ইসলামি শিক্ষাই পারে জাতিকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে : মাওলানা আবু তাহের জিহাদি

[সারা দেশে মাদক, বিশেষত ইয়াবার সয়লাব ভয়াবহ রকমের বেড়ে গেছে। গণমাধ্যমগুলোতে প্রতিদিনই সংবাদ আসছে- মাদক ব্যবসায়ী নিহত, ইয়াবার চালান আটক, বন্দুকযুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসায়ী নিহত।… সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাদকের বিরুদ্ধে কঠিন অবস্থান নেওয়ার পরও কেন দেশ থেকে মাদক নির্মূল হচ্ছে না! এ বিষয়টি নিয়ে ইসলাম টাইমস-এর পক্ষ থেকে আমরা কথা বলেছি ঢাকা কল্যাণপুরের জামিয়া ইমদাদিয়ার মুহতামিম মাওলানা আবু তাহের জিহাদির সঙ্গে। তার সেই কথামালা নিয়ে এই মুখকলাম।] 


 

মাদকের ক্ষতি আজ সবার কাছে স্পষ্ট ও প্রকাশ্য। তার পরও এটা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে না কেন? এর ব্যবহার না কমে দিন দিন বাড়ছে কেন? এই প্রশ্ন আজ অনেকের মনে। আমরা বলব, দেশব্যাপী মাদক ও ইয়াবা সয়লাবের প্রধান ও প্রথম কারণ, আমাদের স্কুল-কলেজগুলোতে ধর্মীয় শিক্ষার অভাব। যদি শিক্ষাধারায় প্রাথমিক স্তর থেকে বাস্তবমুখি ইসলামি শিক্ষা থাকে, তাহলে দেশে মাদক এতটা ভয়াবহভাবে বিস্তার লাভ করবে না। ইসলাম মানুষকে নৈতিকতা, শালীনতা ও আল্লাহর ভয় শিক্ষা দেয়। বিরত রাখে যাবতীয় খারাপ পথ ও নেশা থেকে। এটিকে এড়িয়ে অন্য যে কোনো উপায়ে মাদক দমন করার চেষ্টা করা হোক, সফলতা আসবে না। আসছেও না। যেটা আজকে সবার সামনে।

শরিয়তে যাবতীয় মাদক ও নেশাকর বস্তু হারাম। এগুলো খাওয়া ও পান করা চরম শাস্তিকর অপরাধ। দুনিয়াতে এবং আখেরাতেও। ইসলামের এই শিক্ষা ও বোধ যারা ধারণ করেন, তারা মাদক থেকে দূরে থাকেন। দেখুন, ধার্মিক মুসলমানরা কিন্তু মাদক-ইয়াবা বা এ জাতীয় কোনো নেশায় লিপ্ত নয়। মাদক বিকিকিনির পেশায় তো নয়-ই। বাস্তবতা এবং সামাজিক অভিজ্ঞতাও কিন্তু এ কথা বলে- ইসলামই পারে মাদককের ছোবল থেকে মানুষকে বাঁচাতে; অন্য কোনো কিছু নয়।

মাদক ও ইয়াবার ব্যবসা যারা করে, তারা মাদকসেবীদের চেয়েও বড় অপরাধী। তাদের কারণেই দেশে মাদকের বিস্তার ঘটে। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। মাদকসেবীদের তুলনায় মাদকব্যবসায়ীর সংখ্যা সামান্য। এই অল্প কিছু লোককে যদি দমন করা যায় তাহলে কিন্তু একটা দেশ সহজেই মাদকমুক্ত হয়ে যায়। গণমাধ্যমগুলোতে খবর প্রকাশ হয়, যারা মাদক ও ইয়াবা থেকে দেশকে মুক্ত রাখবেন বলে মনে করা হয়, তাদেরই কেউ কেউ এগুলোর সঙ্গে জড়িত। একটা দেশের জন্য এটা বড়ই দুঃখজনক বিষয়।

জীবননাশক মাদক ও ইয়াবা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে রাজধানী পর্যন্ত আসে কীভাবে? শহর থেকে শহর, গ্রাম থেকে গ্রামে এগুলো বিস্তার ঘটে কীভাবে? এটা একটা প্রশ্ন। আমাদের দেশের নেতৃবৃন্দ এবং দায়িত্বপালনকারী বিভিন্ন সংস্থা ও বাহিনী যদি এ বিষয়ে আন্তরিক থাকেন তাহলে মাদক এতটা বেপরোয়া উঠার কথা না।

মাদকের ব্যাপারে সরকার ও বাহিনীগুলো কঠোর। তারপরও দেখা যায় মাদক ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। মাদকের বিস্তার ও ব্যবসা অব্যাহত আছে। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, মাদকব্যবসায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলে দেশে মাদক থাকবে না। এ বিষয়ে যদি সরকার আইনকে যথাযথ কার্যকর করেন তাহলে মাদকের বিস্তার বন্ধ হবে এবং জাতির মাদকাসক্ত একটা বড় শ্রেণিও কিন্তু বেঁচে যাবে। সেইসঙ্গে মাদকও নিয়ন্ত্রিত হবে।

আরেকটা বিষয় হলো, মাদকের নিয়ন্ত্রণ নয়, মাদক নির্মূল করা দরকার। নিয়ন্ত্রণ মানে যারা বলেকয়ে খাবে তারা ঠিক আছে, যারা যোগাযোগ করে অনুমতি নিয়ে খাবে না তাদের শাস্তি দেওয়া হবে- এমনটা নয়। মাদক সম্পূর্ণ হারাম। মাদককে নিয়ন্ত্রণ নয়, সমূলে নির্মুল করা উচিত। কোনোভাবেই মাদকের বিস্তার ঘটার সুযোগ রাখা উচিত নয়।

কেউ কেউ বলেন, মেডিসিনসহ কিছু কিছু ক্ষেত্রে মাদক প্রয়োজন হয়। কিন্তু সারা দেশে সয়লাব হওয়া মাদক ও ইয়াবা নেশা করা ছাড়া কী কাজে ব্যবহৃত হয়! এসব মাদক তো সরাসরি আমাদের তরুণ ও যুবসমাজ ধ্বংস করছে। প্রজন্মকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। মাদকের কারণে হাজার হাজার পরিবার শেষ হয়ে যাচ্ছে। সমাজে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। মাদকের কারণে স্বাস্থ্যগত, আর্থিক, পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় ক্ষতির কথা চিন্তা করে যে কোনো সুস্থ্ মানুষই বলবে মাদক নিয়ন্ত্রণ নয়; নির্মূল হওয়া উচিত।

আরও পড়ুন : তরুণদের প্রতি মনোযোগী না হলে তাদের বিপথগামিতার পথ মসৃণ হবে : মাওলানা আবদুর রাজ্জাক নদভী

মাদক নির্মূলের ক্ষেত্রেও এসে যায় ইসলামের কথা। দেশে চার লাখ মসজিদ আছে। শরিয়তে মাদকের দুনিয়া ও আখেরাতে যেসব ক্ষতি রয়েছে, সে বিষয়গুলো দরদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন আমাদের ইমাম ও খতিবগণ। এতে সমাজের সব স্তরের ঈমানদার মুসলমানরা সচেতন হবেন, সতর্ক হবেন। আমরা শতভাগ দৃঢ়তার সঙ্গেই বলতে পারি, ইসলামি শিক্ষা এবং ধর্মীয় উপলব্ধিই পারে এই দেশ ও জাতিকে মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে রক্ষা করতে।

অনুলিখন : সাদ আবদুল্লাহ মামুন