সংখ্যালঘু ‘তত্ত্বের’ ব্যবসা আবার জমজমাট

সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর  ।।  

‘সংখ্যালঘু নির্যাতন’ বিষয়ে বেশ ঘটা করে আবার আলোচনা শুরু করেছে দেশের বুদ্ধিজীবী গোছের ব্যক্তি, কিছু সংগঠন ও এনজিও। আসন্ন সংসদ নির্বাচন নিয়ে শংকা প্রকাশ করে তারা বলছেন, ‘নির্বাচনে সহিংসতার আশঙ্কায় অনেক সংখ্যালঘু দেশ ছাড়ছেন, অনেকে ব্যাগ গুছিয়ে অপেক্ষা করছেন পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা দেখার জন্য।’

গতকাল শনিবার (১৭ নভেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘জাতীয় নির্বাচন: সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা’ নামে একটি আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। সে অনুষ্ঠানে বক্তারা এমন আশংকা প্রকাশ করেন। এ অনুষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল।

সুলতানা কামাল বহু আগে থেকেই এ দেশে সংখ্যালঘু তত্ত্বের সবচে বড় বিক্রেতা। নানা জায়গায় তিনি সংখ্যালঘু তত্ত্ব বেচাকেনা করে বেড়ান। দেশে এবং বিদেশে। তিনি মানবাধিকার এবং এনজিওকর্মী। এসব কর্মসূচি চালিয়ে নেওয়ার জন্য বিদেশ থেকে বিশেষ ফান্ড আসে। সেই ফান্ড জায়েজ করার জন্যই তাকে বার বার গণমাধ্যমে সংখ্যালঘু তত্ত্ব নিয়ে হাজিরা দিতে হয় কি না কে জানে। এটা একটা রুটিনওয়ার্ক। সামনে নির্বাচন, তাই তার রুটিনওয়ার্কের পরিধিও বেড়ে গেছে!

সংখ্যালঘু নিয়ে এই যে হম্বিতম্বি, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর বাস্তবতা আসলে কতটুকু? কালকের এই অনুষ্ঠানের বিভিন্ন বক্তব্য নিয়েই আমরা একটা পর্যালোচনা করতে পারি।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা। তিনি তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, ‘১৯৭৪ সালের আদমশুমারিতে বাংলাদেশে হিন্দু জনগণ ছিল ১৩ দশমিক ৫ এবং ১৯৮১ সালে ১২ দশমিক ১৩ শতাংশ। এরপর ২০০১ সালে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২০১১ সালের আদমশুমারিতে তা দাঁড়ায় মাত্র ৮ শতাংশে।’

এই পরিসংখ্যানের দিকে দেখলে সবাই মনে করবে, ঘটনা তো সত্যি। সংখ্যালঘুদের হার তো বাংলাদেশে ক্রমেই কমে যাচ্ছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, জনসংখ্যা বাড়ে জ্যামিতিক হারে, গাণিতিক হারে নয়। ১৯৭৪ সালে ৮৫ শতাংশ মুসলমান জনসংখ্যা বেড়েছে ৮৫ শতাংশ হারে। অন্যদিকে ১৩ শতাংশ হিন্দু বেড়েছে ১৩ শতাংশ হারে। সুতরাং স্বাভাবিক হারেই দুই ধর্মের লোকজনের প্রবৃদ্ধি দু রকম হয়েছে।

এই সাধারণ গাণিতিক বিষয়টা অন্তত তাদের বুঝা উচিত ছিল।

অনুষ্ঠানে সুলতানা কামাল বলেন, ‘সংখ্যালঘুদের ওপর সারা বছর নির্যাতনের পাশাপাশি নির্বাচনের সময় তা প্রকট আকার ধারণ করে।’

এটা খুবই স্বাভাবিক চিত্র যে, নির্বাচনের পর পর সারা দেশে একটা সহিংসতা দেখা দেয়। সেটা বিজয়ী দল পরাজিত দলের নেতাকর্মীদের ওপর করে, আবার পরাজিত দলও প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে বিজয়ী দলের চিহ্নিত নেতাকর্মীর ওপর চড়াও হয়। এ ধারা বহুদিন ধরে চলে আসছে। প্রতি সংসদ বা স্থানীয় নির্বাচনের পরই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।

এই ধারাবাহিকতায় সারা দেশের কিছু সংখ্যালঘু নেতাকর্মীর বাড়িতেও আক্রমণ হয়। সেটা সংখ্যালঘু বলে নয়, বরং দলগত জয়-পরাজয়ের কারণে হয়। দশজন মুসলিম নেতার বাড়িতে আক্রমণ হলে একজন হিন্দু নেতার বাড়িতে আক্রমণ হতেই পারে। যেহেতু তারাও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এবং প্রতি ১০০ জনের মধ্যে তারাও ১০ জন।

এগুলো রাজনৈতিক আক্রমণ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু বলে আক্রমণের কোনো সুযোগ এখানে নেই।

অনুষ্ঠানে একাধিক আলোচক উল্লেখ করেন যে সংখ্যালঘু হামলার ঘটনা পরবর্তী মামলাগুলোতে কোনো বিচার হয় না। কিংবা বিচার হলেও সেটা অনেক দেরিতে হয়।

এর সঠিক উত্তর দিয়েছেন আমাদের আইনমন্ত্রী নিজেই। এ বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ন্যাশনাল জাসটিস কো-অর্ডিনেশন কমিটির কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক তার বক্তব্যে বলেন, ‘বর্তমানে দেশে প্রায় ৩৩ লাখ মামলার জট তৈরি হয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক মামলা জটের অন্যতম কারণ হচ্ছে বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের যোগাযোগের সমন্বয় ও সহযোগিতার অভাব।’

বাংলাদেশের জনগণ যদি হয়ে থাকে ১৭ কোটি, সেই ১৭ কোটি জনগণের নিষ্পত্তিহীন মামলা রয়েছে ৩৩ লাখ! এখন ভেবে দেখবার বিষয় হলো, এই ৩৩ লাখ নিষ্পত্তিহীন মামলার কতগুলো সংখ্যালঘু মামলা। হতে পারে সর্বোচ্চ ৫০০টি।

তাহলে ৩৩ লাখ মামলার মধ্যে সংখ্যালঘু হামলার ৫০০টি মামলা যদি নিষ্পত্তিহীন থেকে যায়, সেটাকে কি ধর্মীয় সন্ত্রাস বলা যাবে, নাকি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বলতে হবে? নাকি বুদ্ধিজীবীদের অপরিপক্ক মস্তিষ্কের অজ্ঞতা?

সংখ্যালঘুদের নিয়ে এমন ব্যবসা করছে আমাদের গণমাধ্যম থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী, এনজিও, সংগঠন, রাজনৈতিক দল এমনকি খোদ সরকারও।

সংখ্যালঘু ইস্যুতে গণমাধ্যমের এ যেন এক মজাদার প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বরগুনায় কোনো মুসলিম ছেলের প্রেমে পড়ে কোনো হিন্দু মেয়ে আত্মহত্যা করলে খবরের শিরোনাম হয় ‘বরগুনায় মুসলিম যুবকের প্ররোচনায় সংখ্যালঘু যুবতীর আত্মহত্যা’। জমিজমা নিয়ে পাবনায় হিন্দু-মুসলিম প্রতিবেশীর বিরোধ হলে শিরোনাম ‘সংখ্যালঘুর জমি আত্মসাৎ করে নিল মসজিদের সভাপতি’। রাজনৈতিক কারণে হামলা হলে ‘সংখ্যালঘুদের বাড়িতে হামলা চালালো উত্তেজিত মুসল্লিরা’।

সংবাদমাধ্যমের এই যে দ্বৈতনীতি, একদিকে তারাই বলছে সংখ্যালঘুদের সমতা দিতে হবে; আবার তারাই তাদের অভিহিত করছে ‘সংখ্যালঘু’ নামে, নাম নিয়ে তারাই তাদের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করছে।

কেন ভাই? কেন হিন্দু বলে আপনারা তাদের ‘সংখ্যালঘু’ পদবী দিয়ে একঘরে করে রাখেন? কেন বার বার তাদের সামনে সংখ্যালঘু সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেন?

তারা কি বাংলাদেশের নাগরিক নয়? তারা কি বাংলাদেশি নয়? এই বাংলাদেশের সংবিধান কি তাদের জন্য রচিত হয়নি? বাংলাদেশের বিচার বিভাগ কি তাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি? তাদের কি ভোটাধিকার নেই?

একজন হিন্দুর যে অধিকার বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রে, একজন মুসলমানেরও সমান অধিকার। তাহলে কেন আপনারা মানুষের সামনে মিথ্যা চিত্র তুলে ধরে তাদের সংখ্যালঘু বলে অপমান করছেন?

এই বাংলাদেশ সব ধর্মের মানুষের দেশ। এখানে মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-চাকমা-সাঁওতাল-উপজাতি বলে কাউকে অপমান করার অধিকার আপনাদের কেউ দেয়নি। তাদের অপমান করে সভা-সেমিনার করাটা মানবাধিকারের কোনো ধারার মধ্যে পড়ে না। বরং এটা চরমভাবে মানবাধিকার লংঘন। মানবাধিকার লংঘনের দায়ে আপনাদের বিচার হওয়া উচিত।

এসব বুদ্ধিজীবী শ্রেণির এ ধরনের সভা-সেমিনার বরং সংখ্যালঘুদের মনে আরও ভয় ধরিয়ে দেয়া হয়। যারা জীবনে কোনোদিন সংখ্যালঘু বলে নিজেদের চিন্তাই করেনি তারাও শঙ্কিত হয়ে পড়ে- ‘সত্যি কি এমন হয়?’ ‘আমাদের ওপরেও তাহলে নির্যাতন হবে?’ ‘নির্বাচনের পর আমাদেরও কি হামলার শিকার হতে হবে?’

সম্প্রীতির বাংলাদেশে এক শ্রেণির ‘এনজিও ব্যবসায়ী’ দু দিন পর পর সংবাদ সম্মেলন আর সভা-সেমিনার করে এভাবেই মানুষের মনে সাম্প্রদায়িকতার ভয় ছড়িয়ে দিচ্ছে। তারা নিজেরা অসাম্প্রদায়িকতার জিগির তুললেও বাস্তবিকপক্ষে বাংলাদেশের সবচে বড় সাম্প্রদায়িক জনগোষ্ঠী হলো এই বুদ্ধিজীবী আর সুশীল সম্প্রদায়।

এদের দূরভিসন্ধি থেকে সকল ধর্ম ও শ্রেণি-পেশার মানুষ যত দূরে থাকবে বাংলাদেশের জন্য সেটাই সবচে মঙ্গলজনক।

পূর্ববর্তি সংবাদহাজি আবদুল ওয়াহাব রহ.-এর বিদায় : দেশের শীর্ষ আলেমদের শোক ও স্মরণ
পরবর্তি সংবাদমনোনয়ন ফরম বিক্রিতে এগিয়ে বিএনপি, ইসলামি দলগুলোতে খেলাফত আন্দোলন