আল্লামা তাকি উসমানির হাতে আমার বাইআত ও কিছু স্মৃতিকথা

মুফতি দিলাওয়ার হোসাইন ।।

হজরত শায়খুল ইসলাম আল্লামা তাকি উসমানির হাতে আমার বাইআত হওয়ার ঘটনা বেশ দীর্ঘ। আমি বাইআত ছিলাম কায়েদে মিল্লাত (জাতির নেতা) হজরত মোহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জি হুজুর রহ. এর নিকট। ওনার ইন্তেকাল হয় ১৯৮৭ সালে আমি তখন করাচিতে পড়ছি। আমার শায়খের মৃত্যুতে আমি অনেক ব্যথা পেলাম। অনেক কান্না করলাম। ইসালে সওয়াব করলাম। এরপর শায়খ নির্বাচনের জন্য ইস্তেখারা শুরু করলাম।

ইস্তেখারার এক পর্যায়ে আমি স্বপ্ন দেখলাম আমাদের গ্রামের বাড়িতে পুকুরের পানি যাওয়ার জন্য যে নালা রয়েছে সেখানে হজরত হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলি থানবি রহ. বসা। আমি হজরতকে বললাম, হজরত আমি বাইআত হতে চাই। কার হাতে হবো? হজরত একটি হলুদ খামের উপর ঠিকানা লিখে দিলেন। ঘুম থেকে উঠে ঠিকানা কথা মনে থাকলো না। শুধু মনে হলো, সেখানে সম্ভবত ফয়সালাবাদ এমদাদুল উলুম মাদরাসার মোহতামিমের নাম লেখা ছিলো। তাতে আমি আমার হৃদয়ের প্রশান্তি পেলাম না। কারণ তিনি এতো দূরে যে তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা ও নিয়মিত যোগাযোগ রাখা অসম্ভব প্রায়। আমি ইস্তেখারা অব্যাহত রাখলাম।

স্বপ্নে আবার হজরত থানবি রহ. এর সঙ্গে দেখা। আমি আবার বললাম, হজরত আমি কার কাছে বাইআত হবো? তিনি বললেন, আমার কাছে বাইআত হও। হজরত থানবি রহ. স্বপ্নযোগে আমাকে বাইআত করে নিলেন। ঘুম ভেঙ্গে গেলো। হজরত যেহেতু হায়াতে (জীবিত) নেই। তাই স্বপ্নের মর্ম বুঝে আসলো না। আমি ইস্তেখারা অব্যাহত রাখলাম।

আবার হজরত থানবি রহ. কে স্বপ্ন দেখলাম। তিনি দারুল উলুম করাচির কুতুবখানায় শোয়া। আমি আমার একটি উর্দু পাণ্ডুলিপি হজরতের হাতে দিলাম। হজরত তা সংশোধন করে আমাকে ফেরত দিলেন। তখন আমার মনে আল্লামা তাকি উসমানির কথা আসলো। কারণ, আল্লামা তাকি উসমানি এখানে বসেই লেখালেখি করেন। কিন্তু অন্তরের প্রশান্তি তখনও আসলো না। ইস্তেখারা অব্যাহত রাখলাম।

আবারও হজরত থানবি রহ. কে স্বপ্ন দেখলাম। তিনি আমাদের গ্রামের বাড়ির কাচারি ঘরে শোয়া। আমি ও মাওলানা আবদুল মালেক নিচে বসা। আমাদের হাতে তিরমিজি শরিফের পুরাতন একটা নুসখা (সংস্করণ)। তিনি আমাকে ইবারত পড়তে বললেন। আমি ইবারত পড়লাম। তিনি আমাদের হাদিস পড়ালেন। তখন আবারও হজরত শায়খুল ইসলামের কথা আমার মনে আসলো। কারণ তিনি তখন দারুল উলুম করাচিতে তিরমিজি পড়ান। তারপরও আমার মনে পুরো প্রশান্তি আসলো না। আমি ইস্তেখারা অব্যাহত রাখলাম।

একদিন স্বপ্ন দেখলাম, আল্লামা তাকি উসমানি একটি রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন। আমি উনার পেছনে পেছনে হাঁটছি। রাস্তাটা সমতল থেকে অন্তত বিশ হাত উঁচু ছিলো। তখন আমার মন আরেকটু প্রশান্তি পেলো। কিন্তু আমি ইস্তেখারা অব্যাহত রাখলাম।

এরপর স্বপ্ন দেখলাম, আমি শায়খুল ইসলামের বাসায় গেলাম। কলিং বেল টিপলাম। হজরত বের হয়ে আসলেন। আমাকে একটা প্রশ্ন করলেন। আমি উত্তর দিতে পারলাম না। হজরতের হাতে বেত ছিলো তিনি আমাকে বেত দিয়ে বাড়ি দিলেন। আমার মনে তখন আর কোনো সংশয় থাকলো না যে, আমার ইসলাহ (সংশোধন) হজরতের মাধ্যমেই হবে।

আমি আল্লামা তাকি উসমানির নিকট গিয়ে ইচ্ছের কথা জানালাম। তিনি বললেন, আপনার ইচ্ছে তো অনেক ভালো কিন্তু নির্বাচন সঠিক হয়নি। তিনি আমাকে হজরত হাকিম আখতার রহ., মাওলানা আবদুর রউফ রহ.সহ কয়েকজনের নাম বললেন যেনো তাদের একজনের হাতে মুরিদ হই। আমি বললাম, হজরত আমার অন্তর অন্য কোনো দিকে যায় না। তিনি আমাকে ইস্তেখারা করার পরামর্শ দিলেন।

আমি যে এক বছর যাবৎ ইস্তেখারা করছি সেটা হজরতকে বলিনি। হজরতের নির্দেশ মান্য করে আরও এক সপ্তাহ ইস্তেখারা করলাম। কিন্তু অন্য কোথাও মন টানলো না। আমি হজরতের সঙ্গে দেখা করে বললাম, হজরত আমার মন আর কোথা টানে না। তখন তিনি বললেন, ‘ইস কাম কে লিয়ে একছুয়ি চাহিয়ে লেকিন মেরে পাস একছুয়ি এক-ছুই কি বরাবর ভি নেহি হ্যায়’ অর্থ হলো, আত্মশুদ্ধির জন্য একাগ্রতা প্রয়োজন। কিন্তু আমার কাছে তো এক সুঁই পরিমাণ একাগ্রতাও নেই।

আমি আবার বললাম, হজরত অন্য কোথাও আমার মন টানে না আমি কি করবো? তখন তিনি বললেন, ঠিক আছে ভাই ভালো কাজে দেরি করতে নেই। তিনি আমাকে বাইআত করে নিলেন এবং সবক দিলেন।

মুফতি শফি রহ. কে তার পিতা মাওলানা ইয়াসিন রহ. হজরত থানবি রহ. এর নিকট নিয়ে যান এবং তাকে বাইআত করিয়ে নেয়ার অনুরোধ করেন। তখন মুফতি শফি রহ. বললেন, হজরত দারুল উলুমে আমার সবক আছে, ব্যস্ততা আছে আমি খুব বেশি সবক আদায় করতে পারবো না। হজরত থানবি রহ. তাকে বললেন, অন্যদের যে সবক দেয়া হয় তা অবসর মানুষের জন্য। আমি তোমাকে অন্য রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাবো। হজরত থানবি রহ. তাকে পাঞ্চ তারগিবের সবক দিলেন। আমাকেও হজরত শায়খুল ইসলাম একই সবক দিয়ে শুরু করলেন।

হরজত শায়খুল ইসলামের ইসলাহের পদ্ধতি দেখলে মনে হয় এর চেয়ে বড় কোনো শায়খ পৃথিবীতে নেই। হজরত শায়খুল ইসলাম ইসহালের ক্ষেত্রে আদাবুল মুয়াশারাত-এর উপর বেশি গুরুত্ব দেন। যেন আমার দ্বারা অন্য কারো কষ্ট না হয়, অন্যের হক নষ্ট না হয়। কারণ, বান্দার হক বান্দা মাফ না করলে মাফ হয় না।

হজরতের সঙ্গে আমার জীবনের অনেক মধুর স্মৃতি আছে। যা মনে পড়লে খুশি হয়ে যাই। যেমন আমার সনদের স্বাক্ষরের জন্য আমি যখন হজরতের কাছে গেলাম তিনি তখন রাস্তায়। আমি রাস্তায় সনদ এগিয়ে দিলাম। কারণ, আমার ফ্লাইটের সময় হয়ে গিয়েছিলো। তিনি স্বাক্ষর করে দিলেন বিনা বাক্যে। আর নসিহত করলেন এখনি যেন নিজের পক্ষ থেকে কোনো ফতোয়া জারি না করি। কোনো বড় মুফতি দেখানোর পর জারি করবেন।

আমি দেশে আসার পর হজরত যে বার প্রথম বাংলাদেশে আসলেন আমি যে কোনো কারণে হজরতের সাথে দেখা করতে পারলাম না। কিন্তু হজরত ঠিকই আমাকে মনে রাখলেন। তিনি আমার ও মাওলানা আবদুল মালেক-এর জন্য একজনের কাছে হাদিয়া স্বরূপ একশো ডলার রেখে গেলেন। আমি দেখাই করতে পারলাম না, অথচ তিনি হাদিয়া দিয়ে গেলেন।

দ্বিতীয়বার যখন বাংলাদেশে আসলেন আমি দেখা করতে গেলাম একদম শেষ মুহূর্তে। তিনি যেদিন চলে যাবেন তার আগের রাতে। বিদায়ের সময় আমি হজরতকে বললাম, হজরত আমি সকালে আবার আসবো। হজরত হ্যা-না কিছুই বললেন না। সকালে আমার পৌঁছাতে একটু দেরি হলো। আমি যাওয়ার পর গাজীপুরের মাওলানা নুরুল ইসলাম আমাকে বললেন, হজরত সকাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় তিন-চার বার আপনার খোঁজ নিয়েছেন। আপনি কখন আসবেন! মাওলানা নুরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলতে বলতে একজন খবর নিয়ে আসলেন শায়খুল ইসলাম আমাকে ডাকছেন। আমি ভেতরে গিয়ে দেখলাম, হজরত আমার জন্য একটি ব্যাগ প্রস্তুত করে রেখেছেন। হজরত একান্তে আমাকে কিছু কথা বললেন এবং আমার হাতে ব্যাগটা তুলে দিলেন। বললেন, এটা আমার জন্য হাদিয়া। বাসায় এসে খুলে দেখি হজরতের ইসলাহি মাজালিস দুই খণ্ড। সাথে জামা-পায়জামার কাপড়।

এরপরের বার যখন আসলেন আমি দেখা করতে গেলাম। হজরতের ছেলে মাওলানা সালমান সাথে ছিলেন। তিনি বললেন, আব্বুর মাথায় খুব ব্যথা। বলেছেন কারো সাথে দেখা করবেন না। আমি পাশের রুমের অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর সালমান এসে আমার নাম ধরে ডাকলেন। বললেন, আব্বু আপনাকে স্মরণ করেছেন। ভেতরে গিয়ে দেখি হজরত মাথা ধরে শুয়ে আছেন। মাথায় ব্যথা। তবুও তিনি আমাকে সময় দিলেন এবং কথা বললেন। আসার সময় আবার একটা ব্যাগ ধরিয়ে দিলেন। বললেন, এটা আপনার উপহার। ব্যাগে জামার কাপড় ও রুমাল ছিলো।

আমি যখন বিদায় নিলাম হজরত লিফটে আমার সাথে নিজ পর্যন্ত নামলেন। বললেন, আয়াতুল কুরসি পড়ে নাও। আমি আয়াতুল কুরসি পড়ে হজরতের হাতে ফুঁ দিলাম এবং হজরত আমার হাতে ফুঁ দিলেন। এ আমলের ফজিলত হলো পরবর্তীতে পরস্পরের সাক্ষাৎ ব্যতীত কারো মৃত্যু হবে না।

দুইবার খাবার রান্না করে আমি হোটেলে গিয়ে হজরতকে খাইয়েছি। আমার স্ত্রীও হজরতের মুরিদ। তাই তিনিও খুব আগ্রহী ছিলেন রান্না করে খাওয়ানোর ব্যাপারে। তিনি খেলেন এবং খুব প্রসংশা করলেন। হজরত পাকিস্তান চলে যাওয়ার পর আমার স্ত্রী তাকে চিঠি লিখলেন যে, হজরত আপনার জন্য অন্তরে অনেক মহব্বত কিন্তু বোঝানো যায় না কখনও। তিনিও উত্তর লিখলেন, আপনাদের জন্যও আমার অন্তরে একই রকম মহব্বত। এরপর তিনি লেখেন, এমনিতে মাছগুলোর স্বাদ ছিলো আর মহব্বতের কারণে তা আরও বেশি বেড়ে গেছে।

ঘটনাগুলো আমি এজন্য বললাম যে, সত্যিকার একজন মুরশিদ তার মুরিদের প্রতি কতোটা আন্তরিক হতে পারে তার নমুনা হজরত শায়খুল ইসলাম। তিনি একজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব। কতো ব্যস্ততা তার। তবুও তিনি আমার মতো একজন অধমকেও ঠিকঠাক মনে রাখেন। সময় দেন। চিঠি লিখলে উত্তর দেন।

মুফতি দিলাওয়ার হোসাইনের সঙ্গে কথা বলে মুখকলামটি তৈরি করেছেন আতাউর রহমান খসরু