আন্তর্জাতিক মহল যেভাবে দেখছে বাংলাদেশের নির্বাচন

ইসলাম টাইমস ডেস্ক : ১০ বছর পর বাংলাদেশে এই প্রথম একটি নির্বাচন হচ্ছে যাতে অংশ নিচ্ছে দেশটির সব প্রধান রাজনৈতিক দল। কিন্তু এই নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কৌতূহল যেন এবার তুলনামূলকভাবে কম। বিভিন্ন দেশের নামকরা সংবাদপত্র বা সাময়িকীগুলোতে এবারের এই নির্বাচন নিয়ে খুব কমই প্রতিবেদন বেরিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা অন্যান্য প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশগুলোকে বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে অতীতে যেরকম তৎপর ভূমিকায় দেখা গেছে, এবারে সেখানে দৃশ্যমান তৎপরতা বলতে গেলে অনেক কম। বাংলাদেশের এই নির্বাচনকে কীভাবে দেখছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়? বিভিন্ন প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ, পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিক্রিয়া সংকলন এখানে তুলে ধরা হলো-

দ্য মিন্ট, ভারত

লন্ডনভিত্তিক লেখক সলিল ত্রিপাঠির একটি বিশ্লেষণ ছেপেছে ভারতের বিজনেস ওয়েবসাইট দ্য মিন্ট। এতে সলিল ত্রিপাঠি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশি গল্পগাঁথায় শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ নাকি আলোর পথের শক্তি, তারা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের দল আর তাদের বিরোধীরা নাকি অন্ধকারের শক্তি। কিন্তু বাস্তবে আজকের আওয়ামী লীগের সঙ্গে স্বাধীনতাপূর্ব কালের আওয়ামী লীগের মিল খুব সামান্য এবং আওয়ামী লীগ এখন কার্যত দেখতে অনেকটা ১৯৭৫ সালের শুরুর দিকের বাকশালের চেহারা নিয়েছে। যখন কি না একদলীয় রাষ্ট্র কায়েমের মাধ্যমে সংবাদপত্র বন্ধ করা হয়েছিল, অন্যান্য দল নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং আওয়ামী লীগ হয়ে উঠেছিল উচ্ছৃঙ্খল তরুণদের পেশিশক্তি নির্ভর একটি দল।’

দ্য স্ক্রল, ভারত

ফাহাম আবদুস সালাম নামে একজন বিশ্লেষক ভারতীয় এই নিউজ ওয়েবসাইটে প্রশ্ন তুলেছেন, বাংলাদেশে যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে সেটি একটি ‘ম্যানেজড ইলেকশন’’ হতে যাচ্ছে কি না।

‘বাংলাদেশে সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী গত সেপ্টেম্বরে লিখেছিলেন, ‘যদি অবাধ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়, তাহলে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ পরবর্তী পার্লামেন্টে লজ্জাজনকভাবে একটি সংখ্যালঘু দলে পরিণত হতে পারে। এই অনুমান মোটেই বিস্ময়কর নয়, কারণ বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ নেতারাও নিজেদের সমর্থকদের কাছে এরকম আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছেন। এ থেকে যেটা বোঝা যায়, তা হলো- বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক মতের লোকজনই মোটামুটি একমত যে একটা ‘ম্যানেজড ইলেকশন’ ছাড়া আওয়ামী লীগের পক্ষে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জেতা অসম্ভব। আর এ ধরনের একটা ‘ম্যানেজড ইলেকশন’, যেটাই সম্ভবত ঘটতে যাচ্ছে, তা ভারতের সহযোগিতা ছাড়া ‘ম্যানেজ’ করা সম্ভব নয়।’

দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট, ব্রিটেন

কয়েকদিন আগে ব্রিটেনের ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকায় বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এশিয়া এডিটর এডাম উইথনালের লেখা এই প্রতিবেদনের শিরোনামে বলা হচ্ছে, ‘বিরোধী দলের কর্মীদের জন্য এক ধরনের ভয়ের পরিবেশের মধ্যে বাংলাদেশের এই নির্বাচন হতে যাচ্ছে।’

এতে বলা হয়, গত এক দশক ধরে আওয়ামী লীগ ক্রমশ কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনের দিকে ঝুঁকেছে এবং কঠোরভাবে বিরোধীদের দমন করেছে।

চ্যাথাম হাউজের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. গারেথ প্রাইসকে উদ্ধৃত করে ইন্ডিপেনডেন্ট লিখেছে, তিনি মনে করেন, যদি শেখ হাসিনা ভোটে জেতেন, যেটি প্রত্যাশা করা হচ্ছে, তাহলে নিশ্চিতভাবেই সেখানে কিছু বিক্ষোভ হবে এবং সেগুলো দমন করা হবে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ভারত

ভারতীয় সাংবাদিক মানস ঘোষ ‘ব্যাটল ফর বাংলাদেশ’ শিরোনামে লেখায় বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার এসব কর্মসূচির ইতিবাচক প্রভাবই পড়া উচিত নির্বাচনে, কিন্তু ‘এন্টি ইনকামবেন্সি’, অর্থাৎ ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে অসন্তোষ, বিশেষ করে তার দলের মন্ত্রী-এমপিদের দুর্নীতি তার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

নিকেই এশিয়ান রিভিউ, জাপান

নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি কভারেজ দিয়েছে জাপানের একটি সাময়িকী ‘নিকেই এশিয়ান রিভিউ।’ তাদের গত সপ্তাহের প্রচ্ছদ কাহিনিই ছিল বাংলাদেশকে নিয়ে, যার শিরোনাম ‘দ্যা রাইজ অ্যান্ড রাইজ অব বাংলাদেশ।’

এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে গণবিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়ছে। শেখ হাসিনার বিরোধীরা অভিযোগ করছেন, যেভাবে কঠোর হাতে তিনি ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছেন, তা নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে দেবে না। প্রতিদিন বিরোধী সমর্থকদের যেভাবে ধরপাকড় করা হচ্ছে এবং তাদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে তাতে মনে হয় সরকারি দল তার রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যবহার করছে।’

‘পরপর পাঁচ বছরের দুটি মেয়াদের পর এখন কিছু ভোটারের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।’

 

যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট

নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার যে ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে হতাশা প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত ২১ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের একজন মুখপাত্র এ নিয়ে একটি বিবৃতি দেন।

তাতে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউটের (এনডিআই) মাধ্যমে বাংলাদেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য একটি সংস্থাকে তহবিল দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার ভিসা এবং অন্যান্য সহযোগিতা না দেয়ায় এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশন্স (আনফ্রেল) নামের এই সংস্থাটি তাদের পর্যবেক্ষণ মিশন বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে।

এই মুখপাত্র তার বিবৃতিতে আরও বলেছেন, ‘যে কোনও গণতান্ত্রিক নির্বাচনের আগে শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশ এবং সমবেত হওয়ার অধিকার থাকতে হবে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে তাদের কাজ করতে দিতে হবে এবং কোনও ধরনের সহিংসতা, হয়রানি এবং ভয়ভীতির হুমকি ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে সবাইকে। আমরা বাংলাদেশ সরকারকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি তাদের অঙ্গীকার রক্ষায় উৎসাহিত করছি, যাতে করে বাংলাদেশের সব মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে ৩০ ডিসেম্বররের নির্বাচনে অংশ নিয়ে তাদের মতপ্রকাশ করতে পারেন।’

ব্রিটেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন

ব্রিটেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের নির্বাচন প্রশ্নে অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের মতোই অবস্থান নিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশে কোনও নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল পাঠাচ্ছে না। তবে এই নির্বাচন যাতে একটি সত্যিকারের বিশ্বাসযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক এবং স্বচ্ছ হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য তারা বাংলাদেশের সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে একজন এমপির প্রশ্নের উত্তরে ব্রিটেনের ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসের একজন জুনিয়র মন্ত্রী মার্ক ফিল্ড বলেছিলেন, বাংলাদেশে তারা একটি অবাধ, নিরপেক্ষ এবং বহুদলীয় নির্বাচন দেখতে চান। ব্রিটেনের বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তা দফতর ইউকেএইড কিছু বেসরকারি সংস্থাকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য সহায়তাও দিচ্ছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে সবপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যে, নির্বাচন যেন শান্তিপূর্ণ, বিশ্বাসযোগ্য এবং সবার অংশগ্রহণে হয়, তা নিশ্চিত করতে।

‘নারী সমাজসহ সব বাংলাদেশি নাগরিক যেন নিরাপদে এবং নিশ্চিন্তে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। নাগরিক সমাজ এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের তাদের ভূমিকা পালনে যেন পূর্ণ সমর্থন দেয়া হয়।’

মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই বিবৃতিতে একটি শান্তিপূর্ণ এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রতি তার সমর্থন পুর্নব্যক্ত করেছেন।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

পূর্ববর্তি সংবাদরাজধানীতে সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট
পরবর্তি সংবাদসরকারদলীয় লোকজন বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছে : ইসলামী আন্দোলন