‘মরহুম’ নারীবাদীরা হঠাৎ ‘জীবিত’ হয়ে উঠলেন!

ওয়ারিস রব্বানী ।।

মাস দুয়েক আগের কথা। মাসুদা ভাট্টির জন্য সারি সারি দরদি চোখের পানি দেখা গেছে। ক্রুদ্ধ মানববন্ধনের গলা ফাটানো আওয়াজ শোনা গেছে। এরপর? এরপর আর তাদের খোঁজ মিলেনি। মাঝখানে কত মারধর গেল। সুবর্ণচর গেল, গণধর্ষণ ও গণপীড়ন গেল। তারা তখন মাটির উপরে ছিলেন বলে মনেই হয়নি। সেই মরহুম নারীবাদীরা হঠাৎ জীবিত হয়ে উঠলেন আবার। আহমদ শফী সাহেবের এক বক্তব্যে তারা ‘মরহুম’ থেকে ‘জীবিত’ হতে হতে একদম খাড়া হয়ে গেলেন। বাব্বাহ, হুজুরের এক বক্তৃতার এত পাওয়ার আগে আমাদের জানাই ছিল না।

১১ জানুয়ারি হাটহাজারি মাদরাসার মাহফিলে আল্লামা আহমদ শফী নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া মেয়েদের উচ্চ শিক্ষায় পাঠাতে নিষেধ করেছেন। নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে আরও কিছু কথাও বলেছেন। কেউ চাইলে সেসব কথার অনেক চুলচেরা কাটাছেড়া হতে পারে। কেউ চাইলে এত বয়স্ক, মান্যগণ্য একজন মুরব্বিকে মাঠে ময়দানের অনুষ্ঠানে উপস্থিত না করলেও চলে কি না-সে বিষয়েও হয়তো কথা চলতে পারে। কিন্তু আমি আজ বলছি অন্য কথা।

তাঁর এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দেখলাম, জাতীয় গণমাধ্যমের বড় একটি অংশ নেতিবাচক চিৎকার জুড়ে দিল। পনের থেকে বিশ ঘণ্টার মধ্যে সুশীল নারী দরদিরা মৃতদশা ছেড়ে ‘জীবিত’ হয়ে উঠলেন। এ যেন এক আজব কেরামতি হুজুরের। এক বক্তব্যে মরহুম নারীবাদীদের জীবিত করেই ছাড়লেন। কেউ বলছেন হুজুরের বক্তব্য রাষ্ট্রবিরোধী, কেউ বলছেন সংবিধান বিরোধী। ভাবখানা, কী আর বলব, মনে হয়- রাষ্ট্র, সংবিধান আর আইন-কানুনের সব দস্তাবেজ তাদের হাতের তালুর মধ্যেই থাকে। রাষ্ট্র ও সংবিধানের দোহাই দিয়ে কাউকে নাকচ করতে আর উপরে তুলতে তাদের বেশি একটা বেগ পেতে হয় না।

অথচ মজার একটা ব্যাপার দেখুন! এ দেশের এক সবজান্তা সুশীল নারী কয়দিন আগে ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর মানুষকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে সম্বোধন করে বক্তৃতা দিয়েছেন। ‘বড়’ পত্রিকায় সে বক্তব্য ছাপাও হয়েছে। সংবিধান ও আইনে ‘আদিবাসী’ শব্দ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তিনি কিন্তু সংযত হননি। সেই তিনিই আজ বললেন, আহমদ শফীর বক্তব্য সংবিধান বিরোধী। এদের বৈপরীত্ব বড় দেখার মতো জিনিস।

মেয়েদের শিক্ষা ও নিরাপত্তার চেয়েও এদের কাছে বড় ব্যাপার মতলবী চিৎকার। উদ্দেশ্যমূলক মায়াকান্না। এ জন্যই ক্যাম্পাসে ছাত্রী লাঞ্ছিত হলে, সুবর্ণচর ধর্ষিত হলে তারা চুপটি মেরে থাকে। ঘাপটি মেরে থাকে। মনে হয় বেঁচেই নেই। সেই তারাই যখন দেখে, প্রভাবশালী কোনো মহলের মনোযোগ পাওয়া যাবে, বরেণ্য কোনো ব্যক্তিত্বকে খাটো করা যাবে- তখন নীরবতার কবর ফুঁড়ে বের হয়ে আসে। গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে দুনিয়া একসঙ্গে করে ফেলার চেষ্টা করে। কলহমগ্ন নারী-পুরুষের মতোই বেসুরো কোরাসে মানুষের ঘুম-শান্তি কেড়ে নিতে উদ্যোগী হয়। এইসব সময়চেনা ঝগড়াটে, মতলবী নারী-দরদিদের ব্যাপারে সজাগ থাকা দরকার সবার। সবচেয়ে বেশি নারীদের।

প্রায় শতবর্ষী একজন মানুষের কথা। যিনি হয়তো পূর্বাপর মনে রেখে, আগাগোড়া গুছিয়ে কথাগুলো পেশ করার সুযোগ এখন আর পান না। মূল কথাটা সরাসরি বলে দেন। কথার দরকারি অংশটা প্রকাশ করে বয়ান সম্পন্ন করেন। বিপথগামীরা তাঁর বয়স, প্রেক্ষাপট ও ক্ষেত্র-সব ভুলে গিয়ে একসারি বাক্য নিয়ে গিট্টু লাগিয়ে বসে যায়। পাইছি রে পাইছি- একটা ভাব নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড বাঁধানোর চেষ্টা করে। যত চেষ্টাই তারা করুক, লাভ হাতিয়ে নিতে পারে না। দূর থেকে ভালো মানুষেরা তাদের কাণ্ড দেখে আর মুখটিপে হাসে। ঝগড়া-পাগলদের সঙ্গে ঝগড়ায় লিপ্ত হওয়া শরমের ব্যাপার না!

মরহুম সুশীলদের এ দেশের মানুষ ভালো করেই চেনে। এরা কখন জীবিত হয়, এরা কখন মরে যায়, এরা কখন খাড়া হয়, এরা কখন শুয়ে পড়ে- সচেতন মানুষ ঠিকই টের পায়। এদের চেতনার দিনকাল, মৃত হওয়ার মওসুম সম্পর্কে মানুষ সম্যক জানে। ভাট্টির মিছিলে থাকলেও এরা যে সুবর্ণচরের পাশে থাকবে না- এই অংকটা কারো অজানা না। আল্লামা আহমদ শফীর বক্তব্যের ‘মওকা’ নিয়ে এদের গলাফাটানো চিৎকারে তাই শুভবুদ্ধির মানুষদের কিছুই যায় আসে না। মানুষ দেখে এবং নেয়- যেখান থেকে তার যে মেসেজ নিতে হয়।

পূর্ববর্তি সংবাদসিলেটের বালাগঞ্জে স্কুলছাত্রী ধর্ষিত
পরবর্তি সংবাদবাবরি মসজিদ : রক্তাক্ত ইতিহাসের ধারাপ্রবাহ (১৫২৮-২০১৯)