বিএনপি কি নীতি থেকে সরে যাচ্ছে?

আবরার আবদুল্লাহ ।।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী বামধারার রাজনীতিকদের সাথে বিএনপির জোট গঠনে বিস্মিত হয়েছিল দেশের অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। নীতি ও আদর্শের দূরত্ব ঘুচিয়ে এই জোট কতোটা ‍যুথবদ্ধ হতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহও প্রকাশ করেন অনেকে। অন্যদিকে প্রশ্ন ওঠে রাজনীতির অভিন্ন পথে চলতে গিয়ে নূন্যতম আদর্শিক যে ছাড়টুকু দেওয়া প্রয়োজন তা কারা দেবে? ইসলামি মূল্যবোধের সঙ্গে থাকা বিএনপি, না ধর্মনিরপেক্ষতার ধারক বামঘেঁষা নেতারা?

বিএনপি ও বাম রাজনীতিকদের এই জোট গঠনের শুরু থেকে বাম রাজনীতিকরা প্রথমে সংকোচে এবং পরে স্পষ্টভাবেই প্রকাশ করতে শুরু করেন তারা বিএনপির ‘জাতীয়তাবাদী চিন্তা’ ও ইসলামসংশ্লিষ্ট বিষয়ের সঙ্গে খুব একটা একমত নন। বিপরীতে বিএনপির নেতারা প্রথম দিন থেকেই এসব বিষয়ে নিশ্চুপ অবস্থান গ্রহণ করেন। একই মঞ্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নাম প্রশংসার সাথে উচ্চারিত হলেও শ্রদ্ধার সঙ্গে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামটি উচ্চারণ করতে শোনা যায়নি। নির্বাচনের আগে এ নিয়ে কিছু কানাঘুষা হলেও ঐক্যের প্রয়োজনে কেউ তেমন গুরুত্ব দিয়ে দেখতে চায়নি। নির্বাচনের পর সিইসির সঙ্গে সাক্ষাৎ কামনা করে বিএনপির পক্ষ থেকে দেয়া চিঠির প্যাডের কপি নিয়ে আবারো সেই প্রশ্ন কেউ কেউ সামনে নিয়ে আসছেন।

৩ জানুয়ারি এক ফেসবুক পোস্টে নিজস্ব নীতি থেকে বিএনপির সরে যাওয়ার একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন বিএনপিপন্থী লন্ডন প্রবাসী সাংবাদিক ওলিউল্লাহ নোমান। তিনি বিএনপির ওই দলীয় প্যাডের ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, ‘এটি বিএনপির দলীয় প্যাড। দলীয় প্যাডে একটি বিষয় খুবই লক্ষ্যনীয়। বিএনপির দলীয় প্যাডে শুরুতেই ছিল ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ লেখা। তারপর ছিল বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। ইদানীং দলীয় প্যাড থেকে এই দুটি জিনিস উচ্ছেদ হয়ে গেছে মনে হচ্ছে।’

তিনি অভিযোগ করে লেখেন, ‘গণফোরামসহ শেখ মুজিব প্রেমিক কয়েকটি দলের সাথে ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর থেকে দলীয় প্যাডে আর এই দুটি মূল শ্লোগান নেই।’

তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, এখন প্রশ্ন হচ্ছে বিএনপি কি তাইলে দলীয় মূলনীতি থেকে সরে গেল? না্কি কৌশলে মূলনীতি থেকে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে দলটিকে!

অপরদিকে বিবিসি বাংলাকে দেয়া নির্বাচন পরবর্তী এক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির খুলনা অঞ্চলের বিশিষ্ট নেতা নুরুল ইসলাম মঞ্জুও বিএনপির আপন সত্তায় ফিরে আসার উপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, ‘গত দু’দিন ধরে মাঠপর্যায়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে, বিএনপিকে নিজস্ব জায়গা থেকে ঘর গুছিয়ে, দল গুছিয়ে নিজের সত্তায় ফিরে আসতে হবে। জোটবদ্ধ রাজনীতি করলেও বিএনপির নিজস্ব একটা সত্তা আছে এবং ছিল। সেখানে বিএনপিকে আসতে হবে।’

অবশ্য অনেকেই মনে করেন, বিএনপির তার নীতি থেকে সরে যাচ্ছে কিনা সেই বিচার করার সময় এখনও আসেনি। দেশীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিবর্তিত অবস্থায় ‘ঝুঁকে যাওয়া ভারতনীতি’ ও কঠোর ধর্মনিরপেক্ষতার বিপরীতে বিএনপির সহনশীল ও নমনীয় নীতির পরিবর্তে নতুন অবস্থানটি একটি কৌশলও হতে পারে। তবে নিজস্বতা হারানো বিএনপির জন্যও যেমন কল্যাণকর নয়, তেমনি বিএনপির স্থানীয় সমর্থকরাও বিষয়টি পছন্দ করছে না। কারণ, তারা দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল থেকে বিএনপিকে পৃথক করে এই নীতিটুকু দিয়েই।

বরং দেখা যাচ্ছে, বিএনপির নেতা-কর্মীরাও বিএনপির নীতি থেকে সরে আসার বিষয়টি নিয়ে শঙ্কায় ভুগছেন। তারা চান বিএনপি তার পরিচিত নীতি, স্লোগান, ধারা ও আদর্শিক সত্তায় টিকে থাকুক।বিএনপি কি সামনের দিনগুলিতে নেতকর্মীদের এই চাওয়ার বিষয়টির দিকে মনোযোগ দেবে, না কি দিন দিন নিজের নীতি ও স্লোগানের জায়গাটা ছেড়ে দিয়ে চলবে-এটা হয়তো ভবিষ্যতই বলে দেবে।

পূর্ববর্তি সংবাদএবার সংখ্যালঘুরা শঙ্কাহীনভাবে ভোট দিতে পেরেছেন : রানা দাশগুপ্ত
পরবর্তি সংবাদআল্লাহর ডাকে লাব্বাইক বলুন