‘নির্বাচন উপলক্ষে মাহফিলের ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ ধর্মীয় অধিকারে হস্তক্ষেপের শামিল’

আতাউর রহমান খসরু ।।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত নতুন করে কোনো ওয়াজ-মাহফিল, ধর্মীয় সভার অনুমতি না দেয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। পূর্ব থেকে নির্ধারিত ওয়াজ-মাহফিল ও ধর্মীয় সভাগুলোও সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুমতি সাপেক্ষে করতে হবে।

গতকাল মঙ্গলবার এই মর্মে ইসির যুগ্ম-সচিব ফরহাদ আহাম্মদ খান স্বাক্ষরিত চিঠিতে নির্দেশনাটি সব রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়।

নির্দেশনায় বলা হয়, নির্বাচন উপলক্ষে ঘোষিত পুনঃনির্ধারিত সময়সূচী অনুসারে ৩০ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এই সময়ে কোনো ধর্মীয় সভা, ওয়াজ মাহফিল ইত্যাদি অনুষ্ঠানের নতুনভাবে কোনো তারিখ নির্ধারণ না করার জন্য অথবা স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ কর্তৃপক্ষের অনুমতি গ্রহণপূর্বক সভা, ওয়াজ মাহফিল অনুষ্ঠানের জন্য কমিশন সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। তবে যেসব ধর্মীয় সভা, ওয়াজ মাহফিলের তারিখ ইতোমধ্যে নির্ধারিত হয়েছে অথবা বিশেষ কারণে একান্তই আয়োজনের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুমতিক্রমে আয়োজন করতে হবে।

পড়তে পারেন : নির্বাচনের আগে আর কোনো ওয়াজ-মাহফিল নয় : ইসি

একইভাবে বলা হয়, পূর্ব নির্ধারিত ও বিশেষ বিবেচনায় অনুষ্ঠিতব্য ধর্মীয় সভা, ওয়াজ মাহফিলে নির্বাচনে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক কোন প্রার্থী, রাজনৈতিক দলের সদস্য বা কেউ নির্বাচনী প্রচারণা বা কারো পক্ষে বক্তব্য না করার জন্য নির্বাচন কমিশন বিশেষভাবে নির্দেশনা প্রদান করেছেন।

নির্বাচনের ৪০দিন বাকি থাকতেই কমিশনের এই নির্দেশনায় বিস্মিত হয়েছেন সাধারণ দ্বীনপ্রাণ মানুষ ও উলামায়ে কেরাম। তারা মনে করছেন, নির্বাচনের পরিবেশ রক্ষার নামে ধর্মীয় সভা ও ওয়াজ-মাহফিলের উপর বিধি-নিষেধ আরোপ করে নির্বাচন কমিশন মানুষের ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ন করেছে।

অন্য কোনো ধরনের সভা-সমাবেশ ও জমায়েতের উপর বিধি-নিষেধ আরোপ না করে শুধু ওয়াজ-মাহফিল ও ধর্মীয় সভার উপর বিধি-নিষেধ আরোপ করায় এর পেছনে ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্যও থাকতে পারে মনে করছেন কেউ কেউ।

তারা বলেন, ওয়াজ-মাহফিলের ভরা মৌসুমখ্যাত এই সময়ে এই বিধি-নিষেধ মানুষের দ্বীনি শিক্ষার সুযোগই শুধু নষ্ট করবে না, মাদরাসা, মসজিদ ও দ্বীনি সংগঠনগুলোও নানানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

একইভাবে ইসলামি রাজনীতিবিদরা মনে করছেন, এমন বিধি-নিষেধ তাদের নির্বাচনী কার্যক্রমের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

আরও পড়ুন : মাহফিলে নির্বাচনী প্রচারণায় নিষেধাজ্ঞা : কী বলেন ইসলামি চিন্তাবিদরা

বিশিষ্ট আলেম ও ইত্তেফাকুল উলামা, ময়মনসিংহ-এর মজলিসে আমেলার সভাপতি মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ সাদি মনে করেন নির্বাচন কমিশনের এমন সিদ্ধান্ত মানুষের ধর্মীয় অধিকারের উপর হস্তক্ষেপের শামিল।

তিনি বলেন, ‘আমি এটাকে ধর্মীয় অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ বলে মনে করছি। যেহেতু অন্য কোনো ধরনের অনুষ্ঠানের উপর বিধি-নিষেধ আসেনি তাই আমি বিষয়টিকে আমার কাছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে হচ্ছে। নির্বাচনের স্বার্থে এমন নির্দেশনা জারি করে থাকলে তাদের উচিত ছিলো আচরণ বিধির সঙ্গে মিলিয়ে একটি নির্দেশনা জারি করা।’

জামিয়া শরঈয়া মালিবাগের সিনিয়র মুহাদ্দিস মাওলানা আবু সাবের আবদুল্লাহও বিষয়টিকে মানুষের ধর্মীয় অধিকারের উপর হস্তক্ষেপ মনে করেন। তার ভাষায়, ‘এটা অন্যায় হস্তক্ষেপ। কারণ, তা মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করে।’

তারা উভয়-ই মনে করেন, ধর্মীয় সভার উপর বিধি-নিষেধ আরোপ করার কারণে মানুষ দ্বীনি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে দ্বীনি প্রতিষ্ঠান ও দ্বীনি সংগঠন।

মাওলানা সাদি বলেন, ওয়াজ-মাহফিলের তারিখগুলো অন্তত ছয় মাস আগে নির্ধারণ করা হয়। এতো দিনে মাহফিলের অনেক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে আয়োজকরা। হঠাৎ করে মাহফিল বন্ধ হলে তারা ক্ষতিগ্রস্থ হবে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষও অপেক্ষায় থাকে মাহফিলের জন্য। এখান থেকে তারা সারা বছর দ্বীনের উপর চলার পাথেয় অর্জন করে। মাহফিল বন্ধ হলে মানুষ পাপ-পঙ্কিলতার পথ পরিহার করার কারণে সমাজ ও রাষ্ট্রের যে উপকার হতো তাও বন্ধ হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন সাধারণভাবে মাহফিল বন্ধ না করে মাহফিলে রাজনৈতিক আলোচনা ও ভোট চাওয়ার উপর বিধি-নিষেধ আরোপ করতে পারতো। সাধারণভাবে সব মাহফিলের উপর বিধি-নিষেধ আরোপ করা ঠিক হয়নি।’

মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ সাদি খানিকটা ক্ষোভ নিয়ে বলেন, ‘আমাদের দাবি কোনো রাজনৈতিক প্রার্থীও যেন সালাম দিতেও মাহফিলে না আসে। এ বিষয়টিও ইসি যেন নিশ্চিত করে। এটা তো তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না?’

তবে মাওলানা আবু সাবের আবদুল্লাহ বিষয়টিকে ভিন্নভাবে তুলে ধরেন। তার বিশ্লেষণ হলো, ওয়াজ-মাহফিলে ইসলামি রাজনীতির আলোচনা হতে পারে। কারণ, ভোট দেয়া না দেয়ার ব্যাপারে শরিয়তের নির্দেশনা আছে এবং মাপকাঠি আছে সে অনুযায়ী জনগণকে নির্দেশনা দেয়া উলামায়ে কেরামের দায়িত্ব।

তিনি আরও বলেন, ‘উলামায়ে কেরাম শরিয়ত অনুযায়ী যা বলা প্রয়োজন তা বলবেনই। শরিয়ত উলামায়ে কেরাম যা বলার অবকাশ দিয়েছে এবং নির্দেশ দিয়েছে তা তাদের বলতে হবে। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের বিধি-নিষেধ মান্য করা আবশ্যক না।’

ইসির এমন সিদ্ধান্তে ইসলামি দলগুলো ভোটের রাজনীতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন মাওলানা আবু সাবের আবদুল্লাহ।

আরও পড়ুন : হাজার বছরের ওয়াজ-মাহফিল কীভাবে বন্ধ করবেন?

আসলেও কি ওয়াজ-মাহফিল ও ধর্মীয় সভার কারণে মাহফিলের পরিবেশ নষ্ট হয়? মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ সাদি মনে করেন মাহফিলের কারণে নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট হয় না। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না, ওয়াজ-মাহফিলের কারণে নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট হয়। সেটা নির্বাচনের দুইদিন আগ পর্যন্ত চললেও হবে না। সাধারণভাবে মাহফিল বন্ধ করে দেয়ার কোনো যুক্তি নেই।’

তার সঙ্গে সহমত পোষণ করেন মাওলানা আবূ সাবের আবদুল্লাহ। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, অতীতেও এদেশে নির্বাচন হয়েছে এবং নির্বাচনের সময় মাহফিলও হয়েছে। তখন তো কোনো সমস্যা হয়নি। তাহলে এখন আবার নতুন করে কেন সিদ্ধান্ত নিতে গেলেন?

‘নির্বাচনী প্রচারণা যখন পর্যন্ত চালানোর অনুমতি আছে, ততোদিন মাহফিলও চলতে পারে। এরপর সতর্কতামূলকভাবে কয়েকদিন বন্ধ থাকতে পারে। এখন থেকেই নিষেধ করে দেয়া সম্পূর্ণ অন্যায়।’ -যোগ করেন তিনি।

দেশের এই দুই বিশিষ্ট আলেম ও শিক্ষাবিদ ওয়াজ-মাহফিল বিষয়ক ইসির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানান।

ওয়াজ-মাহফিলের উপর থেকে ইসির বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করা না হলে উল্টো ফলের আশঙ্কা ব্যক্ত করেন মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ সাদি।

তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘নির্বাচনী পরিবেশ রক্ষার জন্য এই নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। আমার সন্দেহ হয়, এতে পরিবেশ ঠিক না হয়ে উল্টো নষ্ট হতে পারে। মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতেও পারে।’

অন্যদিকে উলামায়ে কেরাম ইসির সঙ্গে দেখা করে এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে পুনর্বিবেচনা দাবি জানাতে পারেন বলে মন্তব্য করেন মাওলানা আবু সাবের আবদুল্লাহ। কারণ, ইসলাম ও মুসলমানের ক্ষতির বিষয়টি তাদের মাথায় নাও থাকতে পারে।

পূর্ববর্তি সংবাদবিক্রি করে দেওয়া শিশু ফিরে এসেছে মায়ের কোলে 
পরবর্তি সংবাদধানের শীষের জোয়ার উঠেছে : মির্জা ফখরুল