরা করব। আমি ঐ দিকের তাকাযাটা পুরা করব। মুফতী সাহেব বলবেন, নামাযের জন্য তোমাকে পোশাক পরতে হবে, তোমার পোশাক পবিত্র হতে হবে আর আমি বলব এই নাও পোশাক। হুযুর বলবেন, মসজিদের এই ফযিলত এবং বাসস্থান এটা আল্লাহর নিআমত। আমার স্ত্রীকে, আমার সন্তানকে সুন্দর নিরাপদ বাসস্থানে রাখা আমার অবশ্যকর্তব্য। এই মাসআলা হুযুর বলবেন। এখন ঘরটা নির্মাণ হবে কীভাবে? এই বিষয়ে আমি সহযোগিতা করব।

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো সাহাবী অসুস্থ হলে ডাক্তারের কাছে পাঠাতেন। হারেছ ইবনে কালাদা আছছাকাফির কাছে পাঠাতেন। নিজেও চিকিৎসা দিতেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চিকিৎসারও অনেক জ্ঞান ছিল। অনেক  কিছুর ক্ষেত্রে তিনিও ব্যবস্থাপত্র বলে দিতেন।  ব্যবস্থাপত্র লিখে তো দিতেন না, কিন্তু বলে দিতেন অনেককে। আল্লাহর রাসূল তো রাসূল ছিলেন। প্রাসঙ্গিক বিষয় হিসেবে চিকিৎসারও অনেক জ্ঞান ছিল আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের।

কিন্তু যে বিষয় জানা নাই সে বিষয়ের বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠাতেন। ডাক্তারের কাছে পাঠাতেন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিকিৎসার জন্য হারেছ ইবনে কালাদা’র কাছে পাঠাতেন । হারেছ ইবনে কালাদা মুসলিম ছিল না। তখন যদি মদীনায়  কোনো মুসলিম ডাক্তার থাকতেন, তার কাছে পাঠাতেন না? তো আপনি বলবেন যে আমার মুসলিম ভাইয়ের যাতে জরুরতের জন্য কোনো খ্রিস্টানের কাছে যেতে না হয় আমি সেই ঘাটতিটা পুরা করব। আমি এমন ফার্মাসিস্ট হব যে, ঔষধের ক্ষেত্রে অমুসলিম ফার্মাসিস্টদের মুখাপেক্ষী হতে না হয় মুসলিমদের। এই ঘাটতি আমরা পুরা করব। এটা হল নিয়ত। আল্লাহর মাখলুকের সেবার জন্য এবং জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞান দিয়ে আল্লাহর দ্বীনের যে যে খেদমত করা যায় সেই খেদমতের জন্য আমি এই লাইনে পড়া-শোনা করব। তাহলে মাদরাসার ছাত্রের মনযিল আর আমার মনযিল এক। সেও আল্লাহর রেজামন্দির জন্য আল্লাহকে খুশি করার জন্য করছে আমিও আল্লাহকে খুশি করার জন্য করছি। সে মূল বিষয়ে মানুষকে হেদায়েত দিবে। কিন্তু সে হেদায়েতের উপর আমল করার জন্য মানুষের যেসমস্ত জাগতিক জরুরত হবে সেই জরুরতটা আমি পুরা করব- ইনশাআল্লাহ। এটা নিয়ত। এই নিয়তে যদি কেউ স্কুলে পড়ে, কলেজে পড়ে, ভার্সিটিতে পড়ে তাহলে তার এটা আমলে সালেহ হবে না? অবশ্যই হবে আমলে সালেহ। কোনো সন্দেহ নেই- এটা আমলে সালেহ।

[মাসিক আলকাউসারের সৌজন্যে]