মুফতি মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া ।।
কুরআন মাজীদ এবং হাদীস শরীফে ভাড়া তথা ইজারার বৈধতা এবং এর বিধান সম্পর্কে আলোচনা এসেছে। ফিকাহবিদগণ সেগুলোর আলোকে ইজারার বৈধ ও অবৈধ পন্থা, বৈধতার শর্তাবলী এবং অবৈধতার ক্ষেত্রসমূহ ও এক্ষেত্রে করণীয়-বর্জনীয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সেগুলো মেনে চললে ভাড়া চুক্তিটি শরীয়তসম্মত হবে এবং উভয় পক্ষ ইহকাল ও পরকালে এর সুফল ভোগ করবে।
বাড়ি ভাড়ার ক্ষেত্রে ভাড়াটিয়ার জন্য ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে যা যা করণীয় এ লেখায় সেসব মাসআলা ও আলোচনা তুলে ধরা হল।
শরীয়তের দৃষ্টিতে ভাড়াকৃত ভবন/ফ্ল্যাট ভাড়াটিয়ার হাতে আমানত। এর যথাযথ ব্যবহার না করলে বা এক্ষেত্রে অবহেলা করলে সেটি খেয়ানত হবে। তাই বাড়ির সবকিছু যত্ন সহকারে ব্যবহার করতে হবে। সজাগ থাকতে হবে যেন ব্যবহারের ত্রুটির কারণে কোনো জিনিস নষ্ট না হয়। অধিক ময়লা জমে ফ্লোর যেন নষ্ট না হয়। এমনকি বাড়িওয়ালার অনুমতি ছাড়া দেয়ালে অধিক পেরেক ইত্যাদি মারা থেকেও বিরত থাকা উচিত।
ব্যবহারকারীর সীমালংঘনের কারণে কোনো জিনিস নষ্ট হলে এর ক্ষতিপূরণ ভাড়াটিয়াকেই দিতে হবে। অবশ্য সীমালংঘন ছাড়া সাধারণ ব্যবহারের কারণে কোনো কিছু নষ্ট হয়ে গেলে নতুন পার্টস কিনে দেওয়া বা মেরামত করে দেওয়ার দায়িত্ব বাড়িওয়ালার। যেমন পানির কল নষ্ট হয়ে গেলে, বাথরুমের লোডাউন বা কোনো ফিটিংস নষ্ট হয়ে গেলে। তেমনি দরজা-জানালা, পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের লাইনে কোনো সমস্যা হলে এগুলো ঠিক করে দেওয়ার দায়িত্বও বাড়িওয়ালার। এগুলো ভাড়াটিয়ার উপর চাপানো যাবে না।
এ কথাও বুঝা দরকার যে, একটি জিনিস যে ভাড়াটিয়ার কাছে নষ্ট হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে এ ভাড়াটিয়ার একক ব্যবহারের কারণেই নষ্ট হয় না; বরং আগের ভাড়াটিয়ার দীর্ঘদিনের ব্যবহারও এর কারণ হয়ে থাকে। তাই কল এবং ফিটিংস ইত্যাদি লাগিয়ে দেওয়া এবং ব্যবহার উপযোগী করে দেওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে বাড়িওয়ালারই দায়িত্ব। এগুলো নষ্ট হয়ে গেলে ভাড়াটিয়া থেকে তা আদায় করা অন্যায়। মনে রাখা দরকার, ভাড়া বস্তুর কোনো কিছু সাধারণ ব্যবহারে নষ্ট হলে তার মেরামত করা মালিকেরই দায়িত্বে।
সিকিউরিটি মানি প্রসঙ্গ
বাড়ির মালিকগণ ভাড়াটিয়া থেকে অগ্রীম কিছু টাকা সিকিউরিটির জন্য নিয়ে থাকে। এই অগ্রীম টাকা আদায়ের বিভিন্ন নিয়ম থাকে। নিয়মের ভিন্নতার কারণে এর হুকুম ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন-
১. কারো এমন নিয়ম থাকে যে, এক বা দুই মাসের ভাড়া অগ্রীম দিতে হবে। যা বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার সময় শেষ দুই মাসের ভাড়া হিসেবে ধরা হবে। এক্ষেত্রে তা ফিকহে ইসলামীর দৃষ্টিতে অগ্রীম ভাড়া হিসেবে ধর্তব্য হবে। সিকিউরিটি মানি তথা বন্ধক হিসেবে গণ্য হবে না।
২. দোকান বা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়ার জন্য দুই-তিন লাখ বা আরো বেশি টাকা অগ্রীম নেয়া হয়। এরপর মাসে মাসে কিছু কিছু করে সকল টাকা ভাড়ার সাথে কেটে নেয়। পরবর্তীতে ফেরতযোগ্য হিসেবে কিছুই রাখা হয় না। এমনটি হলে এটাও অগ্রীম ভাড়া হিসেবে গণ্য হবে।
এই দুই ক্ষেত্রে অগ্রীম হিসাবে যা নেওয়া হয় সে টাকার মালিক বাড়িওয়ালাই হবে। সুতরাং এ টাকা সে নিজ প্রয়োজনে খরচ করতে পারবে এবং এটি তার যাকাতযোগ্য সম্পদ বলে গণ্য হবে। তাই যাকাতবর্ষ শেষে এ টাকা থেকে কিছু অবশিষ্ট থাকলে তাকেই এর যাকাত দিতে হবে। ভাড়াটিয়াকে এর যাকাত দিতে হবে না।
৩. আর যদি অগ্রীম নেওয়া এই টাকা থেকে ভাড়া হিসাবে কোনো কিছু কাটা না হয় এবং চুক্তি শেষ হওয়ার আগের মাসগুলোর ভাড়া হিসাবেও গণ্য করা না হয়, বরং ভাড়াটিয়া বাড়ি ছাড়ার সময় তাকে এ টাকা ফেরত দেওয়ার শর্ত করা হয় তাহলে এই টাকা সিকিউরিটি মানি বলে গণ্য হবে।
ফিক্বহী দৃষ্টিকোণ থেকে সিকিউরিটি মানি রাহান তথা বন্ধকী সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত। আর বন্ধকগ্রহিতার জন্য বন্ধকী বস্তু দ্বারা উপকৃত হওয়া জায়েয নেই। সে হিসেবে বাড়ির মালিকের জন্য এই অগ্রীম টাকা খরচ করা জায়েয নয়। সাধারণ নিয়মে টাকাগুলো নিজের কাছে বা ব্যাংকে রেখে দেওয়া আবশ্যক। কিন্তু আজকাল অনেক বাড়িওয়ালা বন্ধকের উক্ত নিয়ম মেনে চলে না। বরং প্রায় সবাই এ টাকা খরচ করে ফেলে। জমা রাখে না। তাই কোনো কোনো ফকীহ এই খরচকে বৈধতা দেওয়ার জন্য এই টাকাকে বন্ধক না ধরে ঋণ বলতে চান। আর এটাকে ভাড়ার সাথে শর্ত না করে ভিন্নভাবে লেনদেন করতে বলেন। তাদের ভাষ্যমতে এভাবে করলে বাড়িওয়ালার জন্য তা ব্যবহার করা বৈধ হবে। অবশ্য অন্য অনেক ফহীহ এটাকে সিকিউরিটি তথা বন্ধকই বলেন। দলীলের দিক থেকে এ মতটিই শক্তিশালী।
প্রকাশ থাকে যে, এ টাকাকে বন্ধক ধরা হলে সমস্যা হল বাড়িওয়ালার জন্য তা ব্যবহার করা জায়েয নয়। আর ঋণ ধরা হলে সমস্যা হল, ভাড়ার সাথে ঋণ প্রদানের শর্ত করার কারণে ভাড়া-চুক্তি ফাসেদ হয়ে যায়। এ কারণে সিকিউরিটি মানির ক্ষেত্রে নিচের যে কোনো একটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা নিরাপদ।
১. একে অগ্রীম ভাড়া ধরা। অর্থাৎ বাড়ি ছেড়ে দেওয়ার সময় শেষের দিকের মাসের ভাড়া ধরা হবে এবং সে অনুযায়ী আমল করা হবে। আর অগ্রীমের পরিমাণ বেশি হলে প্রতি মাসেই নগদ ভাড়ার সাথে একটা অংশ ভাড়া হিসাবে কর্তন করা হবে। এ টাকা পরবর্তীতে ফেরতযোগ্য হিসেবে ধরা হবে না। এভাবে অগ্রীম ভাড়া ধরা হলে এর মালিক বাড়িওয়ালাই হবে। এক্ষেত্রে সে তা ব্যবহার করতে পারবে এবং যাকাতও সেই আদায় করবে।
২. কোনো কোনো সময় বাড়িওয়ালা সিকিউরিটির টাকা দিয়ে বাড়ির সজ্জায়ন করে বা ফিটিংস ইত্যাদি লাগায়।
এক্ষেত্রে ভাড়াটিয়ার সাথে নিম্নোক্ত পদ্ধতিতে চুক্তি করা যেতে পারে। ভাড়াটিয়া এসব কাজ নিজ দায়িত্বে বা বাড়িওয়ালার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী নিজের টাকা দিয়ে করে নিবে এবং তা ভাড়াটিয়ার মালিকানা হিসেবে গণ্য হবে। এরপর যখন বাসা ছেড়ে দেবে তখন বাড়িওয়ালার নিকট একটি দাম ধরে জিনিসগুলো বিক্রি করে দেবে। এ পন্থা অবলম্বন করলে বন্ধক নিয়ে তা খরচ করার জটিলতাও থাকে না। আবার যাকাত কে দেবে এই প্রশ্নও আসে না। কেননা ভাড়াটিয়া যেহেতু ঐ টাকা খরচ করে ফেলেছে তাই তার উপর এর যাকাত আসবে না। আর বাড়িওয়ালাও এ টাকার মালিক হয়নি বিধায় তাকেও এর যাকাত দিতে হবে না।
ভাড়াটিয়ার জন্য অন্যকে ভাড়া দেওয়া
নিজের জন্য ভাড়া নিয়ে মালিকের অনুমতি ব্যতীত অন্যকে ভাড়া দেওয়া ভাড়াটিয়ার জন্য জায়েয নেই। সুতরাং মালিকের অনুমতি ব্যতীত সাবলেট নেওয়া বা অন্যকে ভাড়া দেওয়া ভাড়াটিয়ার জন্য বৈধ নয়। তবে মালিক অনুমতি দিলে অসুবিধা নেই।
আর নিজে ভাড়া নিয়ে পুরোটাই অন্যকে বেশি দামে ভাড়া দেওয়ার জন্য দু’টি শর্ত আছে।
১. এজন্য বাড়িওয়ালার অনুমতি নিতে হবে।
২. বেশি ভাড়া নিতে চাইলে ঐ বাড়িতে উন্নয়নমূলক কোনো কাজ করতে হবে। যেমন ডেকোরেশন করা, দরজা বা টাইলস লাগানো ইত্যাদি। আর সংস্কারমূলক কাজ বাড়ির মালিকের অনুমতি নিয়েই করতে হবে। নিজে ভাড়া নেওয়ার পর সংস্কারমূলক কোনো কাজ না করে বেশি টাকায় ভাড়া দেওয়া জায়েয হবে না।
লেখক : নায়েবে মুফতি, ফতোয়া বিভাগ, মারকাযুদ দাওয়া আলইসলামিয়া ঢাকা
(বাড়ি ভাড়া বিষয়ে জরুরি আরও কিছু প্রসঙ্গের আলোচনা সামনে আসবে, ইনশাআল্লাহ।)
















