প্রতিপক্ষের প্রতি সহিংস আচরণ বন্ধ করার মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের : মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ সাদী

প্রতিপক্ষের প্রতি হিংস্র আচরণের মাত্রা দিনদিন বাড়ছে আমাদের সমাজে। বিশেষত নির্বাচন ও নির্বাচন পরবর্তী সময়ে প্রতিপক্ষের আঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন বহু মানুষ। আহত হয়েছেন অনেকেই। গণমাধ্যমে প্রকাশ আজও (৬ জানুয়ারি) নাটোরের একজন আওয়ামী কর্মীর পা কেটে নিয়ে গেছেন দলীয় প্রতিপক্ষ। কিন্তু মুসলামানের সমাজে তা কতোটা গ্রহণযোগ্য? একজন মুসলিম হিসেবে মানুষ কাকে প্রতিপক্ষ মনে করবে এবং তার সাথে কেমন আচরণ করবে তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট আলেম ও ইত্তেফাকুল উলামা ময়মনসিংহের মজলিসে আলেমার সভাপতি মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ সাদী। কথোপকথনে তার সঙ্গে ছিলেন আতাউর রহমান খসরু

ইসলাম টাইমস : আমাদের সমাজে মানুষ নানান কারণে পরস্পরকে প্রতিপক্ষ মনে করে। কিন্তু ইসলামে প্রতিপক্ষের বিন্যাসটি কেমন?

মাওলানা সাদী : কুরআন-হাদিস ও শরঈ বিধানের আলোকে আমরা ৩ ধরনের প্রতিপক্ষ খুঁজে পাই। ১. ঈমান আকিদার প্রতিপক্ষ। অর্থাৎ ঈমান ও কুফরির প্রশ্নে প্রতিপক্ষ। যেমন, মুসলিম ও মুসলিম, ২. আমলের প্রতিপক্ষ। যাদের ঈমান আছে। কিন্তু তারা ভ্রান্ত কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত। যেমন, বিভিন্ন বিদআতি ও ভ্রান্ত মুসলিম সম্প্রদায়, ৩. স্বার্থের প্রতিপক্ষ। সেটা অনেক কারণে হতে পারে। যেমন, রাজনৈতিক স্বার্থ, অর্থনৈতিক স্বার্থ, ক্ষমতা ও পদের স্বার্থ, সুনাম ও প্রভাব-প্রতিপত্তির স্বার্থ ইত্যাদি।

ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত প্রতিপক্ষ ঈমান ও আমলের প্রতিপক্ষ। মানুষ স্বার্থের জন্য প্রতিপক্ষ হবে বা ভাববে ইসলাম এটাকে নিরুৎসাহিত করে। কিন্তু আমাদের স্বার্থের প্রতিপক্ষকেই প্রতিপক্ষ মনে করা হয়। অন্যদের ব্যাপারে কোনো মাথাব্যথা নেই।

ইসলাম টাইমস : স্তর অনুযায়ী এসব প্রতিপক্ষের সঙ্গে ইসলাম কেমন আচরণ করতে বলেছে?

মাওলানা সাদী : ঈমানের প্রতিপক্ষের ব্যাপারে আল্লাহ ও তার রাসুল সা. চূড়ান্ত ফায়সালা দিয়ে গেছেন। তাদের ব্যাপারে নতুন করে ফায়সালা দেওয়ার অধিকার কারো নেই। আমলের প্রতিপক্ষের ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহের কোথাও কোথাও বিধান রয়েছে। আবার কোনোটা হয়তো সরাসরি নেই। তখন উলামায়ে কেরাম কুরআন-সুন্নাহ সামনে রেখে ইমাম, ফকিহ, মুজতাহিদ ও ইসলামি রাষ্ট্রের বিচারকগণ সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত দেবেন।

আর স্বার্থের প্রতিপক্ষের ব্যাপারে ইসলাম ক্ষমা, ধৈর্য্য ও সহনশীলতার শিক্ষা দেয়। তবে হ্যা, ইসলাম এটাও বলে না যে, মানুষ তার জাগতিক সব স্বার্থ বিসর্জন দেবে।

ইসলাম টাইমস : তাহলে সমন্বয় কিভাবে করবে?

মাওলানা সাদী : নিজে ধৈর্য্য ধারণ করবে, ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবে এবং আইনানুগ পদ্ধতিতে স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করবে।

ইসলাম টাইমস : কিন্তু যখন আইন ও আইনী প্রতিষ্ঠানই মানুষের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়?

মাওলানা সাদী : সেটা তো অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক একটি অবস্থা। এমন হলে সমাজে হানাহানি-খুনোখুনি ছড়িয়ে পড়বে এবং নাগরিকরা নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার দুঃসাহস দেখাবে। আমাদের সমাজে এতো বিশৃঙ্খলা কেন? কারণ, মানুষ আইনি প্রতিক্রায় নিজের অধিকার রক্ষার আশা করতে পারে না। হাজারে একজন মানুষও সঠিক উপায়ে নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে না।

আবার একদল মানুষের মানসিকতা এমন যে, সে যেটাকে স্বার্থ মনে করে –সেটা প্রকৃতার্থে তার স্বার্থ হোক বা না হোক- তা উদ্ধারের জন্য মানুষ এমন কোনো পদ্ধতি নাই যা অবলম্বন করে না। হালাল-হারামের বিবেচনাও করে না।

ইসলাম টাইমস : রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণেও মানুষ মানুষের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছে। সেটা কীভাবে রোধ করা যায়?

মাওলানা সাদী : স্বার্থ বলেন আর রাজনৈতিক মতাদর্শ বলেন যেসব কারণে আজ মানুষ প্রতিপক্ষের প্রতি সহিংস হয়ে উঠছে তা বন্ধের মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এখন রাষ্ট্রই যদি তা দিতে ব্যর্থ হয়, বা দিতে না চায় তাহলে জনগণ আর কী করতে পারবে? রাষ্ট্রের সদিচ্ছা না থাকলে কখনই প্রতিহিংসা বন্ধ হবে না।

এর চেয়েও বড় কথা হলো, যার সামনে মৃত্যু পরবর্তী জীবনের কিছুই নেই তাকে সংঘাত ও বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করা কঠিন।

ইসলাম টাইমস : তাহলে মানুষ কী করবে?

মাওলানা সাদী : রাষ্ট্র, আইন, আদালত ও ক্ষমতাবান মানুষরা যদি ন্যায়বিচারে আগ্রহী না হয় তাহলে সেই সমাজের মানুষ হয়তো মাটি কামড় দিয়ে পড়ে থাকবে অথবা সেও একজন স্বার্থবাদী ও প্রতিপক্ষের প্রতি সহিংস হয়ে উঠবে।

তবে এটাও ঠিক স্বার্থের দ্বন্ধ পৃথিবীর প্রথম থেকেই ছিলো। হাবিল-কাবিল ঈমান ও আমলের প্রতিপক্ষ ছিলো না। সেখানে ব্যক্তিগত স্বার্থচিন্তায় একজনকে সহিংস করে তোলে। সুতরাং খুব হতাশ হওয়ার দরকার নেই। পৃথিবীর কেউ প্রতিপক্ষের উপর আঘাতের বিষয়টি বিলুপ্ত করতে পারবে না। বরং হার কমাতে পারবে।

ইসলাম টাইমস : সেটা কীভাবে?

মাওলানা সাদী : দ্বীনি ও নৈতিক শিক্ষার বিস্তার করা। সেটা সব জায়গায় প্রয়োজন। শুধু মাদরাসাতেই না, স্কুল-কলেজেও নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। নতুবা সমাজে সামগ্রিতক কল্যাণচিন্তার বিস্তার ঘটানো সম্ভব নয়।

পূর্ববর্তি সংবাদনাটোরে ওসি পরিচয়ে ঘুষ নেওয়া যুবলীগ নেতা আটক
পরবর্তি সংবাদগাজীপুরে গোশতপট্টিতে শিয়াল জবাই! এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ