ভারতের বুলন্দশহরে গরু জবাইয়ের মিথ্যা ঘটনা সাজিয়ে দাঙ্গার চেষ্টা হিন্দুদের

হাসান ইনাম ।।

সোয়া তিন বছর আগে উত্তর প্রদেশের দাদরিতে মুহাম্মদ আখলাক নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে মারা হয়েছিল। তাঁকে হতা করা হয় ‘গরুর মাংস আছে তার বাড়িতে’ এই অভিযোগে। ভারতে গরু বাঁচানোর নামে নানা প্রান্তে গত কয়েক বছর ধরে নিরীহ মুসলিমদের পিটিয়ে মারার যে ধারা শুরু হয়েছে, সেই ধারার একজন শহীদ মুহাম্মাদ আখলাক। গো-রক্ষার নামে মানুষ হত্যার এই অসুস্থ লড়াইয়ের পিছনে কল কাঠি নাড়ছে কারা ?

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের বুলন্দশহরে ঘটে যাওয়া দাঙ্গার পিছনের খবর জেনে আসা যাক।

সূত্রপাত এবং সাধারণ খবর

গত সপ্তাহের সোমবার (৪ ডিসেম্বর) বুলন্দশহরে গো-হত্যার প্রতিবাদে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো রাস্তা অবরোধ এবং ভাঙচুর শুরু করলে স্থানীয় পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ করে। বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দিকে উল্টো ইট পাথর এবং এক পর্যায়ে গুলি ছুঁড়ে। ঘটনাস্থলে এক পুলিশ অফিসার এবং সাধারণ এক যুবক মৃত্যুবরণ করে।

এ ঘটনায় নিহত পুলিশ কর্মকর্তা সুবোধ কুমার সিং

ঘটনার সূত্রপাত হয় বিজেপি যুব মোর্চার নেতা শিখর আগারওয়ালের ফেসবুক পোস্ট থেকে। বজরঙ দলের সদস্য ‘যোগেশ রাজ’ এবং বিজেপি যুব মোর্চার নেতা ‘শিখর আগরওয়াল’ সর্বপ্রথম কাটা গরু দেখতে পেয়েছে বলে দাবি করেন।

যোগেশ রাজ পুলিশ খুনের অভিযোগে এখন অভিযুক্ত হয়ে পালাতক আছেন। এই যোগেশের অভিযোগের উপরে ভিত্তি করেই গত মঙ্গলবার (৫ ডিসেম্বর) বুলন্দশহরের নয়াবংশ গ্রামে হানা দেয় প্রায় শ খানেক পুলিশ।  বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চলেছে। এমনকি  পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণির দুই ছাত্রকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে গো-হত্যার অভিযোগে।  তিন-চার ঘণ্টা পরে অবশ্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে তাদের।

এফআইআর-এ নাম রয়েছে সরফুদ্দিন এবং পারভেজ নামে দুই ব্যক্তির।  সরফুদ্দিনের ভাই হুসাইন দাবি করেছেন, ভুল করে সরফুদ্দিনের নাম এফআইআর-এ থেকে গিয়েছে।   তিনি জানান, ২৯ নভেম্বর থেকে সরফুদ্দিন বাইরে ছিলেন।  ঘটনার পর তিনি গ্রামে ফেরেন।

ঘটনার দিন গ্রামে ছিলেন না পারভেজও।  এ ছাড়া গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, অভিযুক্ত সুদাইফ চৌধুরি কোনও দিনই এই গ্রামে থাকতেন না।  এফআইআর-এ নাম থাকা ইলিয়াস এবং শরাফত দুজনেই বহু দিন আগে গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছেন।

পিছনের খবর

শুরুতেই বলা হয়েছে শহীদ আখলাকের কথা।  সেই হত্যা মামলায় অন্যতম তদন্তকারী কর্মকর্তা (ইনভেস্টিগেটিং অফিসার) ছিলেন সুবোধ কুমার সিং, রাজ্য পুলিশের চাকরিতে যিনি তখন ওই অঞ্চলে কর্মরত ছিলেন। গত সোমবার (৪ ডিসেম্বর) বুলন্দশহরে মারমুখী জনতা তাকে গুলি করে ও পিটিয়ে নৃশংসভাবে খুন করার পর তার পরিবারের অনেকেই সন্দেহ করছেন, ওই মামলার তদন্তের জেরেই তাকে প্রাণ দিতে হল।

বিক্ষোভকারীরা যেই রাস্তা অবরোধ করেছিলো সেই রাস্তা ধরেই বুলন্দশহরের ইজতেমা থেকে বাড়ী ফেরার কথা ছিলো লক্ষ লক্ষ মুসল্লীর। একটি মহল ধারণা করছে, মুসলমানমানদের যাত্রাপথ আটকাতেই এমন চক্রান্ত করেছিলো হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো এবং পরিকল্পনা করা হয়েছিল ওই রাস্তা দিয়ে ইজতেমা থেকে ফিরে আসা লোকগুলো আসলেই তাদের উপর হামলা করা হবে এবং এরফলে তারাও হয়তো হামলা করবে। তারপর গোটা রাজ্যসহ দেশে দাঙ্গার আগুন ছড়িয়ে পড়বে।
কিন্তু পুলিশ তাদের প্ল্যান ভেস্তে দেয়। যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের মতো একজন সাম্প্রদায়িক লোক এবং যেখানে গরু জবাইয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইন আছে,সেখানে মুসলমানরা গরু কাটতে যাবে – এমন প্রশ্নই আসে না।

বুলন্দশহরের শান্তিপ্রিয় মুসলিম

ভারতে কেন্দ্র শাসনে বিজেপি  আসার পর যেভাবে গো-রক্ষকদের তাণ্ডব বেড়েছে, তাতে সাধারণ মানুষ গরুর ব্যবসা করতেই ভয় পাচ্ছে! আর যোগীর রাজ্যে মুসলমানরা বর্তমান পরিস্থিতিতে গরু কাটার সাহস পাবে – সেটা বিশ্বাস করাও অবান্তর।

উত্তরপ্রদেশের বুলন্দশহরে দাঙ্গাকারীরা যখন দাঙ্গার উদ্দেশ্যে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ হচ্ছিলো ,তখনকার একটি ফেসবুক লাইভে বেরিয়ে এসেছে চক্রান্তের কথা:

https://www.facebook.com/iamwithbarkhadutt/videos/vb.1159003600817947/1920246398024777/?type=2&theate

ভিডিওতে দুইজন ছেলে কথা বলছে।

প্রথমেই একজন আরেকজনকে বলছে, এই ট্রলিটা এখানে কেন ?
তখন অন্যজন উত্তর দিচ্ছে- মরা গরু নিয়ে আসা হয়েছে।
তখন অপরজন জিজ্ঞাসা করছে, তুমি কি এটাকে কেটেছো!
তখন উত্তর আসছে, এটা কুন্দন কেটেছে। দু তিনটে (মরা গরু) ভিতরে আছে,ওগুলোকে ওখানে কাটা হয়েছে! তারপর একজনকে চেঁচাতে চেঁচাতে আসতে দেখা যায় এবং খারাপ কথা বলতে থাকে।

যাই হোক, এই ভিডিও থেকেই বুঝা যায় দাঙ্গার নেপথ্যে কারা ছিলো।

বিরোধী দলগুলোরও সন্দেহ, মহম্মদ আখলাক মামলার তদন্তে অভিযুক্তদের ছাড় দিতে রাজি হচ্ছিলেন না বলেই কোনও কোনও মহল সুবোধ কুমার সিংকে পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দিতেই তার উপর হামলা করা হয়েছিল।

নয়তো কথিত গোহত্যার বিরুদ্ধে আয়োজিত একটি সাধারণ পথ অবরোধ থেকে জনতা কেন হঠাৎ আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে একজন নির্দিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে খুন করার জন্য ধাওয়া করবে – আপাতদৃষ্টিতে এর কোনও ব্যাখ্যা মিলছে না।

তবে আর যাই হোক, নিরীহ মুসলিমদের মেরে যে রাজনীতি করছে মোদি সরকার, এই দাঙ্গা তারই আরেকটি উদাহরণ।

পূর্ববর্তি সংবাদখালেদা জিয়ার প্রার্থিতা নিয়ে হাইকোর্টের বিভক্ত আদেশ
পরবর্তি সংবাদপ্রচারণার প্রথম দিনেই ফখরুলের গাড়ি বহরে হামলা