প্রতিদিন যেভাবে প্রস্তুত হচ্ছে ইজতেমার মাঠ

আবরার আবদুল্লাহ ।। 

আর কয়দিন পরই বিশ্ব ইজতেমা। ইজতেমার আগে পুরাতন সাথীদের পাঁচ দিনের জোড়। দেশ-বিদেশের লাখ লাখ মুসল্লি দ্বীন শেখার জন্য হাজির হবেন টঙ্গীর ইজতেমার মাঠে। ৩ দিনব্যাপী এই মজলিস থেকে তারা দ্বীনের আলো নিয়ে ছড়িয়ে পড়বেন পৃথিবীর নানান প্রান্তে। মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেবেন ঈমান ও ইসলামের  পবিত্র আলো। তাই আল্লাহর পথের পথিক এসব মেহমানকে স্বাগত জানাতে প্রতিদিন প্রস্তুত হচ্ছে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমার মাঠ।

১৯৬৭ সাল থেকে সুনামের সঙ্গে বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন করছে বাংলাদেশ। প্রতিবছর যথাযথ সময়ে যথা নিয়মে অনুষ্ঠিত হচ্ছে তা। তাবলিগ জামাতের মুরব্বি ও উলামায়ে কেরামের সার্বিক তত্ত্বাবধানে সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রস্তুত এবং পরিচালিত হয় বিশ্ব ইজতেমার মাঠ।

গতকাল সকালে ইজতেমার মাঠের প্রস্ততি দেখতে মাঠে যাওয়া। ঢুকতেই চোখে পড়লো বিশাল কর্মযজ্ঞ। হাজার হাজার মানুষ কাজ করছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, মাঠজুড়ে। কেউ গর্ত খুঁড়ছেন, কেউ বাঁশ বয়ে আনছেন। কেউ আবার রশি ধরে লাইন ঠিক আছে কিনা তা মেপে দেখছেন। সবার হাসিমুখ। শীত শীত সকালে শরীর নিংড়ে ঘাম বের হলেও ক্লান্তি নেই যেন কারো চোখে-মুখে।

ইজতেমার মাঠে হাঁটছি আর মনে ভেতর উঁকি দিচ্ছে শত শত প্রশ্ন। এতো বিশাল মাঠ প্রস্তুত ও পরিচালনার জন্য কতো বেশি দক্ষতার প্রয়োজন? ভাবতে ভাবতেই পেয়ে গেলাম উত্তর দেয়ার মতো একজনকে।

‘আল্লাহ তায়ালার দ্বীনের কাজ আল্লাহ কীভাবে করাবেন তা কেউ জানে না। আল্লাহ চাইলে অনেক বড় কাজও খুব সহজে সম্পন্ন হতে পারে। ইজতেমার বিশাল এই মাঠটি দেখলে অনেকের বিশ্বাস হতে চাইবে না যে এতো অল্প সময়ে তা কীভাবে প্রস্তুত হয়। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছেই এ পর্যন্ত কখনও এমন হয়নি যে ইজতেমার অন্তত এক সপ্তাহ আগে মাঠ প্রস্তুত হয়নি।’ ইজতেমা মাঠের প্রস্তুতি বিষয়ে জানতে চাইলে মাঠের জিম্মাদার তারেক মাহমুদ এই উত্তর দেন।

তিনি জানান, ‘১৭৫ একরের বিশাল মাঠটি প্রতিবছর তাবলিগি সাথী, উলামা-তুলাবাদের স্বেচ্ছাশ্রমে প্রস্তুত হয়। সবাই স্বেচ্ছায় আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে মাঠে কাজ করেন।’

এবার প্রস্তুতি সম্পর্কেও জানান তারেক মাহমুদ। বলেন, ‘এবার নভেম্বরের শুরুতে সৃষ্টি হওয়ার কারণে আমাদের প্রস্তুতি কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিল। তাই আমরা প্রতিটি হালকায় বেশি সংখ্যক সাথী পাঠানোর অনুরোধ করেছি। আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ আমাদের তাকাজা (প্রয়োজন) পূরণ করেছেন। আশা করছি, যথা সময়ে প্রস্তুতি শেষ হবে। ইনশাআল্লাহ!’

তারেক মাহমুদের সাথে কথা বলতে বলতে এগুচ্ছিলাম। হাতের বামেই একদল মাদরাসা শিক্ষার্থী ‘ছালার চট’ বিছাচ্ছেন মাঠে। তাদের সহযোগিতা করছেন সাধারণ সাথীরা। তারেক মাহমুদের কাছে আমার প্রশ্ন এখানে কাজের বণ্টন কীভাবে হয়? বললেন, ‘মাঠে সাধারণত কাজ করেন সাথীরা। তবে অনেক মাদরাসার ছাত্রও আসেন তাদের শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে। এটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সবার আগ্রহেই হয়। আমরা চেষ্টা করি মাদরাসার ছাত্রদের সঙ্গে সাধারণ সাথীদের মিলিয়ে দল তৈরি করতে। যেন শিক্ষার্থীদের কষ্ট না হয়।’

তারেক মাহমুদের কাছ থেকে আরও জানতে পারলাম, ‘মাদরাসার শিক্ষার্থীদের দাড়ি না উঠলে অর্থাৎ সাবলক না হলে তারা মাঠে কাজের অনুমতি পায় না। অন্য সাথীরা সাধারণত সকাল ৮টা থেকে বেলা সাড়ে ১২টা এবং ২টা থেকে ৪টা পর্যন্ত কাজ করেন। কিন্তু মাদরাসা শিক্ষার্থীদের জন্য কাজের সময় সাড়ে ১২টা পর্যন্ত।’

বাড্ডার জামিয়া আরাবিয়ার শিক্ষক মাওলানা কামরুল ইসলাম তার প্রতিষ্ঠানের ২৭ জন শিক্ষার্থী নিয়ে মাঠের কাজে অংশ নিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের সাথে তিনিও কাজে হাত লাগিয়েছেন। খুঁটির সাথে দড়ি বাঁধতে বাঁধতে তিনি আমাকে ছাত্রদের নিয়ে আসার কারণ ব্যাখ্যা করলেন, ‘মাদরাসার শিক্ষার দুটি অংশ। এক. তালিম (জ্ঞানদান) দুই. তারবিয়্যাত (দীক্ষা)। আমরা মনে করি, একজন শিক্ষার্থীর জন্য ইলমে দ্বীন অর্জনের সাথে সাথে দ্বীনের জন্য আত্মনিবেদন শেখাও অত্যন্ত জরুরি। নতুবা তার জ্ঞান শুধু তার ব্যক্তি জীবনের উন্নতির কাজে লাগবে। দ্বীনের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে না। দ্বীনি কাজে ছোট ছোট স্বেচ্ছাশ্রম এসব শিক্ষার্থীকে আগামী দিনের জন্য প্রস্তুত করবে। দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যারা তাদের সন্তানকে পড়তে দেন তাদের উদ্দেশ্যও এমন বলে আমার বিশ্বাস।’

তিনি দাবি করেন, তার সঙ্গে আসা ২৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে একজনও নাবালক নয় এবং তারা সবাই স্বেচ্ছায় ও নিজ খরচে এখানে কাজ করতে এসেছেন।

বিশ্ব ইজতেমার মাঠে যারা কাজ করতে আসেন তারা কি শুধু কাজই করেন? আর কোনো অর্জন নেই তাদের? না। তাদের আরও অর্জন আছে। প্রতিদিন রয়েছে আমলের ব্যবস্থা। ইজতেমার মাঠের টিনশেড মসজিদে এখন প্রতিদিন ৩টি বয়ান হয়। ফজর, আসর ও মাগরিবের পর। উলামায়ে কেরাম ও তাবলিগি মুরব্বিরা বয়ানগুলো করেন। কমপক্ষে ৫ হাজার সাথী এসব বয়ানে অংশগ্রহণ করেন। ইজমেতার মাঠের অপর জিম্মাদার মোস্তফা আমাকে এসব তথ্য দেন।

তিনি বলেন, ‘এখন মাঠে প্রতিদিন ১৫-২০ হাজার সাথী কাজ করছেন। একেক হালকার সাথীরা এখানে দুইদিন থাকেন। তারা থাকেন কাজের স্বার্থেই। অন্য জায়গা থেকে এসে কাজ শুরু করতে করতে ১০টা বেজে যায়। আবার এখন দিনও ছোট। তাই মুরব্বিরা এখানে অবস্থান করে কাজ করাটাই মুনাসিব মনে করেছেন।’

কোনো কোনো পোর্টালে ছাত্র দিয়ে মাঠ দখলের কথা বলা হয়েছে … ‘সব অপপ্রচার। ছাত্ররা যে শুধু এ বছর এসেছে এমন নয়। ছাত্ররা কাজে অংশগ্রহণ করে অনেক বছর আগ থেকে এবং এখানে থেকে কাজ করার রীতিটাও নতুন নয়।’ কথা শেষ করতে দিলেন না মোস্তফা।

মাঠ থেকে বের হওয়ার মুখেই একজন ছাত্রকে হাতে খাবারের প্যাকেট হাতে ঢুকতে দেখলাম। মাটি লেগে আছে তার হাতে-পায়েও। বুঝলাম স্বেচ্ছাসেবী তলাবাদের একজন সে। গতি থামিয়ে জানতে চাইলাম, ‘কেন এসেছে এখানে? রাহাত নামের এই ছেলেটি আমাকে জানালো, সে টঙ্গীর জামিয়া ইসলামিয়ার জালালাইন জামাতের ছাত্র। তার বাবা তাবলিগের একজন পুরাতন সাথী। টঙ্গী বোর্ডবাজার তাদের বাসা। প্রতি শুক্রবার তার বাবা মাঠে কাজ করতে আসেন এবং কখনও কখনও তাকেও সাথে নিয়ে আসেন।’

বাবা সাথে নিয়ে আসলেও মাঠে কাজ করতে তার খারাপ লাগে না বলে জানালো রাহাত। হাতের খাবারের দিকে ইঙ্গিত করলে হেসে বললো, ‘আব্বু ছাত্রদের মেহমানদারি করবেন।’

বুঝলাম, রাহাত, রাহাতের বাবা, মাওলানা কামরুল ইসলাম, তারেক মাহমুদ ও মোস্তফাদের আন্তরিক চেষ্টা, শ্রম ও ঘামের বিনিময়েই প্রতিবছর সময়ের আগেই ইজমেতার প্রস্তুত আল্লাহর মেহমানদের জন্য।

পূর্ববর্তি সংবাদএতদিন যা করেছেন করেছেন, এখন থেকে পরিবর্তন হন : সিইসিকে ড. কামাল
পরবর্তি সংবাদমাহফিল বন্ধের সিদ্ধান্তে মুসলমানদের হৃদয়ে আঘাত হেনেছে সিইসি : মোসাদ্দেক বিল্লাহ