‘মুক্তিযুদ্ধের সময় ট্রেনিং শেষে যোদ্ধারা কুরআন হাতে শপথ গ্রহণ করতেন’

আতাউর রহমান খসরু ।।

মহিউদ্দিন আকবরের সাধারণ পরিচয় হলো কবি, ছড়াকার, লেখক ও নজরুল গবেষক। কিন্তু তার আরেকটি পরিচয় হলো তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধাও। মুক্তিযুদ্ধের একদম শুরু থেকেই তিনি সক্রিয় ছিলেন যুদ্ধের ময়দানে। যুদ্ধে তিনি তার ভাই, চাচাসহ একাধিক আপনজনকে হারিয়েছেন। পাকিস্তান বাহিনী পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে তাদের বসত বাড়িসহ সবকিছু।

যুদ্ধের প্রাথমিক দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠির উপর বাংলাদেশের মানুষ ক্ষিপ্ত ছিলো। তাদের জুলুম-অত্যাচার, বৈষম্য ও ক্ষমতা দখল করে রাখার মতো বিষয়গুলো মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছিলো। মানুষ বুঝতে পারছিলো দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন আসছে। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে গেলো। দেশের অবস্থা ছিলো থমথমে। এরই মধ্যে ২৫ মার্চ ঢাকা সেনা অভিযান শুরু হলে মানুষ বুঝতে পারলো স্বাধীনতা ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ নেই। আমরা তখনি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলাম।

৭ মার্চের পরপরই যুবকদের মধ্যে যুদ্ধের এক ধরনের প্রস্তুতি শুরু হয়। তখন বিক্ষিপ্তভাবে দেশের কোথাও কোথাও সশস্ত্র প্রশিক্ষণও হয়। মাদারীপুরের নাজিমউদ্দিন কলেজ মাঠে তেমনি একটি প্রশিক্ষণে অংশ নেন মহিউদ্দিন আকবর। পুলিশের সহযোগিতায় এই প্রশিক্ষণ চলে পুরো মার্চ মাসজুড়ে। মার্চে সারা দেশে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর এই প্রশিক্ষণ শিবিরটি বন্ধ হয়ে যায়। তখন কেউ কেউ উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে চলে যান।

প্রাথমিক ট্রেনিংয়ের ভিত্তি করেই মহিউদ্দিন আকবর অংশগ্রহণ করেন যুদ্ধে। তিনি ৯ নং সেক্টরের অধীনে যুদ্ধ করেন। তবে পরিপূর্ণ প্রশিক্ষণ না থাকায় সরাসরি অভিযানে খুব বেশি অংশগ্রহণের সুযোগ পাননি তিনি। যুদ্ধের সময় তার মূল কাজ ছিলো অস্ত্র-গোলা-বারুদ বহন করা, পাহারা দেয়া, সংবাদ সংগ্রহ ও পৌঁছে দেয়া, অফিসিয়াল কার্যক্রমসহ সম্মুখ যুদ্ধের বাইরের পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে রাজবাড়ি এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের ডাইরেক্টরি প্রস্তুতের সময় তথ্য, লেখালেখি ও সম্পাদনার কাজ করেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধে লেখক মহিউদ্দিন আকবরের পরিবারের একাধিক সদস্য অংশগ্রহণ করেন। তাই তার পরিবারের উপর প্রতিপক্ষের আক্রোশ ছিলো অনেক বেশি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক মাস পর তাদের গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনী সামরিক অভিযান চালায়। অভিযানের মুখে এক কাপড়ে বাড়ি ছাড়েন তার পরিবারের সদস্যরা। একান্নবর্তী পরিবারের ১৯টি ঘরই সেদিন পাক বাহিনী গান পাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। এ সময় তার বৃদ্ধ চাচা মোতালেবকে মাথায় গুলি করে হত্যা করে এবং তাকে পুকুরের মাটিতে পুঁতে রেখে যায় পাকিস্তানি বাহিনী। পরবর্তীতে তাদের ভস্মিভূত বাড়িতেই স্থাপন করা হয় মাদারীপুরের বিখ্যাত ‘দিগলাপাড়া মুক্তিযুদ্ধ’ ক্যাম্পটি।

যুদ্ধের সময় কখনো জীবনঝুঁটিতে পড়েছিলেন কিনা? উত্তরে এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘দু’বার হয়েছিলো। একবার আমাকে আখ বিক্রি করতে নাজিমউদ্দিন কলেজের পাশের কালভার্টে পাঠানো হয় –তখন এমন অনেককে আখ, বাদাম ইত্যাদি বিক্রির জন্য পাঠানো হতো। উদ্দেশ্য অর্থ উপার্জন এবং শহরের সংবাদ সংগ্রহ করা। এখানে পাকিস্তান বাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন মেজর যায়িদ নামের এক অফিসার। তিনি একটু পাগলাটে ছিলেন। একা একা বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরে বেড়াতেন তিনি। আমি তাকে লক্ষ্য করে পাগলা অফিসার, পাগলা অফিসার বলছিলাম। কিন্তু তিনি যে আমার কাছাকাছি ছিলেন তা খেয়াল করিনি। মেজর যায়িদ এসে আমাকে ধরলেন। সেদিন সত্যি ভয় পেয়েছিলাম। অনেক অনুরোধ করে তার হাত থেকে আমি রক্ষা পাই।’

আরেকটি ঘটনা হলো, ১১ তারিখ মাদারীপুর স্বাধীন হয়। সেদিন চূড়ান্ত অভিযানের আগে ফ্রন্টের যোদ্ধারা আমাদের একটু দূরের টিনের ঘরে মাটিতে শুয়ে থাকতে বলেন। সাবধান করেন যেন মাথা উঁচু না করি। কিন্তু আমি মাথা উঁচু করি। তখনি আমার কানের পাশ দিয়ে শাঁই করে কিছু একটা চলে গেলো। সকালে দেখি টিনের দুই পাশেই ফুঁটো।

মহিউদ্দিন আকবর দৃঢ়তা সঙ্গে বলেন, মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিলো পাকিস্তানের শাসকদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে। ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় ট্রেনিং শেষে যোদ্ধারা কুরআন হাতে শপথ গ্রহণ করতেন। তারা মাঠে-ময়দানেও নামাজ আদায় করতেন। যুদ্ধের সাফল্যের জন্য দোয়া করতেন। মানুষের মধ্যে মুক্তির চিন্তাই প্রধান ছিলো। অন্যকিছু নয়।

মহিউদ্দিন আকবর দৃঢ়তা সঙ্গে বলেন, মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিলো পাকিস্তানের শাসকদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে। ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় ট্রেনিং শেষে যোদ্ধারা কুরআন হাতে শপথ গ্রহণ করতেন। তারা মাঠে-ময়দানেও নামাজ আদায় করতেন। যুদ্ধের সাফল্যের জন্য দোয়া করতেন। মানুষের মধ্যে মুক্তির চিন্তাই প্রধান ছিলো। অন্যকিছু নয়।

তাহলে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধর্মনিরপেক্ষতার কথা কোথা থেকে এলো? তিনি বিষয়টিকে এভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, ‘বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ধর্মীয় সম্প্রীতি যুগ যুগ ধরে বিদ্যমান। তারা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাসী ছিলো। যুদ্ধের পরে রাজনৈতিক নেতারা জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করলো ধর্মীয় সম্প্রীতিই ধর্মনিরপেক্ষতা।’ অর্থাৎ নেতারা বোঝাতো, ধর্মের নামে পাকিস্তান হয়েছিলো। তারা এতো অবিচার করলো। তাহলে আর ধর্ম রেখে লাভ কি? পাকিস্তানি নেতাদের দায় তারা ধর্মের উপর চাপিয়ে দিলো।

কবি মহিউদ্দিন আকবর এখন অসুস্থ। জীবনের শেষভাগে এসে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার প্রত্যাশা হলো মানুষের মাঝে সত্যিকার দেশপ্রেম জেগে উঠুক। সত্যিকার দেশপ্রেম না থাকলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এই দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে পারবে না, তাদেরকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যেও পৌঁছাতে পারবে না।

পূর্ববর্তি সংবাদসিরিয়ায় মসজিদে হামলা করেছে মার্কিন জোট
পরবর্তি সংবাদনাহিদকে সমর্থন দিয়ে সরে দাঁড়ালেন শমসের মবিন