মিন্দানাওয়ে প্রতিষ্ঠা হচ্ছে মরো মুসলিমদের ইসলামি রাষ্ট্র ‘বাংসামরো’

রাষ্ট্রের দাবিতে মুখর মরো মুসলিমরা

ইসলাম টাইমস ডেস্ক : ২০১৯-এর জানুয়ারি থেকে বিশ্ব মানচিত্রে নতুন মুসলিম দেশ হিসেবে স্থান পাবে ‘বাংসামরো’। তবে পূর্ণ স্বাধীন দেশ নয়, ফিলিপাইনের স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পাবে বাংসামরো।

ফিলিপাইনের মিন্দানাও অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত ৯২ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত মুসলিম জনপদ বাংসামরো। মরো সংক্ষিপ্ত নামে পরিচিত নতুন দেশটির মোট জনসংখ্যা ২ কোটি ৫৬ লাখ। এ অঞ্চলের মুসলিমরা মরো মুসলিম নামে পরিচিত।

বাংসামরো পূর্ব এশিয়ার ফিলিস্তিন নামে সমধিক পরিচিত। লাখো মানুষ জীবনদানের মাধ্যমে দীর্ঘ ৫০ বছরের স্বাধীনতা আন্দোলন সংগ্রামে বিজয়ী হয়েছে মরো জাতি। মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল হওয়া বাংসামরো’র দিকে নজর দেয়নি ফিলিপাইন সরকার। যে কারণে বাংসামরো জনপদটি একেবারেই অনুন্নত।

সম্প্রতি ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট দুতার্তে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বাংসামরো’কে স্বায়ত্তশাসিত স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতির ঘোষণা দিয়েছেন। খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ বাংসামরো নতুন মুসলিম জনপদের প্রধান হচ্ছে ড. মুরাদ ইবরাহিম। তরুণদের নিয়ে গঠিত হবে দেশটির প্রতিরক্ষা বিভাগ।

বাংসামরো বা মরো জাতির জন্য প্রতিষ্ঠিত এই স্বায়ত্ত্বশাসিত অঞ্চলটি ম্যানিলার কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন স্বায়ত্ত্বশাসিত স্থানীয় সরকারের দ্বারা পরিচালিত হবে।

বাংসামোরোর সরকার নিজস্ব আইনসভা গঠন ও আইন তৈরির স্বাধীনতার সুযোগ ছাড়াও স্থানীয় রাজস্বের সিংহভাগ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের রাজস্বের একটি অংশ পাবে। এছাড়া এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের ভার তাদের উপরই ন্যস্ত থাকবে।

এছাড়া স্থানীয় সরকার এ অঞ্চলের বিচার কার্যক্রমে শরিয়া আইন চালু করার সুযোগও পাবে।

এর বিনিময়ে স্থানীয় স্বাধীকারপন্থী সশস্ত্র সংগঠন মরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্ট (এমআইএলএফ) তাদের সশস্ত্র সংগঠনকে ধীরে ধীরে নিরস্ত্র করার কথা বিলটিতে উল্লেখ করা হয়।

সংগঠনটির সহকারী প্রধান গাজালী জাফর বলেছেন, ‘এটি হয়তো নিখুঁত কোন আইন নয়, কিন্তু সূচনা হিসেবে এটি মন্দ নয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ, এখন আমরা আমাদের নিজস্ব সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারছি। আমরা আমাদের জনগণের জীবন উন্নত করার সুযোগ পাবো।’

ইতিহাসের হাত ধরে

‘মরো’ শব্দটি স্পেনীয় ‘মুর’ শব্দ থেকে আগত। স্পেনীয়রা মুসলমানদের ‘মুর’ হিসেবে সম্বোধন করতো। ফিলিপিনের স্থানীয় মুসলমানদেরও তারা সেই হিসেবে মুর নামে সম্বোধন করতো। সেখান থেকে স্থানীয় বিভিন্ন মুসলিম গোষ্ঠীকে একত্রে মরো জনগোষ্ঠী হিসেবে সম্বোধন করা হয়।

ষোড়শ শতাব্দীতে ফিলিপিনে স্পেনীয় উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার পর স্থানীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের দমন ও নির্যাতনের মাধ্যমে এ অঞ্চল থেকে মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করা হয়। ষোড়শ শতক থেকে উনাবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত স্পেনীয় ঔপনিবেশিক শাসনামলে তারা স্পেনীয় কায়দায় স্থানীয় অধিকাংশ জনগণকে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করে। এ সময় দক্ষিণের মিন্দানাও দ্বীপপুঞ্জের লোকেরা নিজেদের ধর্ম ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণে দীর্ঘ সংগ্রামে লিপ্ত হয়।

বিংশ শতাব্দীতে মার্কিন ঔপনিবেশিক শাসনামলেও এ অঞ্চলের লোকেরা মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিজেদের যুক্ত করে।

দীর্ঘ সংগ্রামের ফলাফল হিসেবে একদিকে তারা যেমন সর্বাগ্রাসী আগ্রাসনের প্রভাব থেকে নিজেদের এবং নিজেদের ধর্ম, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হয়, অন্যদিকে তারা ফিলিপিনের মধ্যে সবচেয়ে নিগৃহীত জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়।

মিন্দানাওয়ের মরো মুসলিম অধ্যুষিত প্রদেশগুলো ফিলিপিনের মধ্যকার সবচেয়ে দরিদ্রকবলিত প্রদেশ।

অসংখ্য দ্বীপ নিয়ে গঠিত নতুন বাংসামরো রাষ্ট্র

১৯৭০ সালে মরো জাতীয়তাবাদী নেতা নূর মিসৌরির নেতৃত্বে মরো ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (এমএনএলএফ)  মিন্দানাওয়ে মরো জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে সংগ্রামের সূচনা করে।

১৯৭৬ সালে যখন সংগঠনটি তাদের স্বাধীনতার দাবি থেকে সরে এসে স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবিতে নিজেদের অবস্থান ব্যক্ত করে, তখন সংগঠনটির কিছু সদস্য দলত্যাগ করে স্বাধীনতার দাবিতে নতুন সংগঠন মরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্ট (এমআইএলএফ) প্রতিষ্ঠা করে।

১৯৯৬ সালে এমআইএলএফ প্রথম ফিলিপিনো সরকারের সাথে শান্তি আলোচনা শুরু করে। কিন্তু ১৯৯৯ সালে প্রেসিডেন্ট যোসেফ এসত্রাদার সময়ে তার সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণার প্রেক্ষিতে শান্তি আলোচনা ভেঙে যায়। ২০০১ সালে প্রেসিডেন্ট গ্লোরিয়া এরোইয়ো’র শাসনামলে শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু হয়।

২০১২ সালে প্রেসিডেন্ট বেনিগনো অ্যাকুইনোর সাথে এমআইএলএফ’র একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের মার্চে পূর্ণাঙ্গ আকারে এমআইএলএফ’র সাথে পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

২০১৫ সালের জানুয়ারিতে ফিলিপিনো কংগ্রেসে মিন্দানাওয়ের স্বায়ত্বশাসনের লক্ষ্যে ‘বাংসামরো বেসিক ল’র খসরা প্রস্তুত করা হয়। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট দুতার্তে ক্ষমতাগ্রহণের পর এ অঞ্চলে দ্রুত স্বায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। গত ২৩ জুলাই জাতির প্রতি তার বার্ষিক ভাষণের সাথে সাথে তিনি বাংসামরো স্বায়ত্বশাসনের বিলটিতে স্বাক্ষরের পরিকল্পনা করেছিলেন।

সেই ঘোষণারই বাস্তবায়ন হলো ডিসেম্বরে। এখন অপেক্ষার পালা আগামী জানুয়ারি মাসে পূর্ণ স্বায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠার দিকে।

পূর্ববর্তি সংবাদইসরাইলি সেনাদের গুলিতে ৩ ফিলিস্তিনি নিহত
পরবর্তি সংবাদচেক প্রজাতন্ত্রের কয়লা খনি বিস্ফোরণে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩