ভোটের জন্য অর্থ নেওয়ার বক্তব্য এবং কিছু কথা

আবুন নূর ।। 

২০ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকার সুধাসদনে বসে নড়াইলের নির্বাচনী জনসভায় শ্রোতাদের উদ্দেশে ভিডিও কনফারেন্সে বক্তব্য দেন। সে বক্তব্যের একটি উক্তি কোনো কোনো গণমাধ্যমের শিরোনামে চলে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর সে উক্তিটি হলো- ‘বিএনপি-জামাতের কাছ থেকে অর্থ নিন আর নৌকা মার্কায় ভোট দিন। আর এটাই এখনকার স্লোগান।’

প্রধানমন্ত্রী ওই বক্তব্যে বিএনপি সরকারের দুর্নীতি লুটপাটের বিভিন্ন প্রসঙ্গ তুলে ধরে এই উক্তিটি করেছেন। একপর্যায়ে তিনি বলেছেন, লুটপাটের ওই অবৈধ টাকাই এখন তারা নির্বাচনে ব্যয় করছে। সুতরাং আপনাদেরকে ওই টাকা-পয়সা দিলে আপনারা নিন, কিন্তু ভোটটা দিন নৌকা মার্কায়।

একদিক থেকে দেখলে এটি ছিল নির্বাচনী একটি বক্তব্য, বিরোধী পক্ষকে ঘায়েল করে নিজেদের পক্ষে ভোটারদের আকর্ষণ করার কৌশলটাই এ জাতীয় বক্তব্যে থাকে মুখ্য। প্রধানমন্ত্রী হয়তো সেটাই করেছেন। কিন্তু অপরদিক থেকে এই উক্তিটি নিয়ে অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তারা মনে করেন, নির্বাচনের আগে ভোট দেওয়ার জন্য টাকা গ্রহণের কথা রাষ্ট্র বা সরকারের এত উঁচু অবস্থান থেকে কেউ বললে সেই বক্তব্যের নৈতিকতার জায়গাটা কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে যায়!

হয়তো কথাটা তিনি রসিকতা করে বলেছেন। হয়তো নির্বাচনী মাঠের সাধারণ প্রতিযোগিতার উপযোগী শব্দবাক্য হিসেবেই বাক্যটি উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু এর মাধ্যমে ভোটের জন্য ঘুষ বা উৎকোচ গ্রহণের প্রতি একটি সমর্থনের ধ্বনি তো উচ্চারিত হয়ে গেল। সেটাও হলো রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ স্তর থেকে এবং প্রকাশ্য জনসভায়। যার খবর ভিডিও ও প্রিন্ট মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। অর্থ গ্রহণের কথা এমন করে তিনি না বললেও তো পারতেন। এমনিতেই প্রশাসনের নানান স্তরে ঘুষ, দুর্নীতি ব্যাপক ও প্রকাশ্য পর্যায়ে চলে গেছে। ভোটারদের মধ্যেও এ নিয়ে বিস্তর ক্ষোভ জমে আছে। সে পরিস্থিতিতেই ভোটারদের খেতাব করে ভোটের জন্য টাকা নেওয়ার কথা বলার একটা পরোক্ষ অর্থ দাঁড়ায়- ভোটের জন্যও ঘুষ গ্রহণ করা যায়।

দ্বিতীয় আরেকটি ব্যাপার হলো, ওদের কাছ থেকে অর্থ নিন, কিন্তু ভোট দিন নৌকা মার্কায়- এ কথার একটি অর্থ দাঁড়িয়ে যায়, কপটতার জন্য দরজা উন্মুক্ত করার অনুমতি দেওয়া। ভোটের জন্য টাকাপয়সা লেনদেন তো একটি অন্যায়। সেই অবৈধ টাকা গ্রহণের সময় প্রতিশ্রুতি দিয়ে আবার সেটা ভাংতে উৎসাহিত করা প্রকারান্তরে প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেটা আবার ভেঙ্গে ফেলার মতো হয়ে যায়। কথাগুলো ভোটের মাঠের কথা হলেও, অনেক উঁচু পর্যায় থেকে বলা। এ রকম কথার খবর প্রচার না হলেই তো ভালো। বিনয়ের সাথেই আমরা বলতে পারি, দেশ ও রাষ্ট্রের বড়দের বক্তব্য থেকে ভুল উপলব্ধি গ্রহণের সুযোগ না দেওয়াই উচিত।

প্রধানমন্ত্রী আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী একটি পক্ষের প্রধান। কিন্তু তিনি বর্তমানে দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও। প্রতিদ্বন্দ্বিতা যখন অনৈতিকতা ও হানাহানির দিকে যায়- তখন সেই অবক্ষয়ের রাশ টেনে ধরার মূল দায়িত্বটাও তারই। সামনেই নির্বাচন। আর সাতটি দিনও বাকি নেই। দেশের প্রধান অভিভাবক শুধু নন, কোনো দলের কোনো প্রধানের কাছ থেকেই দুষ্ট লোকের পক্ষে অনৈতিকতায় উৎসাহ পাওয়ার মতো কোনো বক্তব্য না আসাটাই তো সবার প্রত্যাশা।

পূর্ববর্তি সংবাদচেম্বার আদালতেও প্রার্থিতা ফিরে পেলো না বিএনপির ৭ নেতা
পরবর্তি সংবাদচাঁপাইনবাবগঞ্জে নৌকার নির্বাচনী অফিসে হামলার সময় ২ আ.লীগ কর্মী আটক