আবরার আবদুল্লাহ ।।
১ ডিসেম্বর টঙ্গীর ইজতেমার মাঠে সাধারণ তাবলিগি সাথী, উলামায়ে কেরাম ও মাদরাসা শিক্ষার্থীদের উপর সাদপন্থীদের সন্ত্রাসী হামলা দেশের সর্বশ্রেণির মানুষের চোখ খুলে দেয়। এই হামলার পর সাদপন্থীদের প্রকৃত চেহারা জাতির সামনে উন্মোচিত হয় বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।
তারা বলেন, হামলার সময় তাদের হিংস্রতা ও বর্বরতার যে চিত্র মানুষের সামনে ফুটে উঠেছে তাতে মানুষ তাদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। মাওলানা সাদের অনেক অনুসারী তওবা করে ফিরে আসছেন সঠিক পথে। টঙ্গীর মাঠে হামলার পর স্বপ্রণোদিত হয়ে দেশের বহু মসজিদে সাদপন্থীদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে মসজিদ কমিটি। ফলে দিন দিন কোনঠাসা হয়ে পড়ছে তারা।
এই প্রতিকূলতার মধ্যে বাংলাদেশে কীভাবে কাজ করছেন মাওলানা সাদের অনুসারীরা – তা জানতে কথা বলেছিলাম সাদপন্থীদের নেতা তাওহিদুল হকসহ কয়েকজন তাবলিগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে।
ইসলাম টাইমসের অনুসন্ধানে জানা গেছে, মসজিদভিত্তিক কাজের তাবলিগের প্রচলিত ধারার পরিবর্তে সাদপন্থীরা এখন ভিন্ন কৌশলে তাদের কাজের প্রসার ঘটানোর চেষ্টা করছে। তাদের কৌশলের মধ্যে রয়েছে বেতনভূক্ত মুবাল্লিগ নিয়োগ, মসজিদের পরিবর্তে বাসা-বাড়িতে দাওয়াতি কাজ, ম্যান-টু-ম্যান দাওয়াত, ক্ষমতাসীনদের দৃষ্টি আকর্ষণ ও বিপরীতপক্ষের লোকদের হুমকি-ধমকি ও প্রলোভন দেখানো ইত্যাদি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উত্তরার এক তাবলিগি সাথী বলেন, টঙ্গীর মাঠে হামলার পর উত্তরার মসজিদগুলোয় সাদপন্থীদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। মসজিদ কমিটি ও সাধারণ মানুষ তাদের প্রত্যাখ্যান করে। এখন তারা ১২, ১৩ ও ৫ নং সেক্টরের কয়েকটি বাসায় তালিম, তাশকিল ও মাশওয়ারার কাজ করছে। আম গাশতের (সাধারণভাবে দাওয়াতের জন্য বের হওয়া) চেয়ে খুসুসি গাশতের উপর (ব্যক্তিগতভাবে দাওয়াত দেওয়া) জোর দিচ্ছে।
তিনি আরও জানান, পার্শ্ববর্তী এলাকায় একটি ফ্যাক্টরিতে সাদপন্থীরা নিয়মিত নামাজ আদায় ও নামাজের পরের আমলগুলো করছে।
মুগদা এলাকার তাবলিগি সাথী রেজাউল করীম দেন অন্য তথ্য। তার এলাকায় হোসাইন আহমদ নামের এক বেকারি কর্মী তাবলিগের কাজ করতেন। কিছুদিন আগে হোসাইন চাকরি ছেড়ে দেন এবং এলাকায়ও তাকে দেখা যাচ্ছিল না। কয়েকদিন পর এলাকায় এলে তার সাথে কথা বলে জানা যায়, সময় দেয়ার শর্তে সাদপন্থীরা তার ও তার পরিবারের দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছে।
সাদপন্থীরা শুধু সাধারণ মানুষকে অর্থের প্রলোভন দেখাচ্ছে না; বরং আলেমদেরও অর্থের প্রলোভন দেখানোর চেষ্টা করছে। সাভার রেডিও কলোনি এলাকার ইমাম হাফেজ মাওলানা যাকারিয়া এমন প্রলোভনের মুখোমুখি হয়েছিলেন বলে জানান। তিনি ইসলাম টাইমসকে বলেন, ‘কয়েকদিন আগে সাদপন্থী একজন ব্যবসায়ী তাকে বিনা খরচে ভারতের নিজামুদ্দিন সফরের প্রস্তাব দেন। তিনি আমাকে বলেন, হুজুর আপনি শুধু নিজামুদ্দিন গিয়ে দেখে আসবেন। এরপর আপনাকে আমরা আরও দেশ সফর করাবো। আপনার পরিবারের দেখভালের দায়িত্বও আমাদের।
আর যেখানে অর্থের প্রলোভন কাজ করছে না সেখানে তারা বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি দিয়ে কাজ আদায়ের চেষ্টা করছে। বিশেষত সাধারণ সাথীদের মধ্যে যারা আলেমদের নেতৃত্বে তাবলিগের কাজে সক্রিয় তাদেরকে টার্গেটে পরিণত করা হচ্ছে। যেমন, উত্তরা এলাকার এক সাথীর হোয়াটসঅ্যাপে একটি ‘হিটলিস্ট’ পাঠানো হয়। যেখানে তার নাম রয়েছে দ্বিতীয় নম্বরে।
তবে সাদপন্থীরা সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করছে মাদরাসা-মসজিদের কমিটিতে থাকা প্রভাবশালী সদস্য এবং এলাকার রাজনৈতিক নেতাদের কলে-কৌশলে তাদের দলভূক্ত করার। যেন তাদের হয়ে কাজটি অন্যরা করে দেয়। সম্প্রতি ঢাকার দক্ষিণখানের চেয়ারম্যান এস.এম. তোফাজ্জল হোসাইনকে তারা এভাবেই বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিলো।
সাদপন্থীদের এসব তৎপরতা তুলে ধরলে তাবলিগ জামাতের অন্যতম সাথী ও ভিক্টোরিয়া পার্ক মসজিদের খতিব মাওলানা আমানুল হক বলেন, আমরা তাদের এসব তৎপরতায় চিন্তিত নই। তাবলিগের কাজ তার নিজস্ব ধারায়, নিজস্ব গতিতে চলবে। তারা এসব পথ অবলম্বন করার অর্থ হলো তারা নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কিত। অস্তিত্ব রক্ষা করতের তারা বৈধ ও অবৈধ সব পথ অবলম্বন করছে। ইনশাআল্লাহ, তাবলিগের কাজ আল্লাহর রহমত ও নুসরতে এবং উলামায়ে কেরামের নেতৃত্বে এগিয়ে যাবে।
















