মোবাইল-ইন্টারনেটে খারাপ ও নোংরা জিনিস দেখার কারণে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের শালীনতা নষ্ট হয় : মুফতি আবদুল ওয়াহিদ কাসেমি

সমাজে এখন তালাক ও বিবাহবিচ্ছেদের পরিমাণ যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। রীতিমতো ভয়াবহ পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে এটা। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো বিষয়। এর কারণগুলো চিহ্নিত করতে এবং এ সমস্যা থেকে বেঁচে থাকার উপায় জানতে ইসলাম টাইমস-এর পক্ষ থেকে আমরা কথা বলেছিলাম ঢাকার মিরপুরের জামিয়া ইমদাদিয়া (মুসলিম বাজার মাদরাসার) মুহতামিম মুফতি আবদুল ওয়াহিদ কাসেমির সঙ্গে। তাঁর বক্তব্য নিয়েই আমাদের এ মুখকলাম।


 

পুরুষ ও নারীর ভালোবাসাময় বন্ধনের নাম বিবাহ। বিবাহ একটি সম্মানজনক সম্পর্ক। মানুষের স্বভাবজাত প্রয়োজনকে বিবেচেনা করেই ইসলাম এক ও একাধিক বিবাহের বিধান রেখেছে। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহ নামক মধুর সম্পর্ক টিকে থাকা এবং এর দ্বারা শান্তি লাভ করার জন্য যেসব নির্দেশ ও নসিহত করেছেন সেগুলো যথাযথ আদায় করলে বৈবাহিক সম্পর্ক অটুট থাকে। বিবাহ বিচ্ছেদের মতো চরম দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে না।

বিবাহের সময় খুতবায় যেসব আয়াত ও হাদিস পড়া হয় সেগুলো অত্যন্ত গুরুত্ববহ। প্রতিটি আয়াতে স্বামী ও স্ত্রী উভয়কে তাকওয়া ও আল্লাহভীতির কথা বলা হয়েছে। জীবনব্যাপী সত্য কথা বলার জন্য এবং জীবনের আমলকে সংশোধন করার জন্য তাগিদ দেয়া হয়েছে।

একজন স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে যখন আল্লাহ পাকের ভয় থাকবে, তখন তারা একজন আরেকজনের অবর্তমানে গর্হিত কাজে জড়ানো ও লিপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করে এর থেকে বিরত থাকবে। তাছাড়া মানুষ যখন গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকে তখন আল্লাহ পাকের গায়েবি রহমত ও সাহায্য তার ওপর থাকে। সমাজের মানুষের দিলে তার ব্যাপারে সম্মানবোধ থাকে।

তেমনি স্বামী যখন মুত্তাকি ও খোদভীরু হয় তখন স্ত্রীর অন্তরে স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকে। অনুরূপ স্ত্রী যখন মুত্তাকি ও আল্লাহভীরু হয় তখন স্বামীর অন্তরে স্ত্রীর প্রতি সম্মানবোধ বিরাজ করে। স্বামী-স্ত্রী যখন দুজন দুজনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও আস্থাবান থাকে তখন তাদের জীবনসংসার স্থায়িত্ব লাভ করে।

এর বিপরীতে মানুষ যখন তাকওয়া ছেড়ে দেয় তখন মানুষের প্রতি মানুষের এক ধরনের অবিশ্বাস জন্ম নেয়। এই অবিশ্বাস থেকেই একে অপরের প্রতি আস্থাহীন ও সন্দিহান হয়ে পড়ে। আর এ ধরনের সমস্যা যখন স্বামী-স্ত্রীর মাঝে হয় তখন একসময় সেটার পরিণতি দাঁড়ায় স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ।

এ জন্য আল্লাহ তায়ালা বৈবাহিকজীবনের শুরুতেই বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন- তাকওয়ার জিন্দেগি অবলম্বন করো। স্বামী-স্ত্রী যখন আল্লাহ পাকের এই বিধানের ওপর অটল থাকে, তখন তাদের সম্পর্ক সুন্দর থাকে। মধুময় থাকে। দীর্ঘায়িত হয়। বিচ্ছেদের মতো দুর্ঘটনা তাদের মাঝে ঘটে না।

তালাক ও বিবাহবিচ্ছেদ ঘটা এবং বর্তমানে এর পরিমাণ বেড়ে যাওয়া মূলত একটা সামাজিক অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ। বিবাহবিচ্ছেদ ঘটার পেছনে বড় একটা কারণ অপসংস্কৃতি। আজকে বেশিরভাগ মিডিয়া নাটক-সিনেমা এমনকি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেও অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা প্রচার করছে। মানুষ যখন নাটক-সিনেমায় ইসলামের বিধান বহির্ভূত অবৈধ সম্পর্কের গল্প বারবার দেখে তখন সেগুলো তাদের জীবনের ওপর প্রভাব ফেলে। ব্যক্তিজীবনে তারা সেসব অবৈধ ও অনৈতিক সম্পর্ক গড়তে গিয়ে বিবাহবিচ্ছেদসহ নানা ধরনের অপমানজনক ঘটনা ঘটে।

সারা দুনিয়ায় মুসলমানদের জীবনে বর্তমানে সবচেয়ে বড় হামলাটা করছে মোবাইল ও ইন্টারনেট। নেটের বদৌলতে সহজেই মোবাইল দিয়ে খারাপ ও নোংরা জিনিস দেখার অবাধ সুযোগ থাকার কারণে নারী-পুরুষের শালীনতা নষ্ট হয়। চরমভাবে চরিত্র ও রুচির বিকৃতি হয়। যারা এগুলো দেখে তারা এক নারী ও পুরুষে সন্তুষ্ট থাকতে চায় না। নতুন নারী নতুন পুরুষের সঙ্গে মেশার তাড়না ও নেশা সৃষ্টি হয়। স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে সৃষ্টি হয় নানা ধরনের সংকট ও সমস্যা। যার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে তালাকের মাধ্যমে।

স্বামী-স্ত্রীর মাঝে তালাক ও বিবাহ বিচ্ছেদের কারণে বড় মাত্রার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে সন্তানাদির ওপর। এ সময় তারা মা-বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তাদের ভবিষ্যৎ জীবনটা ভীষণ সংকটের মধ্যে পড়ে। বিবাহ বিচ্ছেদের কারণে মানুষের কর্মজীবনেও প্রভাব পড়ে। ব্যক্তি নিজের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। তার কাজের গতি নষ্ট হয়।

তালাকের কারণে স্বামী-স্ত্রী আলাদা হয়ে যায় বটে। কিন্তু জীবনের প্রথম সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে পুরুষ ও নারী উভয়ে পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশে নানামুখি সমস্যার মুখোমুখি হয়। বিভিন্ন ধরনের অশান্তি ও অসম্মানজনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে।

ইসলামে তালাকের বিধান আছে, তবে সেটা ঘৃণা ও অপছন্দের সঙ্গে। স্বামী যখন স্ত্রীর ওপর জুলুম করে, স্ত্রীর ইসলামসম্মত হক আদায় করে না তখন স্ত্রী চাইলে শরয়ি বিধান মোতাবেক আলাদা হয়ে যেতে পারেন।

এমনিভাবে স্ত্রী যখন স্বামীর কথা মানে না, স্বামীর ইসলামসম্মত হক আদায় করে না তখন স্বামী চাইলে ইসলামি বিধান মোতাবেক স্ত্রীকে আলাদা করে দিতে পারেন। স্বামী-স্ত্রী যদি শরিয়তসম্মত কোনো সমস্যার কারণে কোনোভাবেই একসঙ্গে থাকতে সম্মত না হন তখন ইসলাম তাদের তালাক ও আলাদা হয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। মূলত স্বামী-স্ত্রী যখন তাকওয়া ও আল্লাহর ভয়কে অন্তর ধারণ করে একে অপরের হক আদায় করে যায় তখন তালাক ও বিবাহ বিচ্ছেদের মতো দুর্ঘটনা ঘটে না।

গ্রন্থনা : সাদ আবদুল্লাহ মামুন