শুধু দাবির কারণে ভাষ্যকেই মূল মনে করাটা বড় ধরনের বিচ্যুতি সৃষ্টি করে

মুহাম্মাদ যাকারিয়া আবদুল্লাহ ।। 

আরবের একজন আলিম সায়্যিদ সাবিক রাহ.। তার একটা কিতাব আছে। কিতাবের নাম ‘ফিকহুস সুন্নাহ’। সুন্নাহর ফিকহ। আমরা শুনেছি ফিকহু আবী হানিফা, ফিকহু মালিক, ফিকহুশ শাফেয়ী, ফিকহু আহমদ ইবনে হাম্বল রাহ.। আবূ হানিফার ফিকাহ, মানে যে ফিকহ আবূ হানিফা রাহ.-এর নেতৃত্বে সংকলিত হয়েছে। ইমাম মালিক রহ. এর ফিকাহ, অর্থাৎ যে ফিকহ ইমাম মালিক রাহ.-এর নেতৃত্বে সংকলিত হয়েছে। এরকম আমরা জানি। কিন্তু এই কিতাবের শিরোনাম হল, ফিকহুস সুন্নাহ। সুন্নাহর ফিকহ। এর মানে কী? এর অর্থ যেন এই যে, আমার ফিকাহটা সুন্নাহর ফিকহ, আর অন্য ফিকাহ যেগুলো আছে সেগুলো উম্মতের ফিকাহ। পরবর্তী লোকদের ফিকাহ।  তো তুমি কোনটা মানবে? সুন্নাহর ফিকাহ মানবে, নাকি আবু হানিফার ফিকাহ মানবে? এরকম প্রশ্ন যদি আসে তাহলে মানুষ তো একথাই বলবে যে, আমি সুন্নাহর ফিকাহ মানব। হাদীস ও সুন্নাহরই অনুসরণ করব। কিন্তু যদি একটু চিন্তা করা হয়, তাহলে বুঝে আসবে যে, এখানে উপস্থাপনার ভুল আছে।

একে যদিও নাম দেওয়া হয়েছে ফিকহুস সুন্নাহ, সুন্নাহর ফিকাহ- আসলে এটা ‘ফিকহুস সায়্যিদ সাবিক’ সায়্যিদ সাবিকের ফিকহ। বর্তমান সময়ের একজন আলিম সায়্যিদ সাবিকের ফিকাহ। আর ওটা হল আগের যুগের, তাবেয়ী যুগের স্বীকৃত ইমাম ও মুজতাহিদ ইমাম আবূ হানিফা রাহ.-এর  ফিকহ। অথচ শুধু নামের ভুল দাবির কারণে মানুষ মনে করে, এটা সরাসরি সুন্নাহ, আর ওটা ব্যক্তির রায়, ব্যক্তির মত। আসলে উভয় ফিকাহ’র ভিত্তি হল সুন্নাহ। ইমাম আবু হানিফা রাহ. যেই ফিকাহ সংকলন করেছেন তার সূত্র কী? সূত্র হল সুন্নাহ। সুন্নাহ থেকেই তিনি ফিকহ আহরণ করেছেন। সুন্নাহর বিধি-বিধানকে এবং সুন্নাহ থেকে আহরিত বিধি-বিধানকে সংকলন করেছেন। ভাষ্য ও সংকলনটা তার। সূত্র হচ্ছে সুন্নাহ। তেমনি সায়্যিদ সাবিক যেই ফিকহ উপস্থাপন করেছেন, এখানেও সূত্র হল সুন্নাহ। কিন্ত তা থেকে ফিকহ আহরণকারী ও সংকলনকারী  হলেন সায়্যিদ সাবিক।

এখন যদি ইনসাফের সাথে কথা বলেন, তাহলে সূত্র উল্লেখ করলে দুই জায়গাতেই সূত্র উল্লেখ করুন। এটাও ফিকহুস সুন্নাহ, ওটাও ফিকহুস সুন্নাহ। এটাও সুন্নাহ থেকে আহরিত ফিকহ, ওটাও সুন্নাহ থেকে আহরিত ফিকহ। আর যদি সংকলক ও আহরণকারীর কথা উল্লেখ করেন তাহলে উভয় জায়গায় উল্লেখ করুন। এটা আবু হানিফার ফিকহ, অর্থাৎ সুন্নাহ থেকে আবু হানিফার আহরণ ও সংকলন। আর এটা সায়্যিদ সাবিক-এর ফিকহ। সুন্নাহ থেকে সায়্যিদ সাবিকের আহরণ ও সংকলন।

এখন জিজ্ঞাসা করুন; কোনটা মানবেন? পরিষ্কার প্রশ্ন করলে যে কোনো চিন্তাশীল মানুষ বলবেন, সায়্যিদ সাবিক হলেন বর্তমান সময়ের একজন আলিম, তার ফিকহ মানার চেয়ে তাবেয়ী যুগের গোটা উম্মতের সর্বস্বীকৃত মুজতাহিদ ইমাম, ইমাম আবু হানিফা রাহ. যে ফিকহ আহরণ করেছেন সেটা মানাই উত্তম। তিনি সুন্নাহকে যেভাবে বুঝেছেন তার বুঝটাই অনুসরণ করা উচিত। সেটাই হাদীস ও সুন্নাহর অধিকতর নিকটবর্তী হবে। আর সেটা তো যুগ যুগ ধরে পরীক্ষিত, নিরীক্ষিত। সুতরাং সেখানে ভুলের সম্ভাবনা কম। ভুলত্রুটি যদি থেকেও থাকে সেগুলো চিহ্নিত হয়ে গিয়েছে। পরিত্যক্ত হয়ে গিয়েছে। একই কথা ফিকহের অন্যান্য ইমামদের ক্ষেত্রেও। তো কখনো কখনো শুধু দাবির কারণে ভাষ্যকেই মূল মনে করা হয় এবং  বড় ধরনের বিচ্যুতি সৃষ্টি হয়।

এখন মনে করুন, কোনো একজন আলিম যদি বলেন যে, আমি সীরাত মোতাবেক চলি, সীরাত মোতাবেক চালাই। আর অন্যরা নিজেদের অভিজ্ঞতা মোতাবেক চলেছে ও চালিয়েছে। ‘তাজরিবা’র ভিত্তিতে চলেছে ও চালিয়েছে। যদি কেউ এটা বলেন, তাহলে সাধারণ শ্রোতা তো বলবে, তাই তো! আমরা কারো অভিজ্ঞতার কেন অনুসরণ করব? আমরা তো সীরাতকেই অনুসরণ করব। কিন্তু এখানেও সেই দাবির ভুল। আমি সীরাত থেকে যা বুঝেছি সেটিই সীরাত, নাকি সেটা আমার বুঝ, আমার ভাষ্য ও ব্যাখ্যা? আমার পূর্বের উলামায়ে কেরাম যেভাবে চলেছেন, চালিয়েছেন বিনা দলিলে সেটাকে নিছক তাজরেবা বা অভিজ্ঞতা বলে দেওয়া অন্যায়।

তাহলে বিষয়টা এই দাঁড়িয়েছে যে, আমি যা বলেছি তা হচ্ছে সীরাত ও সুন্নাহযর ক্ষেত্রে আমার ভাষ্য, আমার উপলব্ধি। আর অপরটা হচ্ছে আমার চেয়ে প্রবীণ ও অভিজ্ঞ দশজন, বিশজন মানুষের ভাষ্য, সুন্নাহ ও সীরাতের উপলব্ধি। এখন কোনটা অনুসরণের বেশি উপযোগী? এক দুই ব্যক্তি যেটাকে সীরাত মনে করছেন সেটা অনুসরণের বেশি উপযোগী নাকি দশজন যেটাকে সীরাত মনে করছেন সেটা অনুসরণের বেশি উপযোগী? কথা যদি ইনসাফের সাথে বলতে হয় তাহলে তো এভাবেই বলতে হবে। আমি এটাকে সীরাত মনে করছি, আর ইতিপূর্বের লোকেরা ওটাকে সীরাত মনে করেছেন। তো আপনারা কি আমার সীরাতের বুঝ অনুসরণ করবেন, না দশজনের সীরাতের বুঝ অনুসরণ করবেন? এভাবে যদি সামনে আসে তাহলে যে কোনো চিন্তাশীল ব্যক্তিই বলবেন, আমি তো একজনের বুঝকে অনুসরণ করব না, আমি দশজনের বুঝকে অনসরণ করব। কারণ, একজনের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। দশজনের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম। কাজেই দশজন যেটা বুঝেছেন আমি সেটাকে অনুসরণ করব। একজন যেটা বুঝেছেন আমি সেটাকে অনুসরণ করব না। বিশেষ করে যেখানে একজনের বুঝ আর দশজনের বুঝের মাঝে সংঘর্ষ হয় সেখানে একজনের বুঝকে অবশ্যই বর্জন করতে হবে। দশজনের বুঝকেই গ্রহণ করতে হবে। এরপর যখন শরীয়তের দলিল-প্রমাণের মাহির ব্যক্তিগণ দশজনের বুঝকে সঠিক বলেন তখন তো অস্পষ্টতার কোনোই অজুহাত থাকে না।

ইসলাম আমাদের শেখায় যে, মানুষের ভুল হতে পারে। কিন্তু শুধু এইটুকুই তো শেখায় না, ইসলাম আরো শেখায় যে, সেই ভুলের উপর অটল থাকা যাবে না। সেটাকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না। এটা যদি করি তাহলে ইসলামের ক্ষতি করব, মুসলমানদের ক্ষতি করব।

একজন বড় ইমাম ছিলেন ইমাম আবুল হুসাইন আল-কারাবীসী রাহ.। তিনি তার এক কিতাবে বিভিন্ন বিষয়ে পূর্বের যুগের লোকদের কিছু ভুল সিদ্ধান্ত উল্লেখ করেছেন। উল্লেখ করার পর বলেছেন যে, এই সিদ্ধান্তগুলো ভুল। এসকল সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা যাবে না। এরপর তিনি বলছেন, কেউ যদি প্রশ্ন করেন, العلم أهل هؤلاء من যাদের মত এখানে উল্লেখ করা হয়েছে তারাও তো আলিম। সুতরাং তাদের মত অনুসরণ করা উচিত। তিনি বলেন, তাহলে জবাবে বলব-

‘একজন আলিমের ভুল ইসলামকে ধ্বংস করে, এক হাজার জাহেলের ভুল ইসলামকে ধ্বংস করে না।’ (তবাকাতুশ শাফিইয়্যাতিল কুবরা ২/১২৫) এই কথাটার উপরে আরবের বিখ্যাত মনীষী শায়খ মুহাম্মদ আওয়ামাহ হাফিযাহুল্লাহু তাআলা একটি টীকা লিখেছেন । তিনি যে ‘ইসলামকে ধ্বংস করে’ বলছেন, একজন আলিমের ভুল ইসলামের ক্ষতি করে কখন? ইসলামের ক্ষতি করে তখন  যখন সেই ভুলটার পক্ষপাতিত্ব করা হয়, সেটাকে সমর্থন করা হয়, সেই ভুলকে সমর্থন করে সেটাকে শক্তিশালী করে ফেলা হয়। তখন এটার দ্বারা ইসলামের ক্ষতি হয়, মুসলমানদের ক্ষতি হয়, ফেরকা তৈরি হয়। কিন্তু সে ভুলের সমর্থন না করা হলে অথবা ভুলকে ভুল হিসেবে চিহ্নিত করে দাফন করে দিলে এই ভুল দ্বারা ইসলামের ক্ষতি হয় না, মুসলমানের ক্ষতি হয় না।

কাজেই ইসলামের প্রতি এবং সত্যের প্রতি আমাদের ওয়াফাদারি এই যে, মানুষের ভুল হতে পারে, মানুষের স্বভাবও বিভিন্ন রকম, ভুল থেকে ফিরে আসা সবার পক্ষে সহজ হয় না, অনেকের তো বিষয়টা দ্রুত বুঝেও আসে না, কিন্তু অন্য যারা দায়িত্বশীল ও বুদ্ধিমান মানুষ, যারা আহলে ইলম, যাদের কাছে নিজের মূল্য আছে, নিজের দ্বীনদারির মূল্য আছে এবং ইসলামের মূল্য আছে, ইলমের মূল্য আছে তাদের কর্তব্য, ঐসকল ভুলের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেওয়া। তাহলে ধীরে ধীরে ভুলটা দুর্বল হয়ে যাবে এবং বিলুপ্ত হয়ে যাবে। যিনি ভুল করেছেন তার জন্যও সঠিক পথে ফিরে আসাটা সহজ হবে। কিন্তু ভুলের পক্ষে সমর্থন অব্যাহত থাকলে যেমন ভুল সম্পর্কে ধোঁয়াশা তৈরি হবে তেমনই যিনি ভুল করেছেন তারও সমর্থক-সাপোর্টার থাকার কারণে ভুল থেকে ফিরে আসাটা কঠিন হবে। এটা তার প্রতিও কল্যাণকামিতা নয়, ওয়াফাদারি নয়, দ্বীনের প্রতিও ওয়াফাদারি নয়। তো ‘তানাযূ’-এর ক্ষেত্রে, বিবাদ-বিসংবাদের ক্ষেত্রে একটি মূলনীতি এখানে উপস্থাপন করলাম।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে আমাদের জীবনের সকল ক্ষেত্রে হক্কানী উলামা ও জমহুর উলামা যে পথে চলেন, যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন সেই পথে চলার, সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে থাকার তাওফীক দান করুন। ইনশাআল্লাহ এটাই হক। ইনশাআল্লাহ এটার মাধ্যমেই আমাদের দ্বীনদারি রক্ষা পাবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে আমল করার তাওফীক দান করুন।

 

পূর্ববর্তি সংবাদমসজিদে বসে কি দুনিয়াবি কথা বলা যাবে?
পরবর্তি সংবাদড. কামালের গাড়িবহরে হামলা