মুকিম আহমাদ ।। মালয়েশিয়া থেকে
সামাজিক এবং ব্যক্তিজীবনে ধর্মের অনুসরণ আর অনুকরণে মালয়েশিয়া হতে চলেছে মুসলিম দেশগুলোর জন্য অনন্য উপমা। অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি তাদের ধর্মীয় বোধ ও উপলব্ধিরও যেন বিপ্লব ঘটে চলেছে। বিশ্লেষকগণ মনে করেন, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির এই পরিবর্তনের নেপথ্যে মালয়েশিয়ার মাদরাসাগুলোর অবদানই সবচে বেশি।
মালয়েশিয়াতে বিভিন্ন নেসাবের মাদরাসা থাকলেও সামাজিক অবস্থানে প্রায় সবগুলোই সমপর্যায়ের । রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন থাকায় ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অনাগ্রহ বা হীনমন্যতা নেই এবং প্রবাসী শিক্ষকরাও সরাসরি ধর্মীয়-শিক্ষক হিসেবেই ভিসা পেয়ে থাকেন। ফলে, মালয়েশিয়াতে অন্যান্য পেশায় যেমন প্রবাসী বাংলাদেশিরা কাজ করে যাচ্ছেন, তেমনি প্রবাসী হাফেজ-আলেমগণও বিভিন্ন নেসাবের মাদরাসাগুলোতে অত্যন্ত সুনামের সাথে শিক্ষক হিসেবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
কিছু কিছু মাদরাসা আন্তর্জাতিক মানের হওয়াতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসে। উল্লেখযোগ্য দেশগুলো হলো কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, চীন, কাজাখস্তান, ফিলিপাইন এবং আফ্রিকা অঞ্চলের বেশকিছু দেশ ।
মালয়শিয়ায় বাংলাদেশি আলেমগণ পনেরো বছরেরও অধিক সময় ধরে দ্বীনি মাদরাসাগুলোতে শিক্ষাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। সাধারণত বাংলাদেশি হাফেজগণও হিফজ মাদরাসাগুলোতে শিক্ষাসেবা দিয়ে থাকেন। হিফজে বাংলাদেশি হাফেজদের বিশ্বব্যাপী সাফল্য মালয়েশিয়ানদেরও অজানা নয়। তাছাড়াও দায়িত্বশীলতা, নিষ্ঠা এবং হিফজ করানোর কলা-কৌশলের কারণে দেশটির মাদরাসাগুলোতে অন্য যে কোন দেশের চেয়ে বাংলাদেশি হাফেজদের রয়েছে বিশেষ চাহিদা ও সম্মান।
তাছাড়া আলিম ক্লাস (কিতাবখানা) মাদরাসাগুলোতেও বাংলাদেশি আলেমগণ সুনাম ও সম্মানের সাথে দরস প্রদান করে যাচ্ছেন। সরকারি স্বীকৃত ডিপ্লোমা পর্যায়ের মাদরাসাগুলোতেও (STAM) যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন দেশের আলেমগণ । ধারণা করা হয়, সরকারি নিবন্ধিত নয়শত তাহফিজ মাদরাসায় প্রায় চারশ বাংলাদেশি শিক্ষকতা করছেন ।
মালয়েশিয়ায় চাকরি পাওয়ার জন্য প্রবাসী শিক্ষকদের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। এছাড়া প্রতিবছর ভিসা নবায়নের পূর্বেও সংশ্লিষ্ট বিভাগে নতুন করে মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। শিক্ষকগণ যে বিষয়ে পাঠদান করেন সে বিষয়ের নিজ নিজ দেশের মন্ত্রণালয় কর্তৃক সত্যায়িত সার্টিফিকেট প্রদান বাধ্যতামূলক। তবে কিছু কিছু প্রদেশে সত্যায়নের ব্যাপারে শিথিলতাও আছে।
সাধারণত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষকদের পরিবার নিয়ে থাকার সুযোগ দেয়। অনেক প্রতিষ্ঠান নিজস্ব কোয়াটারে ফ্রি আবাসনের ব্যবস্থার পাশাপাশি পরিবারের জন্য তিনবেলা খাবারও সরবরাহ করে থাকে। কিছু মাদরাসা পরিবারের জন্য বাসা ভাড়া মাসিক বেতনের সাথে যুক্ত করে দেয়। ফলে অনেক প্রবাসী শিক্ষকই পরিবার নিয়ে থাকছেন।
তবে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ধর্মীয় শিক্ষকদের পরিবার নিয়ে থাকার ডিপেন্ডিং–ভিসা বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এই বিষয়ে মাদরাসাগুলোর অভিভাবকতুল্য সংগঠন PITAS এর একজন দায়িত্বশীল জানান, খুব শিগগিরই আবার সেই সুযোগ চালু করা হবে। তারা ইমিগ্রেশন প্রধানের সঙ্গে দেখা করে এমন আশ্বাস দেন।
সরাসরি মসজিদগুলোতে এখনও তেমন বড় পরিসরে ইমামতের সুযোগ আসেনি বাংলাদেশি আলেমদের জন্য। তবে সম্প্রতি সেলাঙ্গর প্রদেশের ২য় বৃহত্তম মসজিদ কাজাঙ শহরের ‘মাসজিদ আল-ফালাহ’তে ‘ইমাম তিগা’ বা তৃতীয় ইমাম হিসেবে অফিসিয়াল নিয়োগ পান বাংলাদেশের হাফেজ মাওলানা মুনাজ মুহিব্বুল্লাহ । আবার অনেকে শুধু রমজানে বড় বড় মসজিদগুলোতে তারাবি পড়ানোর সুযোগ পান । তবে অনেক ‘সুরাউ’তে (পাঞ্জেগানা মসজিদ) বাংলাদেশি ইমাম সাহেবগণ নামাজ পড়িয়ে থাকেন ।
হাফেজ মাওলানা হুযাইফা বাংলাদেশি একজন নবীন আলেম। এক বছর যাবত শ্রীপেতালিঙ মারকাজ সংলগ্ন দারুল উলূম আল ইসলামিয়্যাতে তিরমিজি শরিফের দরস দিচ্ছেন। তেমনি হাফেজ মাওলানা আইনুল হক দীর্ঘদিন যাবত মাদরাসা দারুস সালামে হিফজ বিভাগ পরিচালনা করে আসছেন। শত শত মালায়ী এবং ভিনদেশি হাফেজের উস্তাদ তিনি। বাংলাদেশি মুফতি আব্দুস সালাম পাহাঙ প্রদেশে একটি পরিচিত নাম। তাঁর তত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে পুরুষ/মহিলা দুটি মাদরাসা।
এমন আরও অনেকেই বিভিন্ন স্থানে পরোক্ষভাবে মালায়ীদের সহযোগিতায় মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে পরিচালনা করছেন । তবে কেলান্তান, সেলাঙ্গর এবং কেডাহ প্রদেশেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি মাদরাসা শিক্ষকগণ শিক্ষকতা করছেন ।
মাদরাসাগুলোতে নানারকম সুযোগ-সুবিধা সত্বেও ধর্মমন্ত্রণালয় JAKIM-এর একজন ভিসা নবা্য়ন-বিষয়ক কর্মকর্তা জানান, অনেক মাদরাসা থেকে প্রবাসী শিক্ষকগণ সময়মত বেতন না পাওয়ার অভিযোগ নিয়ে আসছেন এবং বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির কথা থাকলেও তিন-চার বছরেও বেতন বৃদ্ধি করা হচ্ছে না। এই বিষয়ে ইমিগ্রেশন থেকে মাদরাসাগুলোকে সতর্কও করা হচ্ছে । কারণ এখন পর্যন্ত দেশটি ধর্মীয়গুরুদের যথেষ্ট সম্মান দিয়ে থাকে।
















