ভারতের রাজ্যে রাজ্যে হিন্দুত্ববাদের পতন কি কোনো বার্তা দেয়?

শরীফ মুহাম্মদ ।।

ভারতে অনুষ্ঠিত পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে তিনটি রাজ্যেই ক্ষমতাসীন দল বিজেপির ভরাডুবি হয়েছে। নির্বাচন হওয়া পাঁচটি রাজ্য হলো মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থান, তেলেঙ্গানা ও মিজোরাম। এর মধ্যে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড় রাজ্যে জিতেছে কংগ্রেস। তেলেঙ্গানা ও মিজোরামে জয়ী হয়েছে স্থানীয় দুটি দল। এই পাঁচ রাজ্যের কর্তৃত্বই ভারতের ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির হাতছাড়া ।মোদি ও যোগী আদিত্যনাথের হাতের ব্যোস কমে আসছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, কয়েক বছর যাবৎ ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর আচরণই বিজেপির এই পরাজয়ের কারণ। তারা মনে করেন, বিজেপির এই পরাজয়ে পুরো উপমহাদেশে কিছুটা হলেও স্বস্তির বাতাস বয়ে আন তে পারে। মুসলিমবিরোধী ভয়াবহ যে অস্থিরতা ভারতজুড়ে কাজ করছে,  রাজ্য ভোটের ফলাফলে সেটা কিছু কমতে পারে। নানান ছুতা ধরে পথেঘাটে, বাড়িতে ঢুকে মুসলমান হত্যা ভারতে একটি ভয়াবহ মহামারিতে পরিণত হয়ে গেছে। হত্যা ও হত্যাগন্ধী পরিবেশ তৈরী হয়ে আছে সেটা কিছুটা কমতে পারে।

বিজেপি ও তার উগ্র সহযোগীরা মুসলমানদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সভ্যতার সঙ্গে জড়িত সবকিছু মুছে দেয়ার অভিযান শুরু করেছিল। বিভিন্ন শহর-গ্রাম, পথ-ঘাট থেকে ইসলাম সংশ্লিষ্ট ও মুসলিম নাম পরিবর্তনের হিড়িক তুলেছিল তারা। মুসলিম ইতিহাস ও সংস্কৃতি বদলে ফেলার একটা প্রবণতাও দেখা গিয়েছে। রাজ্যে রাজ্যে বিজেপির পতনের পেছনে এসব কিছুরই একটা ভূমিকা ছিল , বলা হচ্ছে। মোদীর দলের এই পরাজয়ে এসব সাম্প্রদায়িক উগ্রতার কিছু হ্রাস ঘটবে কি না সময়ই বলে দেবে।

তবে এ-কথা কিছুটা জোর দিয়েই বলা যায়, সামগ্রিকভাবে ভারতে সংখ্যালঘু মুসলমান এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের ওপর অনৈতিক, সাম্প্রদায়িক ও উগ্র হিন্দুত্ববাদী যেই চাপটা ছিল এই পরাজয়ের ঘটনার মাধ্যমে সেসব প্রবণতায় একটা বড় ধাক্কা লাগবে।  কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন,ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠির ভেতরে যে সম্প্রদায়মুখি মনোবৃত্তি চাঙ্গা করে তোলা হয়েছে, সহজেই তা দূর হবে না। একটি –দুটি নির্বাচনের পরাজয়ে ধাক্কাটা হয়তো লাগবে, কিন্তু  জাতপাত ও সম্প্রদায়গত বিভেদের দেয়াল রাজনীতিকরাই উঠে যেতে দেবে না।

উপমহাদেশের রাজনীতিতে রাষ্ট্র পরস্পরের সম্পৃক্ততার একটা কথা প্রচলিত আছে। এক দেশের একটি প্রবণতার প্রভাব গিয়ে পড়ে পাশের দেশে । বাংলাদেশের প্রভাবটা যায় আশেপাশের দেশে। ভারত ও পাকিস্তানের প্রভাবও পড়ে আশেপাশের দেশে গিয়ে। এটাকে আঞ্চলিক রাজনীতির প্রবণতা-পরিস্থিতি বলা হয়।এখানে সবচেয়ে বড় দেশ হলো ভারত। বিজেপির কারণে গত কয়েক বছরে ভারতের রাজনৈতিক পরিবেশে যে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার বাড়বাড়ন্ত ,এই রাজ্য পরাজয়ে সে জায়গাটায় একটা সুবাতাস সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

বিজেপি সৃষ্ট উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সংকট শুধু ভারতে সীমাবদ্ধ ছিল না। এই উগ্রতার একটা ছাপ  আশপাশের দেশগুলোর হিন্দুদের মধ্যেও পড়তে শুরু করেছে। আশপাশের দেশে  একশ্রেণির হিন্দুদের মধ্যেও উসকানি পাওয়া ক্ষুব্ধতার একটা প্রবণতা বেশ লক্ষণীয়। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনা, হামলা, মামলা, প্রতিবাদের ক্ষেত্রেও এজাতীয় আলামত দৃশ্যমান । বিজেপির এই পতনের মাধ্যমে গোটা উপমহাদেশেই হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা, আধিপত্য বিস্তার ও উগ্রতার মাত্রায় হ্রাস  ঘটার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তবে এর সঙ্গে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতিকে গুলিয়ে ফেলাটা সম্ভবত ঠিক হবে না। কারণ ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির যে সাম্প্রদায়িক আকৃতি, তার সঙ্গে এ দেশগুলির ইসলামি দলগুলির খুব একটা মিল নেই। বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে মন্দির ভাঙা, হিন্দু নাম বদল অথবা হিন্দু হত্যা-উচ্ছেদের রাজনীতি কোনো ইসলামি দল করে বলে শোনা যায় না।

বিশেষভাবে গত বছরখানেক ধরে আসামে যে সংকটটা তৈরি হয়েছে, এটার মূল উদগাতা ছিল হিন্দুত্ববাদী বিজেপি ও তার সহযোগী দরগুলো। মুসলিম বাঙালিদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করা, দেশ থেকে বহিস্কার করা, নাগরিকত্বহীন করার অভিযানটা এখনো চলমান।  শুধু তাই নয়, আসামের ইস্যুকে টেনে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গসহ আরো কোনো কোনো রাজ্যে ছড়িয়ে দিয়ে বাঙালি মুসলমানদের কোনঠাসা ও নাগরিকত্বহীন করার একটা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল বিজেপি। সামগ্রিকভাবে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ও প্রদেশে মুসলমানদের বিপন্ন করার প্রয়াসটা বিজেপি ও সহযোগী সংগঠনগুলো চালাচ্ছিল বেশ জোরেশোরে। এই পতনের পর আশা করা হচ্ছে, বাঙালি ও মুসলিমবিরোধী এই প্রবণতাগুলোর গতিতেও হ্রাস ঘাটতি কিছু একটা ঘটবে।

এদিকে ডিসেম্বরের শেষে বাংলাদেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিজেপির এই পতনে বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে কী ধরনের প্রবাব পড়বে? বিশ্লেষকরা বলছেন, নেতিবাচক ও ইতিবাচক দু ধরনের প্রভাবই পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, কংগ্রেসের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। অতীতে যেভাবে তারা কংগ্রেসের সমর্থন পেয়েছে এবারের নির্বাচনেও তারা সেটা পেতেও পারে।  কংগ্রেসের সুদিন আসা মানেই কি আওয়ামী লীগের সুদিন? সবসময় কি দু-দেশীয় কূটনীতি একটি লাইন ধরেই চলে? কেউ কেউ মনে করেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস সরকার যেভাবে পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংকে পাঠিয়ে ‘সহযোগিতা’ করেছিল, ভারত এবার হয়তো সেটা করতে যাবে না। পর্দার আড়ালে যা-ই ঘটুক,প্রকাশ্যে এরকম কথাই বলছেন ভারতীয় কূটনীতিকরা।

প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকারের রাজ্য-পরাজয়ে বাংলাদেশের ভেতরে থাকা ভারতপন্থী ও হিন্দুত্ববাদী যেসব শক্তি রয়েছে তাদের গায়ে কি কোনো ধাক্কা আসলেই লাগবে? বাংলাদেশে ভারতের আধিপত্যপ্রবণ রাজনীতির যে প্রভাব সেটাও কি আগের তুলনায় কিছু কমবে? এসব প্রশ্নে উত্তর পেতে হয়তো অপেক্ষাই করতে হবে।

 

পূর্ববর্তি সংবাদ২৪ ডিসেম্বর থেকে ২ জানুয়ারি পর্যন্ত মাঠে থাকবে সেনা বাহিনী
পরবর্তি সংবাদযশোরে বিএনপি প্রার্থীর সমাবেশে বোমা হামলা, আহত ৮