সমাজের নিম্নবিত্ত মানুষের গায়ে হাত তোলার সংস্কৃতি রুখতে হবে

আতাউর রহমান খসরু ।। 

শ্রমজীবী ও নিম্নবিত্ত মানুষের শ্রম ও ঘামে সমাজ ও রাষ্ট্রের চাকা সচল থাকলেও তাদের প্রতি ‍উচ্চবিত্ত ও ক্ষমতাধরদের অবজ্ঞা ও অবহেলা, অবিচার ও অত্যাচারের মাত্রা যেন দিন দিন বাড়ছে। উচ্চবিত্ত ও ক্ষমতাধরদের বকাঝকা ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়া থেকে শুরু করে জীবন পর্যন্ত দিতে হচ্ছে সমাজের নিম্নবিত্তের লোকদের। দিনদিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে শিক্ষিত নিপীড়ক গোষ্ঠি। তারা সামাজিক শিষ্টাচার ও লোকলজ্জার বিষয়টিও উপেক্ষা করছে এখন। সামান্য অজুহাতে দুর্বলের উপর চড়াও হচ্ছে সবল।

কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল কুরআন এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. এবিএম হিজবুল্লাহ এই অবক্ষয়ের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘ইসলামি অনুশাসনের অভাবই এর মূল কারণ। আমি যদি ইসলামি অনুশাসনের কথা নাও বলি তবুও তাদের মধ্যে চারিত্রিক গুণাবলী ও মানবিকতার প্রচণ্ড রকম অভাব রয়েছে। পাশাপাশি যদি তাদের অর্থ-বিত্ত ও ক্ষমতা থাকে তখন তারা তাদের অধীনস্থদের তেমন কোনো মূল্যায়নই করতে চায় না, মানুষ হিসেবে তাদেরও কিছু অধিকার আছে তাও তারা ভুলে যায়। তাই একটা অবক্ষয় প্রতিনিয়ত সমাজে দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।’

তিনি মনে করেন, ‘সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক শিষ্টাচারের সংকট তৈরি হয়েছে। পরিবার, শিক্ষাঙ্গণ, অফিস-আদালত সর্বত্রই এই সংকট রয়েছে। অধীনস্থদের সাথে কিভাবে আচরণ করতে হবে তা মানুষ যেন আজ ভুলে গেছে।’

আবহাস এডুকেশন এন্ড রিসার্চ সোসাইটির চেয়ারম্যান ড. শামসুল হক সিদ্দিকের মতে, এর বাইরেও বড় আরেকটি সমস্যা হলো আইন প্রয়োগে অসমতা এবং ক্ষমতার অবৈধ চর্চা। তিনি বলেন, আইনের শিথিলতার ভূমিকা আছে। আইনের প্রয়োগ থাকায় ইউরোপে মানবাধিকারের লঙ্ঘনের ঘটনা অনেক কমে গেছে। সেখানে আইন ও মানবাধিকারের দৃষ্টিতে সবাই সমান হওয়ায় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য মানুষ আমাদের মতো এতোটা দুর্দমনীয় নয়। কারণ, তারা জানে আমি যতো ক্ষমতাধর হই না কেন বাড়তি সুবিধা আমি পাবো না।

ড. হিজবুল্লাহও তার সঙ্গে একমত পোষণ করেন। অবৈধ ক্ষমতার চর্চা মানুষকে কিভাবে ভারসাম্যহীন করে তোলে তার বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘যখন ক্ষমতা কারো হাতে চলে আসে তখন সে নিজেকে ক্ষমতার উর্ধ্বে মনে করে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাও তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়। কারণ, এতে সে নিজেই হয়রানির স্বীকার হতে পারে। আইনের প্রয়োগ যথাযথভাবে হলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা দিনে দিনে শূন্যের কোঠায় চলে আসা সম্ভব বলে আমি মনে করি।’

এই গবেষক আলেম তার প্রত্যাশা তুলে ধরে বলেন, ‘যদি ট্রাফিক আইনের মতো হাত তুললেই গাড়ি থেমে যাবে –এভাবে আইন প্রয়োগ করা যেতো এবং তাতে ক্ষমতাধর ও বিত্তশালীদের পৃথক বিবেচনার সুযোগ না থাকতো তবে নিম্নবিত্ত ও অধীনস্থদের উপর অবিচার ও অত্যাচার কমে যেত।’

তবে ড. এবিএম হিজবুল্লাহ ও ড. শামসুল হক সিদ্দিক উভয়ই মনে করেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে এই মানবিক ও সামাজিক সংকট দূর করা যাবে না। বরং এর জন্য প্রয়োজন পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের যৌথ প্রচেষ্টা। তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন মানুষের মাঝে ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগিয়ে তোলা।

ড. হিজবুল্লাহর ভাষায় ‘রাসুলুল্লাহ সা. এর হাদিসে আমরা এসব সমস্যার সমাধান দেখি। তিনি অধীনস্থদের ভাই বলেছেন। বলেছেন তোমরা যা খাবে তা তাদের খাওয়াবে এবং তোমরা যা পরবে তা তাদের পরাবে। হজরত আবু জর গেফারি রা.-এর মতো সাহাবি তার দাসকে নিয়ে এক পোশাকে এক সাথে হাজির হতেন। আমাদেরকে যারা সেবা দেয় তাদের কাজের বোঝা ভারি হয়ে গেলে তা হাল্কা করার জন্য কাজে আমাদেরও শরিক হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন রাসুলুল্লাহ সা.। এসব শিক্ষা কোথায়? এগুলো আমরা আমাদের জীবনের কোথাও চর্চা করি না। শিক্ষাঙ্গণেও শিক্ষার্থীদের এসব নৈতিক শিক্ষাগুলো দেয় না। পরবর্তীতে এর প্রভাব সমাজে পড়ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ থেকে উত্তরণের অন্যতম উপায় হলো ঘরোয়া পরিবেশে এসব মানবিক বিষয়গুলো আলোচনায় আনা। পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গণে, সমাজে এবং রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা। মসজিদের খতিবরা এবং দ্বীনি মাহফিলেও এ ব্যাপারে আলোচনা হতে পারে।’

ড. শামসুল হক সিদ্দিক ইসলামি শিক্ষার উপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘ইসলাম সেবাদানকারীদের শুধু অধিকার দিতে বলেনি; বরং তাদেরকে আত্মমর্যাদায় আঘাত করে এমন শব্দ, বাক্য বা আচরণ থেকেও বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে। যেমন, কোনো অসহায় মানুষকে সাহায্য করার পর তা বলতে নিষেধ করা হয়েছে কারণ তাতে তার আত্মমর্যাদায় লাগতে পারে। ইসলাম মানুষের মাঝে সমতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। হাদিসে এসেছে, মানুষ আল্লাহর কাছে দাঁতের মতো সমান। সুতরাং সামাজিক আচরণের ক্ষেত্রে সবাই যে সমান সেটা প্রকাশ পেতে হবে।’

সাথে সাথে মানুষের ভেতর এই মানবিক মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে হবে যে, তাদের সেবার উপর আমাদের জীবন চলছে। তাদের কারণে আমরা স্বস্তিদায়ক জীবনযাপন করতে পারছি। তারা আমাদের উপকার করছে। সুতরাং তাদের সাথে সর্বোত্তম আচরণ করতে হবে। বলেন ড. শামসুল হক সিদ্দিক।

অবশ্য তিনি মনে করেন, আমাদের সমাজে মানবিক মূল্যবোধ ও মানবাধিকারের চর্চারও যথেষ্ট অভাব রয়েছে। তাই মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরিও বিকল্প নেই। তাই ইসলামি শিক্ষা ও আদর্শ প্রচার ও প্রসার করার পাশাপাশি মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং আইন প্রয়োগের অসুবিধাগুলো দূর করা অপরিহার্য।

পূর্ববর্তি সংবাদএখনি সেনা মোতায়ন চায় বিএনপি
পরবর্তি সংবাদঢাকা-আরিচা মহাসড়কে আন্তঃনগর বাসে আগুন