ফিরে দেখা : ২০০১ সালের নির্বাচনে কেমন ছিল আলেম রাজনীতিকদের অবস্থান?

আতাউর রহমান খসরু ।।

বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতির ইতিহাসে ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনটি নানাভাবেই স্মরণীয়। স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৮১ সালে হজরত হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর ২০০১ সালের ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই আলেম সমাজের নেতৃত্বে একটি রাজনৈতিক গণজাগরণ দেখা গিয়েছিল। দেশের ইতিহাসে সর্বাধিক সংখ্যক আলেম জনপ্রতিনিধি জাতীয় সংসদে যাওয়ার সুযোগ লাভ করেন সেবারই।

বহু নাটকীয়তা ও ঘটনাবহুল এই নির্বাচনে আলেম-জনতার সম্মিলন দেখা গিয়েছিল। আলেমদের রাজনৈতিক তৎপরতা দ্বীনপ্রাণ মানুষের মনে নতুন দিনের স্বপ্ন জাগ্রত করতে পেরেছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি।

তারা মনে করেন, এই নির্বাচনের পূর্বে দেশের উচ্চ আদালতে ফতোয়া নিষিদ্ধ করে রায় প্রদান, রায়ের প্রতিবাদে সারাদেশে সর্বাত্মক প্রতিবাদ, আন্দোলন-সংগ্রাম ও হরতাল, হরতালের সময় মোহাম্মদপুরের নূর মসজিদে পুলিশ হত্যার ঘটনা, বিবাড়িয়ায় ৬ মাদরাসা ছাত্রের শাহাদাত, দেশের শীর্ষ আলেমদের কারাবরণ এবং সাধারণভাবে আলেম সমাজের রাষ্ট্রযন্ত্রের রোষানলের শিকার হওয়ার মতো বিষয়গুলো আলেম-জনতার এই অভূতপূর্ব জাগরণের নিয়ামক হিসেব কাজ করেছিল।

মাওলানা আহমদ আলী ও মুফতি এনামুল হাসান

৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরাসরি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ. ও মুফতী মোহাম্মদ ওয়াক্কাস এবং পরবর্তীতে উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে আসেন মুফতি শহিদুল ইসলাম ও অ্যাডভোকেট শাহীনূর পাশা চৌধুরী। অবশ্য মূল নির্বাচনে মুফতি শহিদুল ইসলাম সামান্য ভোটে (৪ হাজার) হেরে যান। আর শাহীনূর পাশা হারেন মাত্র ৬ হাজার ভোটে।

আন্দোলন-সংগ্রাম-কারাবরণ সবকিছুতে থেকেও শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক রহ. বয়সসহ বেশ কিছু বিষয় মাথায় রেখে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি। ২০০১ সালে কারাবন্দী আলেমদের তিনিই ছিলেন সবচেয়ে বয়োজেষ্ঠ। হাজারও আলেমের শিক্ষক এই আলেমের কারাবরণ আলেম সমাজ থেকে সাধারণ মানুষ সবার হৃদয়ে নাড়া দিয়েছিলো।

নির্বাচনে মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ. বিবাড়িয়া-২ আসন থেকে নিকটমত প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে প্রায় ৪৩ হাজার ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হন। মুফতী মোহাম্মদ ওয়াক্কাস যশোর-৫ আসন থেকে প্রায় ৩০ হাজার ভোট বেশি পেয়ে সংসদ সদস্য হন। সরাসরি নির্বাচনে মুফতি শহিদুল ইসলাম ও অ্যাডভোকেট শাহীনূর পাশা চৌধুরীও সম্মানজনক ভোট পান এবং পরবর্তী উপনির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাকিগঞ্জের মাওলানা উবায়দুল হক রহ. সর্বপ্রথম ইসলামি দলের প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হন। তারপরই এই চার আলেম জাতীয় সংসদে ইসলামি দলের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান।

একজন ইমাম-খতিব, মুহাদ্দিস ও রাজনীতিক হিসেবে ২০০১ সালের নির্বাচন পূর্ব আলেম-জনতার জাগরণটাকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পান মাওলানা আহমদ আলী কাসেমি। খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক এই আলেম তখন হাজারীবাগ বড় মসজিদের ইমাম ও খতিব এবং ঢাকার জামিয়া ইসলামিয়া, লালমাটিয়ার মুহাদ্দিস ছিলেন।

https://3.bp.blogspot.com/-sJSgdDl7DLM/V6nMyoX7lFI/AAAAAAAAA38/0JHAVN6f_H49rxK05viYDis4rzZOpvBCACLcB/s1600/12824_1422851314682574_7358392731920073794_n.jpg

তিনি বলেন, ‘ফতোয়া বিরোধী রায় ও পরবর্তী প্রেক্ষাপটের কারণে আলেমদের প্রতি সাধারণ মানুষের আবেগ জেগে ওঠে। বিশেষত ফতোয়ার অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে ৬ মাদরাসা শিক্ষার্থীর শাহাদাত ও দেশের শীর্ষ আলেমদের কারাবরণ তারা মেনে নিতে পারছিল না। আলেমরা যেখানেই যাচ্ছিলেন সেখানেই মানুষের ঢল নামছিল। আলেমদের কথা শোনার জন্য তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতো। শেষ দিকে মানুষের অবস্থা থেকে মনে হতো তারা নিশ্চিত বিজয় দেখছে।’

‘তখন অনেক মুসল্লি ইসলাম, মুসলমান, মাদরাসা ও মসজিদের কথা বলতে গিয়ে আবেগ-আপ্লুত হয়ে যেতেন। তাদের কী করা উচিৎ বার বার জানতে চাইতেন।’ –বলেন মাওলানা আহমদ আলী।

তিনি মনে করেন, আলেমদের উপর মানুষের এই প্রত্যাশা সৃষ্টির পেছনে আলেমদের ঐক্য, নেতৃত্বে থাকা শীর্ষ নেতাদের সাধারণের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে অটলতাই ছিলো প্রধান কারণ।

মাওলানা আহমদ আলী কাসেমীর ভাষায়, মূলত আলেম-জনতার জাগরণের ভিত গড়ে দেয় ফতোয়ার রায় বিরোধী আন্দোলন ও বিবাড়িয়ার ৬ শিক্ষার্থীর শাহাদাতের ঘটনা। এ ঘটনার পর সাধারণ দ্বীনপ্রাণ মানুষ দেশে ইসলাম ও মুসলমানের ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে শীর্ষ নেতাসহ আলেমদের গণগ্রেফতার এই শঙ্কা আরও গভীর করে তোলে।

বিবাড়িয়ার সেই ঘটনার অন্যতম সাক্ষী বি-বাড়িয়ার মুফতি এনামুল হাসান। তিনি তখন শহরের জামিয়া ইউনুছিয়ার জালালাইন জামাতের ছাত্র। সেদিনের ঘটনা ও তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আমরা সকালে মিছিল নিয়ে বের হই। কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পর দেখি আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ব্যারিকেড দিয়েছে। আমরা তা উপেক্ষা না করেই সেখানে থেমে যাই এবং শ্লোগান দিতে থাকি। আমি তখন মিছিলের মাঝ বরাবর একটি মাইকে শ্লোগান দিচ্ছিলাম। হঠাৎ গুলির আওয়াজ শুরু হয়। ছাত্ররা জীবন বাঁচাতে ছুটাছুটি শুরু করে। নিরীহ নিরস্ত্র মাদরাসা ছাত্ররা যে যার মতো নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করলো।৬ জন বিক্ষোভকারী শহীদ হলো, আহত হলো আরো অনেকেই। কিছু সময়ের জন্য পুরো শহর স্তব্ধ হয়ে গেলো। কিন্তু এক দুই ঘণ্টা না যেতেই পুরো শহর আবার উত্তাল হয়ে উঠলো। শহরের আপামর জনসাধারণ রাস্তায় নেমে এলো। তখন শহরে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় বি-বাড়িয়ার শীর্ষ আলেমরা রাস্তা নেমে আসেন। তারা সাধারণ মানুষ বুঝিয়ে-শুনিয়ে ঘরে ফেরান।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই ঘটনার পর বিবাড়িয়ার মানুষের মাঝে ঈমানি স্পৃহা যে কোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণে বেড়ে গেল। তারা কারাবন্দী শীর্ষ আলেমদের জন্য নিয়মিত নামাজ পড়ে দোয়া করা, রোজা রাখা শুরু করে। আমি নিজে মুফতি আমিনী রহ.-এর নির্বাচনী প্র্রচারণায় দেখেছি মহিলারা দূর থেকে হুজুরকে দেখে অঝোরে কাঁদছে। তার বিজয়ের পরও আমি মানুষকে এভাবে কাঁদতে দেখেছি। তাদের আবেগের মাত্রাটা ছিল এমন।’

http://www.dailydinkal.net/2016/01/13/1452617310.jpg
উত্তাল বিবাড়িয়ার একটি ফাইল ছবি

শুধু মুফতি আমিনী রহ. নন, সব আলেম প্রার্থীদের জন্য সাধারণ মানুষের আবেগ ও অনুভূতি প্রায় একইভাবে কাজ করছিল। মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী সেই দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘সেই গণজোয়ারকে ইসলামের পক্ষের গণজোয়ারই বলা যায়। এজন্যই মুফতি শহিদুল ইসলাম রাজনীতিতে নতুন এসেও শেখ হাসিনার মতো প্রার্থীর বিপরীতে মাত্র ৪ হাজার ভোটে পরাজিত হন। পরে অবশ্য উপনির্বাচনে তিনি বিজয়ী হন।’

তবে তিনি মনে করেন, ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে সাধারণ মানুষ ও আলেম সমাজে যে বিপুল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল তার অনেকটাই অপূর্ণ থেকে গিয়েছিল। এর কারণও বিশ্লেষণ করেন তিনি। ‘এক তো আমাদের সংসদ সদস্যদের সংখ্যা ছিলো মাত্র চারজন। যা প্রভাব সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট নয়। এছাড়াও নিজেদের ভুল বোঝাবুঝি ও অনৈক্য, নিয়ন্ত্রক শক্তির সদিচ্ছার অভাবের মতো কারণগুলো প্রত্যাশা পূরণে বাধা ছিলো।’

‘তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা না পেরেছি সেই সময়টাকে ধরে রাখতে এবং না পেরেছি আমাদের মুরব্বিদের রাজনৈতিক বিচক্ষণতা, দৃঢ়তা ও নৈতিকতার গুণ ধারণ করতে। এজন্য এখন আমাদের চরম আস্থাহীনতায় ভুগতে হচ্ছে।’

ঐক্য, একক নেতৃত্ব, ব্যক্তিত্বের গঠনের পাশাপাশি রাজনীতিতে ব্যক্তি স্বার্থের চর্চা পরিহার করতে পারলে আগামীতেও আমাদের সুদিন ফিরতে পারে বলে প্রত্যাশা করেন এই আলেম রাজনীতিক।

পূর্ববর্তি সংবাদকানাডায় মুসলিম বিদ্বেষের ঘটনা বাড়ছে
পরবর্তি সংবাদফ্রন্টের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় না থেকে দলীয় প্রার্থীদের প্রস্তুতি নিতে বললেন জমিয়ত মহাসচিব