গ্রামের সবাই হিন্দু, নেতা নির্বাচন করল এক মুসলমানকে!

মনযূরুল হক ।। 

ঘটনাটা ঘটেছে কাশ্মিরে। যেখানে সুদীর্ঘকাল ধরে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছে। বুরহানুদ্দিন ওয়ানির মতো বিপুল জনপ্রিয় তরুণ মুজাহিদকে জঙ্গি ট্যাগ দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এবং কাশ্মিরে যদিও স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছে, কিন্তু মুসলিমগণ একদিকে যেমন এই যুদ্ধকে ‘গাযওয়ায়ে হিন্দ’-এর যুদ্ধ বলে প্রচারণা চালান, একইভাবে মিডিয়াও এমনভাবে প্রচার করে, যেন কাশ্মিরের স্বাধীনতা ধর্মীয় কারণে কেবল মুসলমানদেরই দাবি—হিন্দু-শিখ-বৌদ্ধসহ অন্যান্য জনসাধারণ নিতান্তই নিরীহ এবং তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই এই জিহাদ।

একইভাবে এটাই মনে করা হয়—জিহাদ মানেই অমুসলিমদের কতল করা।

অথচ জম্মু ও কাশ্মিরের লোকসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ ৪১ হাজার। তার মধ্যে হিন্দু জনসংখ্যা ২৮.৪৩ ভাগ। মানে ৩৫ লাখ ৬৫ হাজারেরও বেশি। এর মধ্যে জম্মুতে মুসলিমদের চেয়ে হিন্দুদের সংখ্যাই বেশি—হিন্দু জনগোষ্ঠী সেখানে প্রায় ৬৩ ভাগ এবং মুসলিম ৩২ ভাগ। গোটা অঞ্চলে শিখসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠীও আছে প্রায় তিন লাখ। (দেখুন— https://bit.ly/2qfw4Ti)

ভারতে শতাব্দিকাল ধরে যেমন ভয়াবহ দাঙ্গার ইতিহাস আছে এবং হিন্দুদের বাহুবলে মুসলিম জনগোষ্ঠী যেমন করে নাস্তানাবদু হয়েছে, সে-হিসেবে কাশ্মিরে জিহাদিদের প্রধান টার্গেট হওয়ার কথা ছিল সেখানকার হিন্দুরা। যেমনটা আমরা আসাম কিংবা মিয়ানমারের প্রসঙ্গ এলেই বাংলাদেশের হিন্দু বা বৌদ্ধদের কতটা ছাড় দেওয়া যৌক্তিক হবে—সে-কথা ভাবি। কাশ্মিরে কিন্তু তেমন হয় নি এবং সচারচর হয়ও না। বরং আমার মনে হয় মুসলিমদের আধিপত্যও সে-অঞ্চলে এমনিতে প্রতিষ্ঠিত হয় নি—বরং নিজেদের চরিত্রগুণেই মুসলিম জনগণ সেখানে অনন্য মর্যাদা পেয়ে এসেছেন।

বেশ কয়েকদিন আগে ‘ভ্রমণ’ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় একজন হিন্দু লেখকের কাশ্মির ভ্রমণ কাহিনী পড়েছিলাম। দিকহারা-পথহারা অবস্থায় একটি মুসলিম পরিবারে তিনি কী দারুণ সমাদর পেয়েছেন—লেখক সে-কাহিনী তুলে ধরেছেন। এমনকি কিছুদিন আগে আমাদের বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকাগুলোও পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু মেয়েদের মাদরাসায় পড়ার আগ্রহের কথা প্রকাশ করেছে।

কিন্তু কাশ্মিরের এবারের ঘটনাটি এই সকল ঔদার্যের উদাহরণকে ছাড়িয়ে শিখরে উঠে গেছে। যদিও ভেলান-খারোথি ছোট্ট একটি গ্রাম—কাশ্মিরের ডোডা জেলায় ভাদেরওয়া শহরের ১০ কিলোমিটার দূরে যার অবস্থান। এই গ্রামে মাত্র ৪৫০টি পরিবারের বসবাস। সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো—একটি পরিবার ছাড়া সবাই অমুসলিম। কিন্তু এই মুসলিম পরিবারের কর্তা চৌধুরী মুহাম্মাদ হোসাইনকে (৫৪) গ্রামবাসী তাদের পঞ্চায়েত প্রধান নির্বাচিত করেছে। এবং এই নির্বাচনও হয়েছে ঘটা করে আর.এস. পুরা সরকারি মাধ্যমিক স্কুলে।

মুহাম্মাদ হোসাইন মূলত গুজ্জার বংশীয় লোক; যারা ঐতিহাসিকভাবেই কৃষিকাজ ও গবাদিপশু পালনে অভ্যস্ত। তিনি ৫ ছেলে, ১ পুত্রবধূ ও স্ত্রীসহ ভেলান গ্রামে থাকেন। তার আরও ৪ টি মেয়ে আছে, যারা সকলে বিবাহিত।

হোসাইনকে কেনো তাদের সর্বসম্মত পছন্দ—সে-সম্পর্কে বিস্তারিত বক্তব্য এলাকার মানুষ মিডিয়াকে জানিয়েছেন (লিংক দিলাম, নিজ উদ্যোগে পড়ে নেবেন)। সন্দেহ নেই, এখানে যেমন হোসাইনের কৃতিত্ব অনেক, যেহেতু একজন মুসলিম হিসেবে এতগুলো অমুসলিম পরিবারের মধ্যে আস্থা অর্জন করতে পারা কম কথা নয়—একই সঙ্গে তার অমুসলিম প্রতিবেশিদের গুণাবলিও মহত্ত্বের দাবিদার।

তবে এক্ষণে এই নিউজটা বিশেষভাবে অধমের নজরে পড়ার কারণটা বলতে চাই—

মফস্বলের যে-বাড়িটাতে আমাদের পরিবারটি থাকেন, সেখানে একসময় হিন্দু নিবাসী লোকসংখ্যাই ছিল বেশি। এখন কমে গেছে। এমনকি গত বছর আমাদের ঘরের সামনে একটি একরুমের টিনের ঘরে একটি ছোট্ট হিন্দু পরিবারের বসবাস ছিল। চারপাশের মুসলিম পরিবারের মধ্যে এই গরিব হিন্দু পরিবারটি টিকে থাকতে পারে নি—বাড়িওয়ালা নোটিশ দিয়ে বিদায় করে দিয়েছেন। টুকটাক কিছু ভুল-ত্রুটি তার ছিল, তা তেমন বিচ্যুতি প্রতিবেশিদেরও কম ছিল না। বাড়িওয়ালাকে তিনি অনুরোধও করেছিলেন, তাকে যেন থাকতে দেওয়া হয়। কেননা, এত ছোট্ট ও সস্তা বাসা এবং এমন নির্ঝঞ্ঝাটে অন্য কোথাও বাসা ভাড়া তিনি মেলাতে পারবেন না। তার আর্জি মেনে নেওয়ার গরজ কেউ বোধ করেন নি।

সবাই ভালো থাকবেন।

পূর্ববর্তি সংবাদশরিক দলের ৪৮ প্রার্থী নির্বাচন করবে ধানের শীষ প্রতীকে
পরবর্তি সংবাদনৃশংসভাবে হামলাকারী সাদপন্থীদের গ্রেফতারের দাবিতে আশুগঞ্জে স্মারকলিপি প্রদান