ইসলামি দলগুলোর আওয়ামী ঘনিষ্ঠতা : আপস না কৌশল

আতাউর রহমান খসরু ||

আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে নানা বাঁকবদল দেখা যাচ্ছে রাজনীতিতে। ডান, বাম ও ইসলামি ধারায় শুরু হয়েছে নতুন মেরুকরণ। একদিকে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামি মূল্যবোধে বিশ্বাসী বিএনপি বামপন্থী ড. কামালের জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠায় অভিলাষী কোনো কোনো ব্যক্তি ও দল ভিড় করছে ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী আওয়ামী জোটে। ইসলামি দলগুলোর এমন আওয়ামী ঘনিষ্ঠতা এক দশক আগেও ছিল অকল্পনীয়। কিন্তু এখন সেটাই বাস্তবতা। এমনকি কোনো কোনো আলেম নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করবেন বলে গণসংযোগও শুরু করেছেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পর দেশে সব ধরনের ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করে শাসক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। সংবিধানের ১২ ও ৩৮ ধারায় এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। সেই থেকে দেশের ইসলামি ধারার দলগুলোর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় দলটির। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যূত হয় দলটি। এরপর দীর্ঘ ২৭ বছর থাকে ক্ষমতার বাইরে।

এরপর তিন মেয়াদে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট। এ তিন মেয়াদের প্রথম দুই মেয়াদে ধর্মীয় বিষয়ে আপসহীন মনোভব অক্ষুণ্ন থাকে তাদের। বরং এ সময় ফতোয়া বিরোধী আন্দোলন ও শাপলা চত্ত্বরের মর্মান্তিক ঘটনা দেশের আলেম-উলামা ও ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়তে থাকে। কিন্তু তৃতীয় মেয়াদে পাল্টাতে থাকে দৃশ্যপট। কমতে থাকে পারস্পারিক দূরত্ব এবং বাড়ে ঘণিষ্ঠতা।

এ দূরত্ব ঘুচিয়ে আনার কৃতিত্ব কার? বিশিষ্ট আলেম ও সাংবাদিক মাওলানা লিয়াকত আলী মনে করেন এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকাই মুখ্য। তার মতে সরকার উদ্যোগী হওয়ায় বিষয়টি সহজ হয়েছে। সরকার ইসলামপন্থীদের দাবিগুলো যেমন পাঠপুস্তকের পরিবর্তন, দেবী মূর্তি অপসারণের মতো বিষয়গুলো মেনে নিয়ে আলেমদের দ্বিতীয়বার ভাবার সুযোগ করে দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আপনি হিসেব করলে দেখবেন এখানে আওয়ামী লীগের আচরনের পরিবর্তনটাই বেশি। বিতর্কিত ফতোয়া বিরোধী রায়ের একটি যুক্তিপূর্ণ সমাধান থেকে শুরু করে সর্বশেষ কওমি শিক্ষা সনদের স্বীকৃতি পর্যন্ত সরকার গুরুত্বের সঙ্গে উলামায়ে কেরাম তথা ইসলামি দলগুলোর দাবিসমূহ বিবেচনা করেছে।

প্রবীণ ইসলামি রাজনীতিক ও ইসলামি ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামী মনে করেন দূরত্ব কমানোর ক্ষেত্রে সরকার ও ইসলামি দল উভয়ের আগ্রহই সমান ছিল। তিনি বলেন, সরকার আলেমদের যতোটা আগ্রহে ডেকেছেন আলেমরাও সে ডাকে ততোটা আগ্রহে সাড়া দিয়েছেন।

ঠিক এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ক্ষেত্রে। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রায় সবগুলো ইসলামি দল জোটবদ্ধ হয় দলটির সঙ্গে। কিন্তু সময়ের প্ররিক্রমায় এখন অনেকেই বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ত্যাগ করেছে।

মাওলানা নেজামির কাছে প্রশ্ন করেছিলাম, আপনারাসহ এক সময় প্রায় সবগুলো ইসলামি দল বিএনপির মিত্র ছিল। এখন প্রায় সবাই বিএনপি জোট ছেড়েছে। এর কারণ কী? কেন বিএনপির প্রতি আস্থা হারালো ইসলামি দলগুলো? তিনি বলেন, আমরা বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ত্যাগ করেছিলাম ইসলামী ঐক্যজোটকে আপন মহিমায় ফিরিয়ে আনতে। অর্থাৎ একটি বিকল্প ইসলামি প্লাটফর্ম তৈরি করতে।

আর অন্যরা? ‘আমরা যখন বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হই তখন কথা ছিল এক সঙ্গে আন্দোলন, এক সঙ্গে নির্বাচন ও এক সঙ্গে সরকার গঠন। এরপর এক সঙ্গে আন্দোলন ও নির্বাচন ঠিকই হয়েছে, কিন্তু এক সঙ্গে সরকার গঠন করা হয়নি। এতে ইসলামি ঐক্যজোট ও তার শরিকদের মন ভেঙ্গে যায়। এর সঙ্গে আরও অনেক উপসর্গ যোগ হয়। এখনও শরিকদের প্রতি বিএনপির সুনির্দিষ্ট কোনো অঙ্গীকার আছে বলে আমার মনে হয় না।’ বলেন মাওলানা নেজামী।

ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী আওয়ামী লীগের সঙ্গে ইসলামি দল ও আলেম-উলামাদের ঘণিষ্ঠতাকে ভালো চোখে দেখছেন না অনেকেই। তাদের দাবি এটা এক ধরনের আপস ও আদর্শচ্যূতি। আসলেই কি তাই? মাওলানা লিয়াকত আলী মনে করেন, ‘এটাকে আপস বলা যায় না। বরং এটা সচেতনতা। সরকার ও ইসলামি দল উভয়পক্ষ এ বাস্তবতা মেনে নিয়েছেন যে বৈরিতা কখনোই সুখকর নয়। তা সুফল বয়ে আনে না। উভয়পক্ষ নমনীয় হওয়ায় আজ কওমি মাদরাসার শিক্ষা সনদের স্বীকৃতির মতো একটি মৌলিক দাবি আলেমরা তাদের দাবি মোতাবেক আদায় করতে পেরেছে। আর আওয়ামী লীগও নির্বাচনে তার সুফল প্রত্যাশা করছে।’

মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামি শুরু করলেন আরেকটু পেছন থেকে। তিনি বললেন, ‘ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে আইয়ুব খান বিরোধী নির্বাচন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনসহ স্বাধীন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রায় সব নির্বাচনেই আলেমরা বড় দলকে সমর্থন দিয়েছেন। সুতরাং জোটবদ্ধ রাজনীতি আলেমদের একটি ঐতিহ্য। এখন প্রশ্ন হলো, কাকে সমর্থন দিবে? যারা ইসলাম ও মুসলমানের স্বার্থ সংরক্ষণ করবে বলে আশ্বস্ত করতে পারবে তাকেই সমর্থন দিবে। আলেমরা বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছিলেন, কিন্তু বিএনপি তাদের আশ্বস্ত করতে পারেনি। আওয়ামী লীগ তাদের অবস্থান থেকে সরে এসে; খানিক নমনীয় হয়েই এ সমর্থন অর্জন করেছে।’

তাই বলে সরাসরি দলীয় প্রতীকে নির্বাচন? মাওলানা নেজামী বলেন, আপনি নৌকা প্রতীকে নির্বাচনে বিস্মিত হচ্ছেন কারণ আপনি ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের খবর জানেন না। সেবারের নির্বাচনে মাওলানা আতাহার আলী রহ. ও খতিবে আজম সিদ্দিক আহমদ রহ.-এর মতো ব্যক্তিরা নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেন। কথা হলো, প্রতীক গ্রহণ যদি রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ হয় তাহলে সমস্যা নেই। আর যদি তা হয় আদর্শ ও চেতনা বিসর্জন দেয়া তাহলে তা অবশ্যই একটি সমস্যা। অবশ্যই বর্জনীয়।

মাওলানা লিয়াকত আলী ও মাওলানা আবদুল লফিত নেজামী উভয়ে মনে করেন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সৃষ্ট ঘণিষ্ঠতা পারস্পারিক। আর তা সম্ভব হয়েছে শাপলা চত্ত্বরের ঘটনার কারণেই। কারণ, এ ঘটনা ও তার প্রতিক্রিয়া আওয়ামী লীগ ও আলেম-উলামা উভয় শ্রেণিকে বাস্তববাদী হতে সাহায্য করেছে।

পূর্ববর্তি সংবাদগ্রেফতার মইনুল হোসেন, যা বললেন বিশিষ্টজনেরা
পরবর্তি সংবাদবাসে তল্লাশির সময় পুলিশকে গুলি করেছে সন্ত্রাসীরা