সরকারের সাথে যোগাযোগ : কোন পথে যাচ্ছে হেফাজতে ইসলাম

আতাউর রহমান খসরু ।।

হেফাজত ও বর্তমান সরকারের যোগাযোগ ও সখ্য নিয়ে নানান কথা প্রচলিত আছে বাজারে। গণমাধ্যমেও বিষয়টি বারবার আলোচিত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে। কেউ কেউ এর সঙ্গে আদর্শের আপোষ, রাজনীতি ও ভোটের মতো বিষয়গুলোকে জড়িয়ে কথা বলেছেন এবং এখনও বলছেন। বিশেষত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে হেফাজত-সরকারের সম্পর্কের একটি রাজনৈতিক সমীকরণ দাঁড় করানোর চেষ্টা চলছে। ভোটের রাজনীতিতেও সরকারের সাথে মিলিয়ে দাঁড় করানো হচ্ছে নানান হিসাব-নিকাশ।

তবে সরকারের নেতৃত্ব দেয়া আওয়ামী লীগ ও হেফাজতে ইসলাম উভয়-ই বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে দেখতে অনিচ্ছুক। গতকাল বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা নূহ উল আলম লেনিন বিষয়টি একটি কৌশল হিসেবেই উল্লেখ করেন।

তিনি সেখানে বলেন, ‘হেফাজতের সাথে তার দল যদি ‘কম্প্রোমাইজ’ করেও থাকে, সেটা ভোটের বিবেচনায় নয়, বরঞ্চ ‘বিপজ্জনক ধর্মীয় রাজনীতি(!) থেকে দেশকে বাঁচানোর’ কৌশল হিসাবে তা করেছে।

লেনিন আরও বলেন, ‘ধর্মের নামে যে রাজনীতি হচ্ছে, তা থেকে যদি ধর্মে বিশ্বাসী বা ধর্মীয় বড় একটি গোষ্ঠীকে আমরা দূরে রাখতে পারি, সেটা ইতিবাচক। এবং সেটা করতে আমাদের কিছুটা আপোষ করতে হয়। আমরা সেটা করেছি।’

হেফাজতে ইসলামের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আওয়ামী লীগের যোগাযোগ বা সখ্য যে কোনোভাবেই হেফাজতের দাবির সঙ্গে একমত হওয়া কিংবা মত বা মতবাদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন নয় সে বিষয়টি স্পষ্ট করে নূহ উল আলম লেলিন বলেন, ‘তাদেরকে সাথে রাখা নয়, সঠিক শব্দ হবে ‘নিউট্রালাইজ’ (নিষ্ক্রিয়) রাখা, গায়ে পড়ে তাদেরকে না ক্ষেপানো। সেটাই আওয়ামী লীগের কৌশল।’

হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং হেফাজতের বাইরে থাকা অনেকেই মনে করছেন, সরকার কৌশলে সাফল্য পাচ্ছে। ফলে হেফাজতে ইসলামের মৌলিক দাবিগুলো অপূর্ণ থেকে গেলেও সংগঠনটিকে আগের মতো সক্রিয় দেখা যাচ্ছে না।

চট্টগ্রাম ওমর গনি এমইএস কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আ ফ ম খালিদ হোসাইনের দৃষ্টিতেও হেফাজতে ইসলামের কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয়তা রয়েছে। তিনি বলেন, ‘হেফাজতে ইসলামের শুরুর দিকে আমি এই আন্দোলনের সঙ্গে সষ্ক্রিয় ছিলাম। সে সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে বলতে হবে হেফাজত এখন অনেকটাই নিষ্ক্রিয়।’

তবে তার কথার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী। তিনি বলেন, ‘হেফাজত কখনও নিষ্কিয় হয়নি। দেশি-বিদেশি ইসলামের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয়ে হেফাজত সোচ্চার।’

তবে ২০১৩ এবং তার পরবর্তী সময়ের আন্দোলনের সঙ্গে বর্তমান কর্মসূচির ভিন্নতা রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, ‘ঈমান ও ইসলামের প্রয়োজন অনুযায়ী হেফাজতে ইসলাম আন্দোলন করে। কোনো বিষয়ে যদি বড় ধরনের আন্দোলনের প্রয়োজন হয় এবং তেমন পরিবেশ তৈরি হয় তবে হেফাজতে ইসলাম আবারও মাঠে নামবে।’

মাওলানা ইসলামাবাদী হেফাজতের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক ও যোগাযোগ থাকার বিষয়টিও অস্বীকার করেন। তার দাবি সরকারের সাথে হেফাজতে ইসলামের কোনো কোনো নেতার যোগাযোগ থাকলেও সেটা হেফাজতে ইসলামের নেতা হিসেবে নয়। শিক্ষাবোর্ডের প্রতিনিধি বা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে এই যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা হয়েছে।

তিনি তার বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ‘হেফাজতের সাথে সরকারের যোগাযোগ হলে সরকার হেফাজতের দাবি মানছে না কেন? নেতা-কর্মীদের মামলা প্রত্যাহার করছে না কেন? হেফাজত মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর পাসপোর্ট ফেরত দেয়া হচ্ছে না কেন? তাহলে যোগাযোগ ও সু-সম্পর্কই বা কোথায় আর এর সুফলই বা কোথায়?’

আরও পড়ুন : হেফাজতকে নিষ্ক্রিয় করার কৌশলে আগাচ্ছে আওয়ামী লীগ!

ড. আ ফ ম খালিদকে প্রশ্ন করেছিলাম, হেফাজতে ইসলামের এই নীরবতাকে শান্তিপূর্ণভাবে দাবি আদায়ের চেষ্টা বলা যায় কিনা? উত্তরে তিনি বলেন, ‘শান্তিপূর্ণভাবে দাবি আদায়ের চেষ্টা বলার সুযোগ থাকতো যদি নীরবতা ও নিষ্কিয়তা যেটাই বলেন তার পর যদি হেফাজতের মৌলিক কোনো দাবি আদায় হতো; নূন্যতম এই বিষয়ে উভয়পক্ষের কোনো আলোচনা হতো। আমার জানা মতে তেমন কোনো আলোচনা আজ পর্যন্ত হয়নি। এমনকি শাপলা চত্ত্বরের দুর্ঘটনার পর সরকারের করা কোনো মামলা তুলে নেয়া হয়নি। হেফাজত মহাসচিবের পাসপোর্ট ফেরত দেয়া হচ্ছে না। তিনি নিজে আমাকে বলেছেন, চিকিৎসার প্রয়োজনে তার বাইরে যাওয়া দরকার।’

তিনি মনে করেন, হেফাজতে ইসলামের আরও বেশি সষ্ক্রিয় হওয়ার সুযোগ আছে। কারণ, একটি গণতান্ত্রিক দেশে আন্দোলনের অর্থই সহিংসতা নয়। শান্তিপূর্ণভাবেও দাবি আদায়ের জোরালো আন্দোলন করা যায়। মাঠের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন সরকারের সঙ্গে নিয়মতান্ত্রিক যোগাযোগেরও অন্তরায় নয়। যদি সেখানে ব্যক্তিস্বার্থের হিসাব না থাকে।

হেফাজতে ইসলামের নেতৃবৃন্দের প্রতি ড. খালিদের আহবান হলো, একটি জাগরণ সৃষ্টিকারী আন্দোলনকে এভাবে নিঃশেষ হতে দেবেন না। কর্মীরা আপনাদের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করে। আপনাদের নিষ্ক্রিয়তা তাদের ক্রমেই হতাশায় ফেলে দিচ্ছে।

পূর্ববর্তি সংবাদহিন্দুত্বের পোস্টার বয় যে তিন রাজ্যে প্রচারে গিয়েছেন সেখানেই হেরেছে বিজেপি
পরবর্তি সংবাদছাদ থেকে ফেলে বিএনপি নেতাকে হত্যার অভিযোগ