জিতবে না জেনেও কেন এত প্রার্থী দেয় ইসলামি দলগুলো?

আতাউর রহমান খসরু ।। 

বিভিন্ন জোট ও জোটের বাইরে থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে একাধিক রাজনৈতিক দল। নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় জোটবদ্ধ দলগুলোর তৎপরতা চোখে পড়লেও এখনও প্রচারণা শুরু করতে পারেনি এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়া ইসলামি দলগুলো। আবার কেউ নামমাত্র প্রচারণা শুরু করেছেন। অবশ্য ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর ব্যতিক্রম। দলটি ২৯৯ আসনে প্রার্থী দিয়েছে এবং প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ায় নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছে। যদিও তাদের সব আসনের প্রচারণা সমান নয়।

অভিযোগ রয়েছে, ইসলামি দলগুলো নির্বাচনে অংশ নিলেও প্রচারণায় নামেন না তারা। যারা নামেন তাদের প্রচারণাও পোস্টার-লিফলেটে সীমাবদ্ধ থাকে। বড় দলের প্রার্থীদের চোখ ধাঁধানো প্রচারণার বিপরীতে ইসলামি দলের প্রার্থীদের নামমাত্র প্রচার ভোটারের মনে রেখাপাত করতে পারে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইসলামি দলগুলোর সাংগঠনিক দুর্বলতার সাথে সাথে প্রার্থীর আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও হতাশা নির্বাচনের মাঠে তাদের গতিশীল হওয়ার পথে মূল অন্তরায়। প্রার্থী ধরেই নেই আমি বিজয়ী হবো না। সুতরাং অর্থ ও সময় ব্যয় তাদের কাছে অর্থহীন বলেই মনে হয়।

তাহলে ইসলামি দলগুলো নির্বাচন করে কেন? বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমির ও ঢাকা মহানগর সভাপতি মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদি বলেন, ‘আমরা মূলত খেলাফত প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার অংশ হিসাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করি। নির্বাচনের সময় জনগণ অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় প্রার্থীদের প্রতি বেশি মনোযোগী হয়। এতে আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সংগঠনের কথা তাদের কাছে পৌঁছানো সহজ হয়।’

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দীনও মাওলানা হামিদির কাছাকাছি উত্তর দেন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের মাধ্যমে দলকে সুসংহত করা ও সাংগঠনিক তৎপরতা বৃদ্ধি করা সহজ হয়। নির্বাচন করার পেছনে সংগঠন গুছিয়ে আনাও আমাদের অন্যত উদ্দেশ্য।’

ইসলামী ঐক্যজোটের নেতা আনসারুল হক ইমরান অবশ্য মনে করেন, নির্বাচনী কার্যক্রমগুলোতে অন্যান্য দলের সঙ্গে ইসলামি দলগুলোর তুলনা করা ঠিক নয়। বিশেষত এবার তো নয়। কেননা যেখানে বিএনপির মতো দলের প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে ভয় পাচ্ছে, যেখানে তারা নিষ্ক্রিয় সেখানে ইসলামি দলের প্রার্থীদের দোষ দিয়ে লাভ সুযোগ কোথায়?

তবে তিনি স্বীকার করেন ইসলামি দলের প্রার্থীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে হতাশা কাজ করে। নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে নিজের অর্থ ও সময় ব্যয় করার মতো সাহস খুব কম মানুষেরই আছে।তার নিজ দলের প্রার্থীদের মধ্যেও সম্ভাবনা বিচারে প্রচারণায় তারতম্য রয়েছে বলে জানান তিনি।

মাওলানা হামিদির কাছে আমার প্রশ্ন ছিলো, যদি নির্বাচনকে খেলাফত প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাই মনে করেন, তাহলে অবস্থান সৃষ্টির মতো প্রচারণায় যান না কেন? উত্তরে তিনি বলেন, খেলাফত প্রতিষ্ঠার অংশ মনে করি বলেই নির্বাচন করি। অংশগ্রহণ করতেও তো অর্থ ব্যয় হয়। কিন্তু তাই বলে কি নিঃস্ব হয়ে যেতে হবে? সেটা করলে তো আগামীতে কাজ করার সুযোগও বন্ধ হয়ে যাবে।

অবশ্য একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণে আইনী বাধ্য-বাধকতা রয়েছে অনেক দলেরই। ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে বাধ্য হচ্ছে তারা। না হলে নির্বাচনী আইন অনুযায়ী নিবন্ধন বাতিল হবে দলগুলোর।

অবশ্য প্রার্থীদের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এই তিনজন ইসলামিক রাজনীতিক। তাদের দাবি, প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ার পর থেকেই তাদের প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছেন। এলাকার নির্বাচনী পরিবেশ অনুযায়ী সবাই নিজ নিজ এলাকায় প্রচার চালাচ্ছেন।

ইসলামি দলগুলো নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করা এবং দাওয়াতি কার্যক্রম জোরদার করার দাবি জানালেও অনেকেই মনে করেনি ইসলামি দলগুলোর বিক্ষিপ্তভাবে প্রার্থী না দেয়াটা ভালো। কেননা ইসলামি দলগুলোর প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করতে না পারলে তা সমাজে ইসলামপন্থীদের দুর্বল প্রতিনিধিত্বের প্রতি ইঙ্গিত দেয়। অনেক সময় দেখা যায়, গোটাি আসনে সবকটি ইসলামি দল মিলে ভোট পেয়েছে ৩ থেকে ৫ হাজার। কখনো এরচেয়েও কম ভোটের খবরও আসে। এতে জনগণের মধ্যে ইসলামি রাজনীতির জনপ্রিয়তা-অজনপ্রিয়তার ভুল মাপকাঠি দাঁড়িয়ে যায়।

পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ভোট একটা পরীক্ষাকেন্দ্র বা প্রতিদ্বন্দ্বীতার ক্ষেত্র। এর ফলাফল থাকে প্রকাশ্যে। এজন্য যথার্থ প্রস্তুতি না নিয়ে ভোটের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামলে শুধু দলের ইমেজের ক্ষতি হয় এমন নয়, বরং ইসলামি রাজনীতি বা ইসলামপন্থার প্রতি জনগণের অপছন্দের ভুল বার্তাও তৈরি হয়।

পূর্ববর্তি সংবাদনাস্তিক্যবাদীদের সহযোগিতা করায় বিটিআরসির কর্মকর্তাদের গ্রেফতার দাবি করল ওলামা লীগ
পরবর্তি সংবাদনানা নাটকীয়তার পর পদত্যাগে বাধ্য হলেন শ্রীলংকার রাজাপাকসে