বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টের ভিন্ন সুর : জোট ছাড়তে পারে শরিক ইসলামি দলগুলো

আতাউর রহমান খসরু ।।

বাংলাদেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেম ও হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা আহমদ শফীর নারী শিক্ষা বিষয়ক এক বক্তব্যের পর দেশের গণমাধ্যমে সরব হয়েছেন কথিত নারীবাদীরা। তারা আল্লামা আহমদ শফীর (খণ্ডিত) বক্তব্য নিয়ে নগ্ন সমালোচনায় মত্ত হয়েছেন। এর সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন কতিপয় রাজনীতিবিদও। তবে আল্লামা আহমদ শফী তার বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেওয়ার পর সমালোচনার সুর নরম করেছে তারা।

তবে এরপরও আল্লামা আহমদ শফীর সমালোচনা করে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আর তারও একদিন পর আল্লামা আহমদ শফীর সমালোচনায় আপত্তিকর ও অশালীন শব্দ ব্যবহার করে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠান জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহবায়ক ড. কামাল আহমদ।

তাদের এই সমালোচনায় নড়েচড়ে বসতে শুরু করেছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের ইসলামি দলের নেতারা। আজ ইসলাম টাইমসের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করলে তারা মির্জা ফখরুল ও ড. কামালের বিবৃতিকে অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দেন এবং ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন। সাথে সাথে তারা এই রাজনীতিকদের বিবৃতিকে অশুভ লক্ষণ বলে মন্তব্য করেন।

আরও পড়ুন : কামালের বিবৃতিতে আল্লামা শফীকে বলা হলো, ‘নারীবিদ্বেষী, স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী, সংবিধানবিরোধী ও ফতোয়াবাজ’

বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকার বিষয়ে তারা স্পষ্ট মতামত প্রকাশ না করলেও বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইসলাম বিদ্বেষী প্রবণতা বাড়তে থাকলে তারাও জোটে থাকার বিষয়টি নতুন করে ভেবে দেখবেন বলে জানান। তারা বলেন, ইতিমধ্যেই তাদের দলে জোটে থাকা, না থাকার প্রশ্নে আলোচনা শুরু হয়েছে।

অবশ্য হেফাজতে ইসলামের অংশ হওয়ার পরও হেফাজত আমিরের বিরুদ্ধে দেওয়া বিবৃতির প্রতিবাদ করছেন না কেন? এমন প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি তারা।

এই প্রশ্নের উত্তরে খেলাফত মজলিসের মহাসচিব অধ্যাপক ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, ‘আল্লামা আহমদ শফীর ব্যাপারে যে অশালীন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে আমরা তা প্রত্যাখ্যান করছি। কিন্তু তার বক্তব্যের সব অংশের সঙ্গে ইসলামি মহলের মধ্যেই মতভিন্নতা রয়েছে। হয়তো সে কারণেই আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ থেকে বিরত থাকছে ইসলামি দলগুলো।’

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহীনূর পাশা বলেন, ‘এখনও আমরা আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানাইনি। কিন্তু আজ দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক আছে সেখান থেকে প্রতিবাদ আসতেও পারে।’

তবে বিএনপি মহাসচিবের বিবৃতির পরপর ড. কামালের বিবৃতি প্রদানকে রাজনীতিতে অশুভ লক্ষণ হিসেবেই দেখছেন এই জমিয়ত নেতা। তিনি বলেন, ‘একটি মুসলিম দেশে দায়িত্বশীল নেতৃত্ব থেকে এমন বিবৃতি প্রত্যাশিত নয়। এটা অনেকটা হতচকিত হওয়ার মতো ঘটনা।’

আরও পড়ুন : ব্যাখ্যা দেওয়ার পরও বিবৃতি দিয়ে আল্লামা শফীর বক্তব্যের সমালোচনা করলেন ফখরুল

তবে তিনি মনে করেন না যে, ড. কামাল বিএনপির পরিবর্তন করে দেওয়ার মতো প্রভাব রাখেন।

ড. আহমদ আবদুল কাদেরও তার সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘কামাল সাহেবেরও বয়স হয়েছে। বয়সের ভারে তিনি অনেক কথা বলেন। তার সব কথা ধরার মতো নয়।’

বিএনপি-ঐক্যফ্রন্ট যে পথে যাত্রা শুরু করেছে তাতে কী এই জোট নিয়ে ভেবে দেখা উচিৎ নয়? মাওলানা শাহীনূর পাশা মনে করেন, জোট থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় হয়নি। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, একদিকে ইসলামি দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা দেখছি না। অন্যদিকে এককভাবে আওয়ামী লীগের মতো বড় দলের মোকাবেলা করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারিনি।’

অবশ্য অধ্যাপক আহমদ আবদুল কাদের মনে করেন বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকার বিষয়ে প্রশ্ন ওঠা অযৌক্তিক নয়। তার ভাষায়, ‘এই প্রশ্ন উঠতেই পারে। আমাদের ভেতর যে প্রশ্ন নেই তা নয়। তবে এই মুহূর্তে মন্তব্য করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। নিজেরা চিন্তা-ভাবনা করবো এবং দলীয় ফোরামে আলোচনা করবো, তারপর সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে।’

জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের অপর এক নেতা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেছেন, আমরা বিএনপি জোটে থাকা, না থাকার প্রশ্নে আমরা শুধু ভাবছি না বরং গভীরভাবে ভাবছি। দলের নীতি নির্ধারণী পর্যায়েই বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়েছে। বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তাতে আমরা ভিন্ন চিন্তা করতে বাধ্যও হতে পারি। কারণ, ঈমান-ইসলামের প্রশ্নে কোনো ছাড় দেয়া যায় না।

মাওলানা শাহীনূর পাশার মতো ইসলামি দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে অধ্যাপক আহমদ আবদুল কাদেরের। তবে তিনি পুরোপুরি নিরাশ নন। এই বিষয়ে তার বক্তব্য হলো, ‘ইসলামি দলগুলোর মধ্যে আলোচনা হওয়া দরকার। ঐক্যবদ্ধ হওয়ার অতীতের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। এক নামে এক হয়ে আবার একই নামে তিন দল গঠন করেছি আমরা। তাই আগে ঠিক করতে হবে আমরা ঠিক কোন পয়েন্টে ঐক্যবদ্ধ হবো? তার নেতৃত্ব কীভাবে নির্ধারিত হবে? তা না হলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং তা ধরে রাখা সম্ভব হবে না।’

ড. কামালের অশালীন শব্দ ব্যবহারে খানিকটা ক্ষোভ প্রকাশ করেন অধ্যাপক আহমদ আবদুল কাদের। তিনি বলেন, আল্লামা আহমদ শফীর বক্তব্যের সঙ্গে আমিও হয়তো পুরোপুরি একমত হবো না। তবে আমি মনে করি, তিনি যে সময়ের মানুষ এবং যে পরিবেশে তিনি এই বক্তব্যটি দিয়েছেন তাতে তাকে নারীবিদ্বেষী বলার সুযোগ নেই। যারা তাকে নারীবিদ্বেষী বলেছেন তারা ইসলাম বিদ্বেষী।

পূর্ববর্তি সংবাদএবার ফখরুলের পদত্যাগ চাইলেন ওবায়দুল কাদের
পরবর্তি সংবাদখালেদা জিয়া অসুস্থ, আদালতে হাজির করতে পারেনি কারা কর্তৃপক্ষ