সাংবাদিকতার ইজ্জত ‘চাগাড়’ দিল দুই হোসেনে!

খসরূ খান ।।

সাংবাদিকের প্রতি হুমকি বা মানহানি সম্প্রতি একটা ইস্যু হয়ে গেছে। এই ইস্যুর চেহাটাও দিন দিন অন্যরকম হয়ে উঠছে। মনে হচ্ছে, সাংবাদিকতার কোমল ও ঘুমন্ত ইজ্জত হঠাৎ করেই যেন জাগ্রত ও প্রখর হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাস্তবতা কি আসলেই এ রকম?

এরই মধ্যে বিএনপি সমর্থিত ঐক্যফ্রন্ট গঠনে জড়িত ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন এ-জাতীয় অভিযোগে কারাগারে গেছেন। এখন আবার ঐক্যফ্রন্টের প্রধান নেতা ড. কামাল হোসেন টার্গেটে। ১৪ ডিসেম্বর শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে কোনো সাংবাদিকের পক্ষ থেকে ‘উত্তেজক’ প্রশ্ন করা হলে তিনি রেগে যান। এক পর্যায়ে প্রশ্নকারীকে ধমক দিয়ে তিনি কিছু কথাও বলেন।এই ছিল ঘটনা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পেশায় নিয়োজিত সাংবাদিকের মানহানি বা তাকে হুমকি দেওয়াটা একদমই ঠিক না। সংবাদকর্মীর কাজে বাঁধা সৃষ্টি করাও মোটেই উচিত না। কিন্তু ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে যুক্ত দুই হোসেনের (মঈনুল হোসেন ও কামাল হোসেন) বিরুদ্ধে যেভাবে উঠে পড়ে লেগেছেন সরকারী দলঘেঁষা সাংবাদিক নেতারা, তাতে সামনে চলে এসেছে পরিস্থিতির আনুকূল্যকে কাজে লাগানোর চেষ্টাটা। মুহূর্তেই প্রতিক্রিয়া, তড়িৎ মামলা দায়ের, দিন পেরুতেই মানববন্ধন-একটা বিশেষ সময় ও পরিস্থিতিগত আনুকূল্যের সুবিধা গ্রহণের বার্তা দিচ্ছে। কারণ, এর আগেও সংবাদকর্মীদের পেটানো, পিটিয়ে আহত করা, তিরস্কার ও হুমকি দেওয়ার বহু ঘটনা ঘটেছে। তখন সাংবাদিক নেতাদের এত তাড়িঘড়ি কোমর বেঁধে নামতে দেখা যায়নি। সম্ভবত সেসব ঘটনায় শাসকদলের লোকজনের সম্পৃক্ততা থাকায় দাবি নিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়াতে কুণ্ঠিত হয়েছেন এ পেশার কাণ্ডারিরা।

রাজনীতি ও নির্বাচন চলবে রাজনীতির ভুলশুদ্ধ অংক মিলিয়েই। সেখানে ভালোমন্দ অনেক রকম ব্যাপার ঘটবে।ওই ব্যাপারগুলো দেখে জনগণ নিজেদের মতো প্রতিক্রিয়া জানাবে। কিন্তু সাংবাদিক সমাজের একটি প্রভাবশালী অংশ যদি রাজনীতির এই খেলায় জড়িয়ে গিয়ে জাগা-ঘুমের অনুশীলনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, তাহলে তো সংবাদকর্মীদের নিজেদের পেশা ও স্বার্থের অঙ্গনটাই নষ্ট হয়ে যেতে পারে।এটা কি নেতা সংবাদকর্মীরা বুঝতে পারছেন না? না কি বুঝে শুনেই জার্সি ছাড়াই খেলায় নেমেছেন?

ভোটের আগে কোনো কোনো দল ও জোটের নেতাদের দিকে বিশেষ রকম প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া, উত্তর দিতে না চাইলেও খোঁচাতে থাকার মতো এক্টিভিজম সাংবাদিকতার স্বাভাবিক রীতি –সৌজন্যের মধ্যে পড়ে কিনা- সাংবাদিকদেরই ভেবে দেখা দরকার। সংবাদকর্মীর আচরণে দলবাজির ভূমিকা আছে বলে সন্দেহ সৃষ্টি হলে তো পেশার জন্য সেটা সাংঘাতিক ক্ষতিকর!উসকানি সৃষ্টির অভিযোগ তো আরো মারাত্মক!এসব বিষয় নিয়ে সংবাদকর্মী-জগতের মাথা ও নেতাদের ভাবা উচিত। তেলপ্রদান ও উসকানিদান কোনোটাই কি সুস্থ সাংবাদিকতা চর্চার মধ্যে পড়ে? অথচ এসবই এখন ঘটছে। দল, নেতা ও আনুকূল্য দেখে।

কত সাংবাদিকের চাকরি যায়, কত সাংবাদিক মার খায়, কত সাংবাদিক অপমানিত হয়– সেদিকে চোখ যায় না। সরকারের লোকেরা তেতে উঠবে যেসব ইস্যুতে, কেবল সেগুলাতেই অতিরিক্ত ব্যস্ততা দেখালে একটা অন্যরকম অর্থ প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায় না? সংবাদকর্মীদের ভাবনারই বিষয়,যদি তারা ভাবেন!

বহু ওসমান,বহু মজুমদার আঘাত করে-গালি দিয়ে পার হয়ে যায়, কেউ কিছু বলে না, কিন্তু দুই হোসেনে এসে ইজ্জত ‘চাগাড়’ দিয়ে ওঠে। লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আল্টিমেটাম পর্যন্ত ছুঁড়ে দেয় নেতারা! ‘স্যরি’ বললেও ছাড়ে না। ভাবসাবে সে-ই বীরত্ব!

সাংবাদিকতার নিরাপত্তা ও সম্মানের জন্য প্রতিক্রিয়ার এই জোয়ার-ভাটা ভবিষ্যতের জন্য কোনো সুখবর বয়ে আনবে বলে তো মনে হয় না; বর্তমানের জন্যও না।

পূর্ববর্তি সংবাদএভাবে সহিংস আক্রমণ চালাবে ভাবতেও পারিনি : মির্জা আব্বাস
পরবর্তি সংবাদনির্বাচনে ভোটকক্ষ থেকে সম্প্রচার করা যাবে না : সিইসি