ইজতেমার মাঠে হামলাকারী এক সাদপন্থীর রোমহর্ষক বর্ণনা, অতঃপর তওবা

আবরার আবদুল্লাহ ।। 

টঙ্গীর মাঠে সাধারণ সাথী, মাদরাসা ছাত্র ও শিক্ষকদের উপর সাদপন্থীদের নৃশংস হামলা চোখ খুলে দিয়েছে অনেক মানুষের। তাবলিগের ভেতর ও বাহিরের যেসব মানুষ দ্বিধাগ্রস্থ ছিলেন তাদের অনেকেরই দ্বিধা কেটে গেছে এই সন্ত্রাসী হামলার পর। তারা বুঝতে পেরেছেন, এভাবে যারা মানুষ খুন করতে পারে, যারা নিরীহ মানুষ, মাদরাসার ছাত্র ও উলামায়ে কেরামের গায়ে হাত তুলতে পারে তারা আর যাই হোক দ্বীনি কাজের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। রক্তাক্ত হামলার মাধ্যমে যারা প্রতিপক্ষকে শিক্ষা দিতে চায়, দখলদারিত্ব যাদের লক্ষ্য – ‘তাবলিগ’ তাদের মুখোশ মাত্র।

টঙ্গীর হামলার পর শুধু বাইরের মানুষ নয়; বরং সাদপন্থী অনেক সাথীও স্বপক্ষ ত্যাগ করছেন এবং তওবা করছেন অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য। এমনই একজন সাভারের সিফাতুল হক। টঙ্গী মাঠের নৃশংস হামলার সাক্ষী তিনিও। সাভার ভাকুর্তা ইউনিয়নে তার বাড়ি। গত সোমবার (১০ ডিসেম্বর) স্থানীয় ইমাম মাওলানা আবদুল্লাহ-এর কাছে তিনি তওবা করেন।

সিফাতুল হক পেশায় একজন ব্যবসায়ী। গ্রাম থেকে ঢাকার কারওয়ান বাজারে সবজি সরবারহ করেন তিনি। প্রায় ১৩ বছর তিনি তাবলিগি কাজের সাথে সম্পৃক্ত। ২০০৫ সালে এসএসসি পরীক্ষার পর স্থানীয় তাবলিগি সাথীদের সাথে চিল্লা দিতে বের হন সিফাতুল হক। এরপর থেকে তাবলিগের কাজের সাথে জুড়ে আছেন তিনি। অবশ্য এইচএসসির পর লেখাপড়া আর এগোয়নি। তাবলিগের নেসাব (দিনে আড়াই ঘণ্টা, মাসে তিনদিন, বছরে এক চিল্লা) সব সময় পূরণ করতে না পারলেও কাজের সাথে নিয়মিত সম্পৃক্ত থাকার চেষ্টা করেন তিনি।

সিফাতুল হক জানান, যার মাধ্যমে তিনি তাবলিগের কাজে সম্পৃক্ত হন তিনি একজন সাদপন্থী। প্রায়ই তিনি আলেমদের সমালোচনা করে বলতেন, আলেম হলে কী হবে, দ্বীনের কাজের জন্য আল্লাহ কবুল করেননি। দুনিয়ার লোভে দ্বীন চিনতে পারেনি। দাওয়াতের কাজ না করলে মাদরাসায় পড়িয়ে কী হবে? তাবলিগের সংকট শুরু হওয়ার পর তিনি মাঝে মাঝে আলেমদের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করতেন। বলতেন, আলেমরা বাড়াবাড়ি করছে।

বিশেষত কেরাণীগঞ্জ জোড় বন্ধ করে দেয়ার পর তিনি প্রচণ্ড ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পারলে হুজুরদের তিনি জবাই করবেন। এই তাবলিগি সাথী তাকে বুঝাতো, আলেমরা মূলত আমির হওয়ার জন্যই এমন করছে। এতো বড় জামাতের আমির হতে পারলে কতো লাভ বুঝো না! তার কথা শুনে সিফাতুল হকেরও মনে হতো, হুজুররা সত্যি বাড়াবাড়ি করছে। কিন্তু ইজতেমার মাঠের ঘটনার পর তার ভুল ভেঙ্গেছে।

একান্ত আলাপচারিতায় সিফাতুল হক বলেন, টঙ্গী ঘটনার আগের বৃহস্পতিবার বিকালেই সাথীরা জামাতবদ্ধ হয়ে চলে যান। আমার ক্ষেত কেনা (সবজির মাঠ) আছে তাই তাদের সাথে যাইনি। আমার নিয়ত ছিল আমি দুইদিন পর তাদের সাথে জুড়বো। কিন্তু শুক্রবার রাতেই এক সাথী আমাকে ফোন দিয়ে বলল, আগামীকাল আমরা টঙ্গীর মাঠে যাবো। তুমি চলে আসো। আমি বললাম, কাল সকালে আমার ট্রাক (সবজির) যাবে, আমি কিভাবে আসবো? সে বলল, আমির সাহেবের নির্দেশ – সবাই যেন মাঠে যাই। তরকারির ট্রাক বিদায় দিয়ে আমি সকালেই মাঠে যাবো বলে ফোন রেখে দিলাম।

১ ডিসেম্বরের বর্ণনা দিয়ে সিফাতুল হক বলেন, ভোর রাতে ট্রাক বিদায় দিয়ে টঙ্গী গেলাম। আমার যেতে যেতে প্রায় ৮টা বেজে গেলো। আমাদের জামাতের সাথীদেরকে আমি ব্রিজের কাছে (স্টেশন রোড) পেলাম। সবাই রাস্তায় বসে আছে। একজন পুরাতন সাথীকে মাঠে ঢোকা যাবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বললেন, যাইবো না মানে! আমি আইজকা গেইট ভাইঙ্গা ঢুকমু। অনেক সহ্য করছি, আর না। এমন ছ্যাচা দিমু না …!

তার কথা শুনেই আমার মনে হলো ঝামেলা হতে পারে। আমাদের বলা হলো, আমরা যেন গেট ছেড়ে কোথাও না যাই। আমরা সেখানেই অপেক্ষা করতে লাগলাম। অন্যান্য জায়গা থেকে আরও মানুষ এসে জড়ো হতে লাগলো।

১১টার দিকে হঠাৎ দেখি, এক পক্ষ অপরপক্ষকে ইট মারছে। সাথীরা গেট ভেঙ্গে ফেলছে। এক পর্যায়ে গেট ভেঙ্গে ফেললো এবং স্রোতের মতো সবাই ভেতরের ঢুকে গেলো। আমিও তাদের সাথে ভেতরে গেলাম। সবাই প্রচণ্ড রকম উত্তেজিত এবং হাতে হাতে লাঠি। এক ভয়াবহ দৃশ্য। নির্বিচারে একজন অপরজনকে আঘাত করছে।

আমিও বাহির থেকে ভেতরে ইট মেরেছিলাম। লাঠি হাতে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেছিলাম। ঢোকার সময় মনে হচ্ছিলো আজকে যাকে সামনে পাবো তাকেই সাইজ করবো (মারবো)। ভেতরের পরিবেশ দেখে ভয় পেয়ে গেলাম। আগে কখনও এমন মারামারি দেখিনি।

একটু ভেতরে অজুর হাউজের কাছে কয়েকজন সাথী মিলে একজন মাদরাসার ছাত্রকে মারছিল। ছাত্রটি তাদের পায়ে জড়িয়ে ধরে। বার বার ক্ষমা চায়- ভাই আমারে ছেড়ে দেন! আমি জীবনে আর মাঠে আসবো না। তখন আঘাতকারীরা বলল, ক্যান! মাঠ দখল করবি না। তোর বাপগোরে ডাক!

সিফাতুল হক আরও বলেন, আমার সবচেয়ে খারাপ লাগলো একজন মুরব্বির উপর তাদের অত্যাচার দেখে। মুরব্বি ভয়ে দৌড়াচ্ছিলেন মাঠ থেকে বের হওয়ার জন্য। তখন দুই সাইড থেকে দুইজন সাদপন্থী মুরব্বির দাড়ি ধরে টান মেরে ফেলে দিল। এরপর কতোক্ষণ লাথি মারল এবং লাঠি দিয়ে পেটাল। হামলাকারী ভেবেছিল তিনি একজন আলেম। কিন্তু তিনি বার বার বলছিলেন আমি আলেম না।

তারা বলছিল, জাকাত-সদকা খাইয়া আর কাম পাস না! ক’ হজরতজি আমার আমির! মুরব্বি প্রথমবার বলতে দেরি করলে পেছন থেকে লাঠি দিয়ে আঘাত করে তাকে মাটিতে ফেলে দেয়া হয়। এরপর মুরব্বিকে দিয়ে বলানো হয়, হজরতি মাওলানা সাদ আমার আমির, তিনি সারা বিশ্বের আমির, তিনি সারা পৃথিবীর সব আলেমের আমির। এসব বলার পর মুরব্বিকে ছেড়ে দেয়া হলো।

সিফাতুল হকের দাবি, তিনিই মুরব্বিকে মাঠ থেকে বের করে নিয়ে আসেন। তখন বাইরে থাকা মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকরা তাকে ধরে নিয়ে যায়। মুরব্বি বার বার বলছিলেন, আমি এতো বছর তাবলিগ করে কী পাপ করলাম? আলেম হওয়া কি পাপের কাজ যে আমারে ওরা মারল।

এরপর সিফাতুল হক আর মাঠে ফেরেননি। তখনি বাড়ি ফেরেন। কয়েকদিন বাড়ি থেকে বেরও হননি। বারবার বৃদ্ধব্যক্তির কথা মনে পড়ছিল, মাদরাসার ছাত্রটার কথা মনে হচ্ছিল। ঠিকমতো ঘুমাতেও পারেননি কয়েক রাত। বাড়ি ফেরার পথেও অনেক মানুষকে আহত অবস্থায় দেখেন তিনি। পুরো দৃশ্যটাই তার মন ভারাক্রান্ত করে রাখে। তিনি হিসাব মেলাতে পারছিলেন না। তাবলিগের শিক্ষাই যাদের মধ্যে নেই তারা কিভাবে তাবলিগের সাথী হতে পারে? মুরব্বিরা বলেন, আলেমদের সান্নিধ্যও ইবাদত। অথচ তারাই আজ আলেমদের খুঁজে খুঁজে মারছে।

সিফাতুল হক তার মনের অস্থিরতা নিয়ে মহল্লার ইমাম মাওলানা আবদুল্লাহর সঙ্গে দেখা করেন। তিনিই মাওলানা সাদের ব্যাপারে আলেমদের আপত্তির কথাগুলো বুঝিয়ে বলেন তাকে। এতে সিফাতুল হক সত্য বুঝতে পারে এবং সাদপন্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নেন।

পূর্ববর্তি সংবাদরাতভর ইসরাইলিদের অভিযান, আটক ৪০ ফিলিস্তিনি 
পরবর্তি সংবাদনির্বাচনে ইন্টারনেটের গতি কমালে যেসব ক্ষতি হবে