বাবরি মসজিদ : রক্তাক্ত ইতিহাসের ধারাপ্রবাহ (১৫২৮-২০১৯)

শাহ মুহাম্মাদ খালিদ ।।

ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানের আবেগ, অনুভূতি ও রক্তক্ষয়ী এক ইতিহাসের নাম বাবরি মসজিদ। মোঘল সম্রাট বাবরের নির্দেশে ১৫২৮ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত মসজিদটি নির্মমভাবে গুড়িয়ে দেওয়া হয় ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর।  নির্মানের প্রায় সাড়ে তিনশো বছর পর রাম ‘দেবতা’র নামে গল্প আটেন হিন্দুত্ববাদী নেতারা। দাবি তোলেন মসজিদ ধ্বংস করে মন্দির নির্মাণের। ব্রিটিশ সরকারের প্রশ্রয়ে যা প্রবল হতে থাকে দিন দিন। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার অজুহাতে ব্রিটিশ সরকার সিলগালা করে মসজিদটি। তবুও ক্ষ্যান্ত হলো না হিন্দুত্ববাদীরা। অবশেষে একদল ধর্মান্ধ হিন্দুর হাতে শহিদ হলো পাঁচশো বছরের পুরাতন বাবরি মসজিদ। এই নিয়ে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়রো উপমহাদেশ জুড়ে। তারপর থেকে চলছে বিচার, আর বিচারের নামে প্রহসন। অর্ধ-সহস্রাব্দের সেই ইতিহাসের ধারাপ্রবাহই তুলে ধরা হলো নিচে।


১৫২৮ : মোঘল সম্রাট বাবরের নির্দেশে ভারতের বর্তমান উত্তর প্রদেশের ফয়জাবাদ জেলার অযোধ্যা শহরে এই মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ভারতের হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর দাবি অনুযায়ী যা দেবতা রামের জন্মস্থল এবং যেখানে আগে একটি মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল।

১৮৫৩-১৯৪৯ : হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা। যার পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ কোর্ট কর্তৃক মসজিদের ভেতরের অংশ মুসলমানদের এবং বাইরের অংশ হিন্দুদের প্রদান।

১৯৪৯ : হিন্দু সংগঠন কর্তৃক মসজিদের ভেতর দেবতা রামের মূর্তি পাওয়ার দাবি, মুসলমানদের আপত্তি। মসজিদ প্রাঙ্গনকে সরকার কর্তৃক বিতর্কিত স্থান বলে ঘোষণা। পাশাপাশি মসজিদের গেট সিলগালা।

১৯৫০ : ফয়জাবাদ সিভিল কোর্টে বাবরি মসজিদে মূর্তি স্থাপন এবং পূজার অনুমতি চেয়ে আবেদন দায়ের।

১৯৫৯ : সালে নির্মোহি আখড়া কর্তৃক তৃতীয় মামলা দায়ের।

১৯৬১ : উত্তর প্রদেশ সুন্নী সেন্ট্রাল ওয়াকফ বোর্ড কর্তৃক বাবরি মসজিদের দখল এবং সেখান থেকে মূর্তি অপসারণের দাবি জানিয়ে আর্জি দায়ের।

১৯৮৬ : জেলা জজ কর্তৃক মসজিদের গেট খুলে দেয়ার এবং হিন্দু উপাসকদের জন্য তা উন্মুক্ত করে দেয়ার আদেশ।

৬ ডিসেম্বর ১৯৯২ : কট্টরপন্থী হিন্দু নেতা লালকৃ আদভানির নেতৃত্বে বিতর্কিত রথযাত্রা এবং দেড় লক্ষ মানুষের সমাবেশ করে মসজিদ ধ্বংস। ফলশ্রুতিতে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, ২০০০ এর বেশি মানুষ নিহত।

২০০১ : বিশেষ জজ কর্তৃক এ সংক্রান্ত মামলা থেকে আদভানিসহ ১৩ ব্যক্তিকে খালাস।

২০০২ : গুজরাটের গোধরায় একটি ট্রেনে হিন্দু করসেবকদের ওপর রহস্যজনক হামলায় ৫৮ করসেবক নিহত। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত দাঙ্গায় ২০০০ এর বেশি মানুষের মৃত্যু।

২০১০ : এলাহাবাদ হাইকোর্ট কর্তৃক মসজিদের জায়গার এক তৃতীয়াংশ মুসলমানদের প্রদান। এক তৃতীয়াংশ হিন্দুদেরকে এবং বাকি এক তৃতীয়াংশ নির্মোহী আখড়াকে প্রদানের রায়। মূল যে অংশ নিয়ে বিতর্ক তা হিন্দুদের প্রদানের রায়।

২০১১ : ভারতের সুপ্রীম কোর্ট কর্তৃক হাইকোর্টের পূর্বের রায় বাতিল। রায়ে বলা হয়, উভয় পক্ষের কেউই জমিটির ভাগাভাগি চান না।

২০১৭ : মামলার চার্জশিট থেকে আদভানিসহ অন্য নেতাদের নাম সরানো যাবে না বলে কোর্টের আদেশ। বিষয়টি আদালতের বাইরে মিমাংসা করার জন্য উভয় পক্ষের কাছে সুপ্রীম কোর্টের অনুরোধ।

২০১৮ : মসজিদ ইসলামের অপরিহার্য বিষয় নয় মর্মে ১৯৯৪ সালে নিম্ন আদালতের দেওয়া রায়কে বিবেচনায় নিতে সুপ্রিম কোর্টের অস্বীকৃতি।

১০ জানুয়ারি ২০১৯ : বিচারক ইউইউ লোলিত নিজেকে এই মামলা থেকে সরিয়ে নেন। মামলার পরবর্তী শুনানি ২৯ জানুয়ারি।

সূত্র : টাইমস অব ইন্ডিয়া, ডয়েচ ভেলে ও উইকিপিডিয়া অবলম্বনে

পূর্ববর্তি সংবাদ‘মরহুম’ নারীবাদীরা হঠাৎ ‘জীবিত’ হয়ে উঠলেন!
পরবর্তি সংবাদপুলিশ আসামি ধরতে যাওয়ায় সংঘর্ষ: নারায়ণগঞ্জে যুবক নিহত