বাধার মুখেও হাল ছাড়ছে না ঐক্যফ্রন্ট!

ইসলাম টাইমস অতিথি প্রতিবেদন : নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর বিএনপি ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার দাবিতে যেসব দাবি উত্থাপন করে আসছে তার অধিকাংশই সরকার প্রত্যাখান করেছে। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার, ইভিএম ব্যবহার বন্ধ এবং দ্রুততম সময়ে সেনাবাহিনী মোতায়েনসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মূল দাবিগুলোই উপেক্ষিত রয়ে গেছে। তারপরও জোটটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে এবং নির্বাচনের শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। চারদিকের খবর ও হাবভাবে মনে হচ্ছে, কিছুতেই হাল ছাড়তে চাচ্ছে না বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট। বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীদের ভাষ্যেও এমন মনোভাবের ইঙ্গিত পাওয়া গেল।

সম্প্রতি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, আমি মারা গেলেও আমার লাশ নির্বাচন কেন্দ্রে যাবে। এজাতীয় কথাই বলেছেন বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতা ও প্রার্থী। তাদের কথা থেকে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়। এক. তারা নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনায় প্রচণ্ড রকম বাধাগ্রস্থ হচ্ছেন, দুই. সব বাধা-বিপত্তির পরও তারা মাঠে থাকবেন।

নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার পর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ একাধিক বিরোধী দলীয় প্রার্থীর উপর হামলা, তাদের প্রচারণার কাজে বাধা, পোস্টার-হ্যান্ডবিল ছিনিয়ে নিয়ে তা আগুনে পুড়িয়ে ফেলার মতো ঘটনা স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এমনকি আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক বিএনপির নোয়াখালী অঞ্চলের এক প্রার্থীর উপর গুলি বর্ষণের অভিযোগও উঠেছে। উপর্যুপরি এসব হামলার কারণেই তারা ‘মৃত্যু পর্যন্ত নির্বাচনে থাকার’ মতো শব্দ উচ্চারণে বাধ্য হচ্ছেন বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

অন্যদিকে সরকারের এই মারমুখি ভূমিকা তার নৈতিক পরাজয় ও গণরায়ের মুখোমুখি হয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত একটি রূপই তুলে ধরছে বলে মনে করছেন বিরোধী জোটের সমর্থকরা। আর সেখান থেকেই ঐক্যফ্রন্টের নেতারা শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকার মানসিক শক্তিটুকু গ্রহণ করছে বলে মনে করছেন তারা।

চট্টগ্রামের বিএনপি কর্মী আবদুল খালেক বলেন, এবারের নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের একটি বিষয় দেশ-বিদেশে বিশেষভাবে প্রসংশিত হচ্ছে। তাহলো, তারা প্রশাসনের ‘পক্ষপাতমূলক’ আচরণের অভিযোগ আনলেও আইনি ব্যবস্থার প্রতি তারা শ্রদ্ধা প্রদর্শন করছে। প্রার্থী বাছাই শুরু হওয়ার থেকে এখন পর্যন্ত বিএনপির একাধিক প্রার্থী পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়েছেন। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে বহু প্রার্থী ও তাদের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। সাংবিধানিক ক্ষমতার বিচারে নির্বাচন কমিশন এসব হামলা-মামলার দায় এড়াতে পারেন না। কিন্তু বিএনপির অভিযোগেরও কেন্দ্রে রয়েছে নির্বাচন কমিশন। তবুও তারা পরম ধৈর্য্য ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছেই বারবার অভিযোগ নিয়ে যাচ্ছে। ফলাফল যা-ই হোক তারা তাদের আইনানুগ দায়িত্ব পালন করছে। তারা লেগে আছে।

ময়মনসিংহে ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী কর্মী তুষার মনে করেন, কূটনীতিকদের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার বিষয়টিতেও ঐক্যফ্রন্টের নেতারা পিছিয়ে নেই। তাদের সামনে সারা দেশের নির্বাচনী পরিবেশ তুলে ধরছেন তারা। ফলে ইতোমধ্যে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিলারসহ কয়েকজন কূটনীতিক বিরোধী দলীয় প্রার্থীদের গ্রেফতার, তাদের উপর হামলা ও প্রচার কাজে বাধা দানে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের সঙ্গে তারা কথাও বলছেন। ধৈর্য নিয়ে বিরোধী নেতাদের লড়ে যাওয়া কর্মীদের মনে সাহসের সঞ্চার করেছে।

দেশের রাজনৈতিক ইস্যুতে গণমাধ্যমের ভূমিকা এখন আর প্রশ্নাতীত নয়। একপেশে দৃষ্টিকোণ-ই এখানে প্রবল। বিশেষত ড. কামালের ‘খামোশ’ ইস্যুতে সাংবাদিক ‘উচ্চবাচ্যে’ অতি উৎসাহের গন্ধ পাচ্ছেন অনেকেই। তবুও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সাংবাদিকদের মুখোমুখি হচ্ছেন শান্তভাবে। তাদের সাথে নিয়মিত কথা বলছেন এবং দেশের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরছেন। অবশ্য এক্ষেত্রে কোনো কোনো গণমাধ্যম সহায়ক ভূমিকাও পালন করছে। গণমাধ্যমকে সহজভাবে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার এ প্রবণতাটি প্রভাবিত করেছে ঢাকা যাত্রাবাড়ির বিএনপি কর্মী মুরাদ হোসেনকে।

উপর্যুপরি হামলা, গ্রেফতার ও অন্যান্য প্রতিকূলতার মধ্যেও ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের নির্বাচনী সফর বন্ধ নেই। জেলায় জেলায় সফরও শুরু করেছেন তারা। আজ কুমিল্লায় একাধিক নির্বাচনী সভায় অংশ নিয়েছেন ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা। সেখানে নির্বাচনের শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেছেন।

আজ কুমিল্লার এক নির্বাচনী সভায় ভোট বিপ্লবের ডাক দিয়েছেন বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে ধানের শীষের প্রার্থীদের বিজয়ী করুন। একই সঙ্গে তিনি গণতন্ত্রের স্বার্থে সবাইকে ৩০ ডিসেম্বর ভোট দেওয়ার এবং কেন্দ্র পাহারা দেওয়ার আহবান জানান। অবশ্য নির্বাচনী আবহ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিএনপি ভোটকেন্দ্র পাহারা দেয়ার কথা বলছে।

নেতাদের মরণপন প্রচার ও সফরে উদ্দিপ্ত হচ্ছে কর্মী- সমর্থকরা। নীরবে সরবে ভোটের দিনের জন্য তারা প্রস্তুত হচ্ছে,কুমিল্লার মাশুক হাসান এমনটিই জানালেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্র পাহারা দেয়া এবং ভোটের ফলাফল ঘোষণার পূর্ব পর্যন্ত মাঠে থাকার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। তাদের বক্তব্য ও আচরণ থেকে এরকমটাই মনে হচ্ছে। যদিও বিষয়টি তাদের জন্য খুব সহজ হবে না।

দেশের বিভিন্ন জেলার ভোটার ও রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক জায়গায় ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের বাধার মুখে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্য প্রচারণায় আসতে না পারলেও তাদের প্রচারণার কাজ থেমে নেই। তারা নীরবে প্রচার কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন। ম্যান-টু-ম্যান প্রচারকেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে অনেক জায়গায়।

কুমিল্লা-১ আসনের বিএনপি প্রার্থী খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তার একনিষ্ঠ কর্মী হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, আমরা ঢাক-ঢোল পিটিয়ে প্রচার কাজ করতে পারছি না। তবে আমরা প্রত্যেকেই ব্যক্তিগতভাবে প্রচারটা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। একইভাবে নারী কর্মীরাও নারীদের কাছে ভোটপ্রার্থনা করছেন। বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে কিংবা মোবাইল ফোনে চাওয়া হচ্ছে ভোট।

একই চিত্র পাওয়া গেছে খুলনা-৩, পটুয়াখালি-২, চট্টগ্রাম-১৪ আসনের ঐক্যফ্রন্টের নেতা-কর্মীদের সাথে কথা বলে। কর্মীদের দাবি, শত বাধার মুখেও নেতৃবৃন্দ হাল ছাড়ছেন না এটাই তাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস যোগাচ্ছে এবং ভালো ফলাফলের ব্যাপারে প্রত্যাশা বাড়িয়ে তুলছে।

তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃবৃন্দের দৃঢ়তা এবং কর্মীদের উৎসাহ শেষ পর্যন্ত কী ফল নিয়ে আসবে তা এখনি বলা যাচ্ছে না।

পূর্ববর্তি সংবাদসতর্ক থাকতে হবে, কুচক্রিমহল যেন কোনো সুযোগ নিতে না পারে : ডিএমপি কমিশনার
পরবর্তি সংবাদপাহাড়ে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ভোট আদায় করা যাবে না : জেলা প্রশাসক