বৌদ্ধ পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে রাখাইনকে চূড়ান্তভাবে মুসলিম শূন্য করা হচ্ছে

ইসলাম টাইমস ডেস্ক: বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ধারাবাহিকভাবে সতর্ক করে আসছিল যে, রাখাইনে রোহিঙ্গা গ্রাম ধ্বংস করে বৌদ্ধ গ্রাম ও নিরাপত্তা বাহিনীর ঘাঁটি তৈরি করা হচ্ছে।

যদিও মিয়ানমার সরকারের দাবি ছিল, যেসব রোহিঙ্গা রাখাইনে ফিরবেন, তাদের জন্যই পুড়ে যাওয়া গ্রামগুলো সংস্কার করা হচ্ছে।

বুধবার ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী রিপোর্টে যা উঠে এসেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশংকাই অবশেষে বাস্তাবায়িত হচ্ছে।

গত এক বছর ধরে রাখাইনে চলা নির্মাণ কাজের স্যাটেলাইট চিত্র এবং মিয়ানমার সরকারের খসড়াকৃত ও অপ্রকাশিত একটি পুনর্বাসন মানচিত্র বিশ্লেষণ করে এ তথ্য প্রকাশ করেছে রয়টার্স।পাশাপাশি পুনর্বাসন নীতিমালার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ত্রাণকর্মী, বাংলাদেশের শিবিরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা এবং এখনও রাখাইনে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রয়টার্স সাংবাদিকরা। সব মিলিয়ে তাদের প্রতিবেদনে যা উঠে এসেছে, তা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি আর এএফপির প্রতিবেদনেরই বাস্তব রূপ।

চলতি বছরেই বার্তাসংস্থা এএফপি’র এক প্রতিবেদন থেকে জানা গিয়েছিল, বুলডোজারের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ছেড়ে আসা ঘরবাড়ি, মসজিদ- মাদরাসা মাটির সাথে মিশিয়ি দিয়ে রাখাইনে বৌদ্ধ গ্রাম নির্মাণ করা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে মুসলিম রোহিঙ্গাশূন্য রাখাইন গড়ে তোলার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

এবার রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এক সময়ের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইনে নির্মিত হয়েছে শত শত নতুন ঘর-বাড়ি। তাতে পুনর্বাসিত হচ্ছে হাজার হাজার বৌদ্ধ। রোহিঙ্গা গ্রামগুলো অবশেষে রূপান্তরিত হচ্ছে বৌদ্ধ অধ্যুষিত গ্রামে।
মিয়ানমার সরকার যে ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে, তাতে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সকল নতুন ঘর-বাড়ি তৈরি ও বৌদ্ধদের পুনর্বাসনে সহায়তা করছে মিয়ানমার সরকার।

এতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা। তারা ওই এলাকাকে বৌদ্ধ অধ্যুষিত এলাকায় পরিণত করতে চায়।

মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা পুনর্বাসন নিয়ে যে খসড়া মানচিত্র তৈরি করেছে তাতে দেখা যায়, রোহিঙ্গারা রাখাইনে তাদের মূল বাড়ি কিংবা গ্রামে ফিরে যেতে পারবে না। তাদেরকে দেশের অন্য মানুষদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিভিন্ন রোহিঙ্গা বসতি কেন্দ্রে রাখা হবে।

জাতিসংঘের এক অভ্যন্তরীণ নথিকে উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে, রাখাইনে এখনও দুই লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। তাদের অনেকের অভিযোগ, অবস্থা দিন দিন অসহনীয় হয়ে উঠছে।

খুব সম্প্রতি বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ২৪ জনেরও বেশি রোহিঙ্গা রয়টার্সকে জানায়, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী তাদেরকে হুমকি-ধামকি দিয়েছে ও মারধর করেছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় কারফিউ ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি থাকায় কাজ করা ও খাদ্য সংগ্রহ করা তাদের জন্যে কঠিন হয়ে পড়েছে।

মিয়ানমারে নিপীড়নের শিকার হওয়ার পর বাংলাদেশে কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন হুসাইন আহমদ। ‘ইনদিন’ গ্রামের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। তিনি স্যাটেলাইট চিত্র দেখে নিজের গ্রামকে শনাক্ত করতে পারছিলেন না।
রয়টার্সকে তিনি জানান, গ্রামটি পুরোপুরি অচেনা হয়ে পড়েছে। সব মুসলিম বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। বৌদ্ধ বাড়িগুলো আছে। তার বাড়ি কোথায় ছিল সে জায়গাটি স্যাটেলাইট চিত্রে খুঁজে বের করেন হুসাইন আহমদ। সে জায়গায় এখন দুই তলা বাড়ি নির্মিত হয়েছে।

রয়টার্সকে হুসাইন আহমদ বলেন, নিজের ভূমি ফিরে না পেলে প্রত্যাবাসিত হওয়ার প্রশ্ন আসে না।

‘এটা আমার গ্রাম ছিল। আমাদের সব বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনী আমাদের জমি দখল করেছে। আমার মনে হয় না তা আর ফেরত পাব।’ বলেন হুসাইন আহমদ।

কয়েক প্রজন্ম ধরে রাখাইনে বসবাস করে এলেও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব স্বীকার করে না মিয়ানমার। মিয়ানমারের অধিবাসী হলেও রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে বৌদ্ধরা বাংলাদেশ থেকে আগত অবৈধ অভিবাসী মনে করে। যুগ যুগ ধরে রোহিঙ্গা মুসলিমরা রাখাইনে থাকলেও মিয়ানমার তাদের নাগরিক বলে স্বীকার করে না।

৮২-তে প্রণীত নাগরিকত্ব আইনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাদের পরিচয়হীনতার কাল। এরপর কখনও মলিন হয়ে যাওয়া কোনো নিবন্ধনপত্র, কখনও নীলচে সবুজ রঙের রশিদ, কখনও ভোটার স্বীকৃতির হোয়াইট কার্ড, কখনও আবার ‘ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড’ কিংবা এনভিসি নামের রং-বেরঙের পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে।

এভাবে ধাপে ধাপে মুছে ফেলা হয়েছে তাদের পরিচয়। ধীরে ধীরে তাদের পরিণত করা হয়েছে রাষ্ট্রহীন নাগরিকে।
এবার বৌদ্ধ পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে রাখাইনকে চূড়ান্তভাবে মুসলিম শূন্য করা হচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স

পূর্ববর্তি সংবাদরামপালে সড়ক দুর্ঘটনা: আহত ২০, নিহত ৩
পরবর্তি সংবাদতালেবান-মার্কিন শান্তি আলোচনা সফলতার দিকে