ওয়ালিউল্লাহ আরমান ।।
দেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে যে শোচনীয় অবস্থা বিরাজ করছে তাতে বিবেকবান ও সচেতন যে কেউ উদ্বিগ্ন হবে, তার মনে শঙ্কা ভর করবে। সেই উদ্বেগ, শঙ্কা কিংবা দুর্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় করলে সমাধানের পথ বেরিয়ে আসতে পারে। যদি না-ও আসে, অন্তত মনের বোঝা লাঘব তো হতে পারে।
কিন্তু আপাতত এই বিষয়ে কারও সাথে মন খুলে কথা বলারও সুযোগ নেই। এদেশে বস্তুবাদী, বুর্জোয়া কিংবা পাওয়ার পলিটিক্সের দলগুলোর নীতি-আদর্শ সম্পর্কে খুব একটা বলতে পারব না। তবে এতটুকু খোলা চোখেই বোঝা যায় যে, তাদের রাজনীতির মুখ্য উদ্দেশ্যই হলো যেনতেনভাবে দেশের ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করা। এসব দৃষ্টে ‘জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য’ শীর্ষক গণতন্ত্রের চটকদার স্লোগানটিকে ম্যাঙ্গোপিপলের জন্য ভাঁওতাবাজিপূর্ণ বুলি ছাড়া অন্য কিছুই মনে হয় না। সাম্যবাদের নামে সমাজতন্ত্র দুনিয়া থেকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। এর বিপরীতে দোর্দণ্ড প্রতাপে টিকে আছে পুঁজিবাদী গণতন্ত্র। যে ব্যবস্থায় জনগণকে বলা হয় ‘সকল ক্ষমতার মূল।’
দেশের কিছু সচেতন নাগরিক, যারা নিজেদেরকে ইসলামী রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে জুড়ে দিয়েছে, তারা জানে, নিকট ভবিষ্যতে এই দেশে ইসলামী শাসনব্যবস্থা কায়েমের সম্ভাবনা নেই। তারা জানে, সাম্রাজ্যবাদ নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যবস্থায় ইসলামী রাষ্ট্র কিংবা শরয়ী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা ‘মুশকিল হি নেহি, না-মুমকিন হ্যায়।’ কিন্তু বাহ্যিক নেতিবাচক ও হতাশাজনক পরিস্থিতি বিরাজ সত্ত্বেও একজন মুমিন হিসেবে আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ আস্থা, বিশ্বাস আর আনুগত্য রেখে তারা মনের মধ্যে ‘আল্লাহর জমিনে আল্লাহর বিধান’ কায়েমের স্বপ্ন জাগিয়ে রাখে। তারা নিজেদের কৈশোর-তারুণ্য-যৌবন, মেধা-অর্থ-সৃজনশীলতা-উদ্যম সবকিছু সংগঠনের কল্যাণে, কর্মসূচি বাস্তবায়নে অথবা সংগঠনের দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ব্যয় করে। তারা চায় বস্তুবাদ আর জাগতিকতার মোহে যেন মানুষ আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত না হয়, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশিত জীবনাদর্শ থেকে ছিটকে না পড়ে। সেজন্যে রাজনীতির মাধ্যমে ইসলামের আওয়াজটুকু সমাজে টিকিয়ে রাখতে সীমিত সামর্থের সর্বোচ্চ ব্যয় করে নিজেদেরকে ইসলামী রাজনীতির পাশাপাশি সমাজ এবং রাষ্ট্রেরও একজন নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাকর্মী হিসেবে গড়ে তোলে।
ইসলাম মানুষের জীবনের নিরাপত্তা, জান-মাল-ইজ্জত-আবরুর হেফাজতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজের ভাষণে মানুষের জীবনকে ‘পবিত্র’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইসলাম সামষ্টিক কাজে ‘শূরা’ তথা পরামর্শকে গুরুত্ব দিয়েছে। সে ‘পরামর্শে’ প্রত্যেকের মতামত ব্যক্ত করার অধিকারও দিয়েছে। ইসলাম রাষ্ট্রভুক্ত নাগরিকের নিরাপত্তাসহ সর্ববিধ প্রয়োজনের ক্ষেত্রে শাসকবর্গকে দায়িত্বের সর্বোচ্চ পালন এবং জবাবদিহিতা ও ন্যায়-ইনসাফের কথাও বলেছে। ইসলাম শাসককে স্বেচ্ছাচারিতা, জুলুম, শোষণ, নির্যাতন, নিপীড়ন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। পাশাপাশি ইসলাম সাধারণ নাগরিককে নেতৃত্বের প্রতি অনুগত এবং আস্থাশীল থাকতে বলেছে। আবার শাসকবর্গ যদি খোদায়ী বিধান থেকে বিচ্যুত হয়, স্বেচ্ছাচারী পন্থায় মানুষের উপর জুলুম, নির্যাতন চালায়, তখন তার প্রতিবাদ ও প্রতিকারে নাগরিকদের করণীয়ও বলে দিয়েছে।
ইসলামের প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাযিয়াল্লাহু আনহু খেলাফতের দায়িত্বারোহণের পর মদীনায় নিজের দায়িত্ব, কর্তব্য, কর্মপরিধি এবং জবাবদিহিতা সম্পর্কে ঐতিহাসিক ভাষণে বলেছিলেন; “হে জনমণ্ডলী! আমাকে আপনাদের নেতা নির্বাচিত করা হয়েছে, অথচ আমি আপনাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উত্তম নই। যাই হোক, আমি ভালো কাজ করলে আপনারা আমাকে সাহায্য করবেন। আর অন্যায় পথ অবলম্বন করলে আপনারা আমাকে সংশোধন কর দিবেন। মনে রাখবেন, সততা একটি আমানতস্বরূপ আর মিথ্যা তার খিয়ানত। ইনশাআল্লাহ্! আপনাদের মধ্যে দুর্বলজন আমার কাছে সবল বলে বিবেচিত হবে যতক্ষণ না আমি তার ন্যায্য অধিকার তাকে প্রদান করতে পারি। আর আপনাদের সবলও আমার কাছে দুর্বল বলে বিবেচিত হবে, যতক্ষণ না আমি তার কাছ থেকে অপরের ন্যায্য অধিকার আদায় করতে পারি।” ইসলামী রাজনীতিবিদরা দেশের সার্বিক চিত্র এবং জনমত সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকেফহাল। ভোটের রাজনীতিতে নিজেদের শক্তি কতটুকু সে সম্পর্কেও তারা অবগত। তারা এটাও ভালো মতই জানে যে, ইসলামিস্টদের প্রতি সাধারণ মানুষ যতই আবেগ-উচ্ছ্বাস দেখাক না কেন, ভোটের ক্ষেত্রে সেই আবেগ উচ্ছ্বাস কল্পনার ফানুসের মত মুহূর্তেই উবে যায়।
সবকিছু মিলিয়ে তারা নির্বাচন কেন্দ্রিক কিছু কৌশল অবলম্বন করেন। যার অন্যতম হচ্ছে, অপর শক্তিশালী সংগঠন কিংবা জোটের সাথে সমন্বিতভাবে নির্বাচনে অবতীর্ণ হওয়া। সেখানে তাদের চাওয়াও খুব বেশি থাকে না। যদিও অনেক সময় ইসলামী রাজনৈতিক সংগঠনগুলো জোটে নিজেদেরকে অবহেলিত, অবমূল্যায়িত ও উপেক্ষিত মনে করে। প্রায়শ এই জোটবদ্ধ হওয়া- না হওয়া নিয়ে ইসলামী অঙ্গনে হতাশা এবং ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশও ঘটে। এখানে ইসলামের মহান খলীফা হযরত আবু বকর রাযিআল্লাহু আনহু -এর ঐতিহাসিক ভাষণের চুম্বকাংশের সাথে গণতন্ত্রের মূল থিম তথা ‘জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য’ শীর্ষক আকর্ষণীয় স্লোগানটি তুলে ধরার মূল কারণ এটাই যে, কারো কারো দৃষ্টিতে হযরত সিদ্দিকে আকবর এর ‘জনগণের কল্যাণে প্রদত্ত’ বক্তব্যের সাথে গণতন্ত্রের এই থিম এর কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, এখন অধিকাংশ ‘গণতান্ত্রিক দেশেই’ স্বৈরতন্ত্র চালু হয়েছে এবং অনেক দেশে সুকৌশলে রাজতন্ত্র কায়েমের প্রক্রিয়া এর ফলে তারা জনবিচ্ছিন্ন হওয়া সত্ত্বেও মানুষের মতামতের সামান্যতম তোয়াক্কা করছে না।
কোনো কোনো ভূখণ্ডে তো মানুষকে প্রাপ্য ন্যূনতম সম্মানও প্রদর্শণ করা হচ্ছে না। এর ফলে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী দেশের ভাল-মন্দ, কল্যাণ-অকল্যাণ নিয়ে না ভেবে বরং নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাচ্ছেন। তারা চোখের সামনে ঘটে যাওয়া নিত্য অনিয়ম অন্যায় ও বিচার দেখা সত্বেও নিরুপায় হিসেবে মুখ বুজে সব সহ্য করছে। সময়ের নির্মমতা তাকে বৃহৎ ভাবনা থেকে আত্মকেন্দ্রিক বানিয়ে দিচ্ছে। সমাজ, রাষ্ট্রের তুলনায় কেবলমাত্র পরিবার নিয়েই সে ভাবছে। এর ফলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতি কিন্তু দেশেরই হচ্ছে। আফসোস, জাতির কর্ণধারদের যদি তা বুঝে আসতো!!
লেখক : আলেম, লেখক, ইসলামি রাজনীতিক
















