‘এক আসনে এক প্রার্থী’ নীতি : ইসলামি দলগুলোর সমঝোতা-উদ্যোগ কতোটা সফল হবে?

আতাউর রহমান খসরু ।।

বাংলাদেশে ভোটের রাজনীতিতে ইসলামপন্থীরা বড় একটি ফ্যাক্ট। তাই প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের আগে ইসলামি দল ও ইসলামপন্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণের এক প্রকার চেষ্টা দেখা যায় বড় দলগুলোর মধ্যে। ধর্মনিরপেক্ষায় বিশ্বাসী আওয়ামী লীগ ও জাতীয়তাবাদী বিএনপি উভয় দলই ইসলামপন্থীদের ভোটকে গুরুত্ব দেয়। কিন্তু অনৈক্য ও পারস্পরিক রাজনৈতিক বিরোধের কারণে ইসলামপন্থীরা নিজেদের এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারছেন না। ভোটের স্বার্থে বড় দলগুলো তাদের জোটে টানলেও মূল্যায়নটা সে তুলনায় অনেক কম বলে অভিযোগ খোদ জোট শরিকদের।

ইসলামি দলগুলোর নিজস্ব সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো এবং অন্যান্য দলের অবমূল্যায়ন থেকে বাঁচার জন্য শুরু থেকেই পারস্পরিক ঐক্যের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ। তারা বলেছেন, বড় বড় জোটের কাছে তারা প্রত্যাশার ঝুলি নিয়ে না ঘুরে শেষ সময়েও নিজেরা এক হলে ভালো কিছু করা সম্ভব। এতে ইসলামি দলগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা ও মূল্যায়ন বাড়বে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক দলীয় প্রার্থীদের এক বিশেষ অনুষ্ঠানে ইসলামি দলগুলোকে ‘এক আসনে, ইসলামি দলের এক প্রার্থী’ নীতি অনুসরণের আহবান জানান।

তার এই আহবানের চারদিন পর আজ ঢাকার একটি হোটেলে ইসলামি দলগুলোর মাঝারি সারির নেতাদের একটি প্রাথমিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে ইসলামি ধারার দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী ঐক্যজোট (রকিব), খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলমায়ে ইসলাম ও ইসলামী ঐক্যজোটের প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন।

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের অংশগ্রহণের কথা থাকলেও বিশেষ প্রয়োজনে তারা অংশগ্রহণ করতে পারেনি। বৈঠকে অংশগ্রহণ করতে না পারলেও এ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়ার ব্যাপারে একমত আছেন বলে জানিয়েছেন তারা।

আরও পড়ুন : জোটবদ্ধ নির্বাচনে আদর্শহীনতার চেহারাটা প্রকট হয়ে ওঠে : মুফতি আবুল হাসান আবদুল্লাহ

‘এক আসনে ইসলামি দলের একজন প্রার্থী’ নীতিমালা বিষয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন বলেন, ‘আমাদের নীতি নির্ধারণী ফোরামে এমন একটি আহবান জানানোর সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী দলের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুলক এই নীতি অবলম্বনের আহবান জানান।’

মাওলানা মাহফুজুল হকের আহবানের পর ইসলামি দলগুলোর নেতাদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা হয়। অনেকেই বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন এবং এ উদ্যোগ এগিয়ে নেয়ার পরামর্শ দেন। গত বৃহস্পতিবার একটি ঘরোয়া বৈঠকও হয় বলে জানা গেছে বিভিন্ন সূত্রে। সেখানেই আজকের বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়।

আজকের বৈঠকে কোন কোন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আজকের বৈঠকে এই নীতির সম্ভাব্য দিকগুলো এবং তা এগিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়া কী হবে তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।’

আজকের বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের সবাই ‘এক আসনে ইসলামি দলের একজন প্রার্থী’ নীতি গ্রহণের পক্ষে একমত হয়েছেন এবং বিষয়টি প্রত্যেকে দলের নীতি নির্ধারণী ফোরামকে অবগত করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন’ বলে জানান মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন।

বৈঠকে অংশগ্রহণ করেছিলেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম (ওয়াক্কাস)-এর যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ আরমান। দলের সভাপতি মুফতী মোহাম্মদ ওয়াক্কাস-এর অনুমতি নিয়েই আজকের বৈঠকে অংশ নেন বলে তিনি জানান।

তিনি বলেন, আমাদের দলের সভাপতি বিষয়টিকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছেন এবং অন্য দলগুলো ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে এলে আশা করি আমাদের দলের সিদ্ধান্তও ইতিবাচক হবে।

এই জমিয়ত নেতার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, আপনারা একটি জোটে থাকার পর নতুন কোনো সমঝোতায়্ এলে  জটিলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না? ‘তিনি উত্তরে বলেন, ‘সবকিছুর পরও নিজের ভাইয়ের প্রতি মানুষের ভালোবাসা থেকে যায়। বিষয়টিতে আলোচনারও বাকি আছে অনেক।’

একই প্রশ্নের উত্তরে খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব শেখ গোলাম আসগর বলেন, ‘সব কিছুর উত্তর স্পষ্ট ভাষায় দেয়া যায় না। সেটা ঠিকও নয়। আলোচনা শেষ হলে একটি রূপরেখা দাঁড় করানো যাবে।’

তার দলের উর্ধ্বতন নেতারাও বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন বলে জানান তিনি।

ইসলামী ঐক্যজোটের কেন্দ্রীয় ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক মাওলানা আনসারুল হক ইমরানও জানান, তাদের দলের হাই-কমান্ডও এই ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে একমত। তাদের নির্দেশেই তিনি ও দলের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আলতাফ হোসেন আজকের বৈঠকে যোগ দেন।

পড়ুন : জোটে নিতে টানাটানি, আসনের খবর নেই!

তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, চরম হতাশার মধ্যেও এটি একটি আশাব্যঞ্জক দিক।’

নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন বাকি এখন এই নির্বাচনী সমঝোতা ইসলামি দলগুলোর কতোটুকু কাজে আসবে? উত্তরে এই নেতা বলেন, ‘এই মুহূর্তে খুব বেশি কিছু আশা করার সুযোগ নেই। তবে একক নির্বাচনের চেয়ে অবশ্যই ভালো বলবো। আর আমি মনে করি, এই প্রক্রিয়ায় আগামীতে আরও বৃহত্তর ঐক্যের পথ খুলতে পারে। কারণ, একটি নির্বাচন যদি এক সাথে করা যায় তবে পারস্পরিক অনাস্থা ও অবিশ্বাসের যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে তা দূর করা সম্ভব হবে।’

আজকের বৈঠকের পূর্বে ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে ২-৩ দিনের মধ্যে ইসলামি দলগুলোর একটি প্রতিনিধি দল ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে দেখা করবেন। তখন তারা একটি নির্বাচনী সমঝোতা সম্ভব কিনা তা নিয়ে আলোচনা করবেন।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ও নির্বাচনী সেলের সদস্য মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘আমরা সব সময় ঐক্যের পক্ষে। আমাদের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম হাটহাজারি মাদরাসার এক অনুষ্ঠানে ইসলামি দলগুলোর একটি নিজস্ব প্লাটফর্ম গড়ে তোলার আহবান জানিয়েছিলেন। কোনো দলের সঙ্গে না যেয়ে ইসলামি দলগুলো নিজস্ব বলয় গড়ে তুলুক এটাই আমরা চেয়েছি। সুতরাং আমরা এই প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানাই।’

‘আমাদের সঙ্গে আলোচনা করতে চাইলেও আমরা তাদের স্বাগত জানাবো। তবে আমাদের প্রার্থীরা প্রায় এক দেড় বছর ধরে নিজ নিজ এলাকায় কাজ করছেন। তাই আমরা হুট করে কোনো সিদ্ধান্তে যেতে পারবো না। তাছাড়া ইসলামি দলগুলোর অনেকেই বিভিন্ন জোটে আছে সে বিষয়েও একটা সুস্পষ্ট সমাধান হওয়া দরকার।’ -বলেন তিনি।

গাজী আতাউর রহমান আরও বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, সব সমঝোতা কেন্দ্রীয় পর্যায়ে হতে হবে তা নয়। স্থানীয় পর্যায়েও সমঝোতা হতে পারে। যেমন, কোনো আসনে একজন আলেমের সম্ভাবনা তৈরি হলে সেখানে সব ইসলামি দলগুলোর নেতৃবৃন্দ বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে তার পক্ষে কাজ করতে পারেন।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ মনে করেন, ইসলামি দলগুলোর মধ্যে এখনও নির্বাচনী সমঝোতা তৈরি করা গেলেও তা নিষ্ফল হবে না। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনও যদি তারা জয় করতে না পারেন তবুও ভোটের রাজনীতিতে ইসলামপন্থীরা যে ফ্যাক্ট তা তারা বুঝিয়ে দিতে পারবেন।

পূর্ববর্তি সংবাদসংসদের দ্বিতীয়বারের ভোটাভুটিতেও হেরে গেলেন রাজাপাকসে
পরবর্তি সংবাদযারা শুধু উপায়-উপকরণের ওপর ভরসা-বিশ্বাস করবে, সৃষ্টিজগৎ তাদের বিরুদ্ধাচারণ করবে