এনাম হাসান ।।
চৌধুরী জাবেদ আতা পাকিস্তানে ফলের ব্যবসা করেন। একবছর আগে স্ত্রীর সাথে তার সর্বশেষ সাক্ষাত হয়েছিল। তার স্ত্রী জিনজিয়াংয়ের বাসিন্দা। আতা বছর খানেক আগে সস্ত্রীক জিনজিয়াং গিয়েছিলেন ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর জন্যে।
আতা বলেন, ‘সে (স্ত্রী) বলেছিল, পাসপোর্ট নবায়নের জন্যে যেই তুমি আমাকে রেখে যাবে,তারা আমাকে ক্যাম্পে নিয়ে যাবে। আমাকে আর আসতে দেবে না।’
এটি ২০১৭ সনের কথা। তখন তাদের বিয়ের চৌদ্দ বছর পার হয়েছিল।
আতা বলেন, তার মতো এমন দুই শ’র অধিক পাকিস্তানী ব্যবসায়ী রয়েছে, যাদের স্ত্রী উইঘুর মুসলিম এবং সরকার তাদের স্ত্রীদের গুম করে দিয়েছে।
সরকারের লোকেরা দাবি করছে,সরকার তাদেরকে একটি শিক্ষাকেন্দ্রে রেখেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বেইজিং প্রায় এক লাখ উইঘুর মুসলিমকে আটকে রেখেছে তাদের নতুনভাবে শিক্ষা ও দীক্ষা দেওয়ার জন্যে। এমন শিক্ষা যা তাদেরকে নিজেদের ধর্ম ত্যাগ করতে উৎসাহিত করবে। সে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সরকার ‘স্কুল’ বললেও সেগুলো স্কুল নয় কিছুতেই । সেগুলো মূলত শিক্ষালয়ের নামে কারাগার।
উইঘুর মুসলিমদেরকে দমন করার জন্যে এটা চীন সরকারের একটা নতুন পদ্ধতি। এভাবে চীন সরকার চায়, মুসলিম সংখ্যালঘুরা নিজেরাই দমন হয়ে যাক।
আতা বলেন-‘চীনের বিরুদ্ধে আগে মুসলিম দেশগুলো সোচ্চার হলেও এখন সবাই চুপটি মেরে আছে। তারা নিজেদের দেশে চীনের বিনিয়োগ বন্ধের আশংকায় দুর্দশাগ্রস্ত উইঘুর মুসলিম ভাইদের বিষয়ে কিছু বলে না।’
আতা কেবল তার স্ত্রীকেই হারাননি। তিনি তার দুই পুত্রকেও হারিয়েছেন। যাদের একজনের বয়স ৫,আরেকজনের বয়স ৭। তাদের পাসপোর্ট চীনা সরকার আটকে রেখেছে। তারা হয়তো এখন তাদের নানীবাড়িতে আছে, নয়তো আছে কোনো এতিমখানায়।
বিগত কয়েক মাস ধরে তিনি চীনে যাওয়া-আসা করছেন। কিন্তু প্রত্যেকবারই পরিবারের সন্ধান পাওয়ার আগেই তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। আর তাকে পাকিস্তান চলে আসতে হয়।
জিনজিয়াং-এর কোনো পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা এমনিতেই অনেক জটিল। সেখানকার পাকিস্তানী বন্ধুদের সাহায্যে যদি কিছুটা সম্ভব হয় কোনো পরিবারকে খুঁজে বের করা,কিন্তু রাজনৈতিক কড়াকড়ির কারণে জিনজিয়াংয়ের মানুষেরা সাধারণত বাইরের কারো সাথে কথা বলতেই চান না।
গত সপ্তাহে এক বন্ধুর মাধ্যমে তার শ্যালকের সাথে দেখা হয়ে যায়।
আতা বলেন, ‘ শ্যালকের কাছ থেকে জানতে পারেন, তার ছেলেরা ভাল আছে। তবে তার স্ত্রীর কোনো সংবাদ এখনো জানা যায়নি।’
চীনা সরকার নিয়মিত বলে যাচ্ছে, চীন সরকারের এ পলিসি কেবল জিনজিয়াং-এ শান্তি ও স্থিতি আনার জন্যেই। কিন্তু প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং -এর অভিযান যে কেবল জিনজিয়াংয়ের মুসলিমদের দমনের জন্যে, সে কথা এখন বিশ্বাবাসীর সামনে স্পষ্ট হয়ে গেছে।
সম্প্রতি পাকিস্তানের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বেইজিং গিয়ে জোরালো লবিং করেছেন গুম হয়ে যাওয়া স্ত্রীদের মুক্ত করে আনতে, কিন্তু তাতে কোনো ফল হয়নি।
তাদের কেউ কেউ বলেছেন, তারা চীনে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের সাথে কথা বলেছেন। তাদেরকে বলা হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে চীন সরকারের সাথে একান্তভাবে আলোচনা হয়েছিল।
একই ঘটনা ঘটেছে আমানের ক্ষেত্রেও। যিনি আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে চীনে গিয়েছিলেন কাজের সন্ধানে।
সেখানে তিনি মেহেরবান গুল নামে এক মেয়েকে বিয়ে করেন। এবং কঠোর পরিশ্রম করে একটি দোকান ক্রয় করেন। তাদের রয়েছে দুই মেয়ে। শাহনাজ (১৬), শাকিলা (১২)। দুই জনই এখন তাদের বাবার সাথে পাকিস্তানে থাকে।
গত বছর আমান প্রথম একাকী চীনে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু চীনা কতৃপক্ষ তাকে তার স্ত্রী ছাড়া চীনে প্রবেশ করতে বাধা দেয়।
তখন তিনি স্ত্রীকে নিয়ে জিনজিয়াং যান। সেখানে তার স্ত্রীকে প্রতিদিন কাজকর্মের বিবরণ দিতে হতো পুলিশকে। পুলিশ তাদেরকে কম্যুনিস্ট পার্টির বিভিন্ন পুস্তক সরবরাহ করত পড়ার জন্যে।
আমান বলেন, ‘তারা যদি উর্দূতে লেখা কোনো জিনিস দেখত, অথবা কোনো জায়নামায, বা ধর্মীয় কিছু দেখত, তাহলে সেটা নিয়ে যেত। তারা ইসলামের চিহ্নটুকুও মুছে ফেলেতে চায়।’
আমান ছয়মাসের ভিসা নিয়ে গিয়েছিলেন। কয়েক সপ্তাহ পর ভিসার মেয়াদ থাকতেই তাকে বলা হল দেশে চলে যাওয়ার জন্যে। তাকে আশ্বাস দিয়ে বলা হয়, আপনি এক মাস পর আবার আসুন।
একমাস পর তিনি যখন যান, তখন গিয়ে শুনেন তার স্ত্রী গুম হয়ে গেছে।
চার মাস পুলিশের পেছনে তিনি ঘুরেছেন। পুলিশ তাকে বিভিন্ন সময় মেরে ফেলার ভয় দেখিয়েছে, কিন্তু সে তো নাছোড়বান্দা।
চার মাস পর একদিন তাকে একটি পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়। এর কিছুক্ষণ পর সেখানে তার স্ত্রীকেও আনা হয়। এবং মাত্র এক ঘন্টা সময় দেওয়া হয় তাদের সাক্ষাতের জন্যে।
তারা পরস্পরকে দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন।
আমান বলেন, যখন এক ঘন্টা শেষ হল, পুলিশের পক্ষ থেকে আমাকে বলা হল, ‘তুমি পাকিস্তান চলে যাও। আমাদেরকে ভবিষ্যতে আর বিরক্ত করো না।
আমান এখন জানেন না, তার স্ত্রীকে কোথায় রাখা হয়েছে,ভবিষ্যতে তার কী হবে?
সূত্র: সাউথ চীনা মর্নিং পোস্ট
















