মাওলানা আজীজুর রহমান। ৮৫ বছর বয়সী প্রবীণ আলেমেদ্বীন। নেত্রকোনা বড় মসজিদের খতিব। সাবেক প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল, নেত্রকোনা এন আকন্দ আলিয়া মাদরাসা। ষাটের দশকের শুরুর দিকে তিনি লাহোর জামিয়া আশরাফিয়ায় দাওরায়ে হাদিস পড়েছেন। আল্লামা রসুল খান রহ., আল্লামা ইদরিস কান্ধলভি রহ. ছিলেন তার উস্তাদ। জেলা শহর নেত্রকোনায় বসবাস করা এই আলেমেদ্বীনের সঙ্গে তার শিক্ষা-দীক্ষা এবং সমাজ পর্যবেক্ষণ নিয়ে ইসলাম টাইমস-এর পক্ষ থেকে কথা বলেন শরীফ মুহাম্মদ।
ইসলাম টাইমস : আপনার দাওরায়ে হাদিসের পড়াশোনা কোথায় হয়েছে? কোন সময়ে?
মাওলানা আজীজুর রহমান : ১৯৬২ সালে দাওরায়ে হাদিস পড়ার জন্য আমি পাকিস্তানের লাহোর জামিয়া আশরাফিয়ায় ভর্তি হই। দুই বছর সেখানে পড়ি। এক বছর দাওরায়ে হাদিস, পরের বছর ফুনুনাত (বিভিন্ন শাস্ত্রের সমন্বিত পাঠ)।
ইসলাম টাইমস : দাওরার বছর আপনার কয়েকজন বিশিষ্ট উস্তাদের কথা বলবেন?
মাওলানা আজীজুর রহমান : আমরা বুখারি শরিফ পড়েছি হজরতুল আল্লাম ইদরিস কান্ধলভি রহ.-এর কাছে। আর তিরমিহি শরিফ পড়েছি হজরতুল আল্লাম রসুল খান রহ.-এর কাছে। হজরত রসুল খান রহ. ছিলেন তখন প্রায় শতবর্ষী। তিনি হজরত ইদরিস কান্ধলভি রহ.-এর উস্তাদ ছিলেন। মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ., হজরত আতহার আলি রহ. তাদেরও উস্তাদ ছিলেন তিনি।
ইসলাম টাইমস : আপনার বুখারি শরিফের উস্তাদ হজরত ইদরিস কান্ধলভি রহ.-এর কোনো স্মৃতি মনে আছে?
মাওলানা আজীজুর রহমান : আমরা যখন হুজুরের দরসে বসি, তখন তার বয়স ছিল সত্তর থেকে আশির ঘরে। আমি হজরতের কাছে খুব যাতায়াত করতাম। আমাদের ছাত্রাবাস ছিল স্বতন্ত্র একটা জায়গায়। একবার হজরতকে অনুরোধ করলাম আমাদের কামরায় তাশরিফ আনার জন্য। হজরত এলেন। আমরা সেদিন মন ভরে তাঁকে আপ্যায়ন করার সুযোগ পেয়েছিলাম। খুবই আনন্দিত ও সৌভাগ্যবান হয়েছিলাম।
ইসলাম টাইমস : পরের বছর ফুনুনাত পড়েছেন। আপনাদের উস্তাদ কে ছিলেন?
মাওলানা আজীজুর রহমান : হজরতুল আল্লাম ফয়েজ আলি শাহ রহ.।
ইসলাম টাইমস : ওই সময় ওখানে আপনার বাঙালি কোনো সহপাঠীর কথা কি মনে পড়ে?
মাওলানা আজীজুর রহমান : লাহোর জামিয়া আশরাফিয়ায় দাওরার বছর আমাদের সহপাঠী ছিলেন হাটহাজারী মাদরাসার মাওলানা মমতাজুল করীম (বাবা হুজুর), নোয়াখালি কেরামতিয়া আলিয়া মাদরাসার শাইখুল হাদিস মাওলানা রফিকুল্লাহ। আর তখন মক্কীনগরের মাওলানা আলতাফ হোসাইন রহ. ছিলেন শরহে জামি-শরহে বেকায়া এ রকম মধ্যম দিকের কোনো শ্রেণির ছাত্র।
ইসলাম টাইমস : শুনেছি আপনি হজরত মাওলানা আবদুল্লাহ দরখাস্তি রহ.-এর কাছেও কিছু পড়েছেন? এবং পাকিস্তানে আরও…?

মাওলানা আজীজুর রহমান : রমজানের আগে-পরের দুই মাস সময়ে কানপুরে হজরত আবদুল্লাহ দরখাস্তি রহ.-এর কাছে পড়েছি। তাঁর তাফসিরুল কুরআনের দরসে বসেছি। ১৯৬৫ সালের শুরুতে লাহোর থেকে ফিরে আসার সময় করাচিতে হজরতুল আল্লাম ইহতেশামুল হক থানভি রহ.-এর মসজিদে এক মাস ছিলাম। ওই মাস খানেক সময় হজরতুল আল্লাম ইউসুফ বানুরি রহ.-এর দরসে বসার সৌভাগ্য হয়েছে।
ইসলাম টাইমস : দারুল উলুম দেওবন্দের সঙ্গে ছাত্রজমানায় আপনার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল ?
মাওলানা আজীজুর রহমান : দেশে ফিরে আসার সময় দারুল উলুম দেওবন্দ হয়ে আসি। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করি। তখন দেওবন্দের মুহতামিম হজরতুল আল্লাম কারী তাইয়্যেব রহ.। হজরত মাওলানা এজাজ আলি রহ.-ও তখন সেখানে উস্তাদ। আমি তখনকার শাইখুল হাদিস হজরত মাওলানা ফখরুদ্দিন মুরাদাবাদি রহ.-এর বুখারি শরিফের দরসে বসি। তিনিও আমাকে হাদিসের সনদ প্রদান করেন।
ইসলাম টাইমস : জেনেছি, ১৯৬৫ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত নেত্রকোনা এন আকন্দ আলিয়া মাদরাসায় আপনি প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মিফতাহুল উলুমে তিন বছর শাইখুল হাদিস ছিলেন। দ্বীনি খেদমতের ক্ষেত্রে আপনার মনের মধ্যে বিশেষ কোনো তামান্না, বিশেষ কোনো আফসোস কি আছে?
মাওলানা আজীজুর রহমান : একটি খালেস দ্বীনি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা। মন দিয়ে সেখানে কাজ করা। অনেক আগে থেকেই মনের মধ্যে এই আগ্রহটা জেগে আছে। এখনো আছে। বয়স হয়ে গেছে। এমন কিছু করতে পারলে তৃপ্তি পেতাম।
ইসলাম টাইমস : আপনি তো আলিয়া মাদরাসায় দীর্ঘকাল প্রিন্সিপাল ছিলেন। এখন সরকারিভাবে কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
মাওলানা আজীজুর রহমান : স্বকীয়তা বজায় রেখে স্বীকৃতি পাওয়াটা ভালো। এটার দরকার আছে। কিন্তু দারুল উলুম দেওবন্দের নীতি ও নেসাব যেন ঠিক থাকে- এদিকটাতে কঠোর থাকা দরকার। স্বকীয়তায় আঘাত এলে এ রকম স্বীকৃতি ভালো মনে করি না। আলেম হওয়া দরকার। ইলমেদ্বীনের গভীর চর্চা দরকার। যোগ্যতা দরকার। যোগ্য আলেমরা সনদের পেছনে ছুটেন না, তারা দেখেন ইলম আছে কি না। ভালো যোগ্যতা আছে কি না। বরেণ্য ও দেশবিখ্যাত মনীষী আলেমদের তো সনদের স্বীকৃতি ছিল না, যোগ্যতা ছিল। হজরত আতহার আলী রহ., হজরত মুশাহিদ আলী বায়মপুরী রহ., ফখরে বাঙ্গাল তাজুল ইসলাম রহ.-এর মতো মানুষরা যোগ্যতা দিয়ে দ্বীন ও ইলমের খেদমত করেছেন। সনদ কোথায় আছে তারা জানতেনও না। এ জন্য ছাত্ররা যেন সব পরিস্থিতিতে ইলমেদ্বীন হাসিলের বিষয়ে দক্ষ হয়-সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
ইসলাম টাইমস : অস্থিরতা, অসদাচার, দুর্নীতি সমাজের ভেতর ছড়িয়ে পড়ছে। দিন দিন বাড়ছে এ সংকট। এ পরিস্থিতিতে আপনার কোনো পরামর্শ?
মাওলানা আজীজুর রহমান : এটা তো কঠিন একটা বিষয় বললেন। আমাদের কী যোগ্যতা! মুরব্বিদের কিতাব ও উস্তাদদের সংশ্রবে থেকে যেটা বুঝেছি, তাকওয়ার অভাবেই সমাজে অনাচার বাড়ছে। কুরআন শরিফে তাকওয়া অবলম্বনের কথা এতবার বলা হয়েছে। তাকওয়া অবলম্বন করলে দুনিয়াতেও নিরাপত্তা, আখেরাতেও কল্যাণ। কিন্তু এখন তাকওয়া কমতে কমতে নাই হয়ে যাচ্ছে। গত দুই-তিন মাস ধরে মসজিদে এই একটা কথাই বলছি। তাকওয়া বুঝো, তাকওয়া শিখো, তাকওয়া অবলম্বন করো। তাকওয়ার পথে না এলে মানুষ আর সমাজের কোনো সংকটই দূর হবে না।
ইসলাম টাইমস : ইসলাম উপস্থাপন এবং ইসলামের পক্ষ হয়ে কথা বলার জন্য সাংবাদিকতার ময়দানে আগে যুগের আলেমগণ কিছু কিছু কাজ করে গেছেন। এখন তরুণ আলেমরা কিছু চেষ্টা করছে। তাদের উদ্দেশে আপনার কোনো পরামর্শ।
মাওলানা আজীজুর রহমান : এটা দরকারি কাজ। অত্যন্ত ভালো ও উপকারী। যারা এ অঙ্গনে কাজ করছে- তাদের উৎসাহিত করা দরকার। তাদের পাশে দাঁড়ানো দরকার। আর সাংবাদিকতার ময়দানে, লেখালেখির ময়দানে যারা কাজ করছে তাদের প্রতি আমার পরামর্শ, তারা যেন তাদের কাজের ব্যাপারে এবং তাদের ব্যক্তিগত জীবনে সুন্নতের ওপর অটল থাকার চেষ্টা করে। নবীজীবন, সাহাবাজীবনের শিক্ষা ও নীতি সামনে রেখে চলে।
ইসলাম টাইমস : আপনি অনেক সময় দিলেন। আল্লাহ তাআলা আপনাকে জাযায়ে খায়ের দান করুন। বরকতপূর্ণ দীর্ঘ হায়াত দান করুন। আপনাদেরকে অনুসরণ করে চলার তাওফিক আমাদেরকে দান করুন।
মাওলানা আজীজুর রহমান : দোয়া করবেন।
















