ওয়াজ-মাহফিলে জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালীরা কেন আসবেন? কী বলবেন?

আতাউর রহমান খসরু ।।

মাহফিল এখন বাংলাদেশের ইসলামি সংস্কৃতির অংশ। শীতকালজুড়ে বাংলাদেশের শহরে-গ্রামে-গঞ্জে অসংখ্য দ্বীনি মাহফিলের আয়োজন হয়। এসব মাহফিল যেমন সাধারণ মানুষের দ্বীন শিক্ষার সুযোগ করে দেয়, তেমন ইসলামি চিন্তা-চেতনা ও মূল্যবোধের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কিন্তু বিগত কয়েক বছর যাবত দেখা দিয়েছে নতুন এক উপসর্গ। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা দ্বীনি মাহফিলে উপস্থিত হন এবং দীর্ঘ আলোচনার অবতারণা করেন। কেউ কেউ এ সময় ধর্মীয় বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে হাস্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। কখনো কখনো ইসলামি মূল্যবোধ, মাদরাসা-মসজিদ ও উলামায়ে কেরামের বিরুদ্ধেও কথা বলেন তারা এতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় মাহফিলে।

কিন্তু মাহফিলে সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আগমন বাড়ছে কেন? কেন তারা বিপরীত ধারার লোক হয়েও দ্বীনি মাহফিলের মঞ্চে কথা বলতে চান? মাদরাসাতুল মদিনা, বগুড়ার প্রিন্সিপাল মুফতি মনোয়ার হোসাইনের বিশ্লেষণ হলো, ‘আমাদের মাহফিলগুলো দিনদিন সামাজিক আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নিচ্ছে। তাই তার নিয়ন্ত্রণও ইসলামি ধারার লোকদের হাত থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। সেখানে অন্যরা এসে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।’

তাহলে মাহফিলে সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা আসবেন না? দেশের খ্যাতিমান বক্তা ও উত্তরা গাউসুল আজম মসজিদের খতিব মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবীর মত হলো, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ মান্যবর ব্যক্তিরা মাহফিলে আসার অধিকার রাখেন। তারা মাহফিলে এলে সমস্যা নেই। কারণ, এর ইতিবাচক কিছু ফলও রয়েছে। তবে তাদের সংযতকরণের মেহনত (চেষ্টা) প্রয়োজন।

অন্যদিকে মুফতি মনোয়ার হোসাইন মনে করেন, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা মাহফিলে এলে শুধু শ্রোতা হিসেবেই আসা উচিৎ। মাহফিলে তারা কোনো কথাই বলবেন না। মাহফিল দ্বীনি আয়োজন সেখানে শুধু দ্বীনি জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিরাই কথা বলবেন।

‘কারণ, তাদের জীবনে ইসলামের পক্ষে কাজ করার সুযোগ থাকার পরও তারা এমন দল বা সংগঠনের হয়ে কাজ করছে যারা ইসলামকে মিটিয়ে দিতে চায়। সুতরাং ইসলাম নিয়ে তাদের কথা বলা হাস্যকর।’ –মুফতি মনোয়ার।

মাওলানা আইয়ুবীও তার সঙ্গে একমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘ধর্মীয় বিষয়ে কথা বলার অধিকার তাদের নেই। অনেক সময় তারা আয়াত পড়েন, হাদিস পাঠ করেন কিন্তু ভুল। এতে হাস্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।যার কাজ যেটা নয়; সেটা না করাই তো ভালো।’

তবে তিনি মনে করেন, তারা নিজেদের জন্য দোয়া চাইতে পারেন এবং কথা বলতে পারেন সাধারণ সামাজিক কল্যাণ নিয়ে। তারা কথা বলবেন সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে। যেহেতু এলাকার লোকদের একত্রে পান, তাই সহজেই এলাকাবাসীকে দিকনির্দেশনা দেবেন। যেমন, তিনি মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে পারেন।

কিন্তু অনেকের ভেতর কথা দীর্ঘ করার প্রবণতা দেখা যায়? উত্তরে মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ূবী বলেন, ভদ্র ও মার্জিত ব্যক্তিরা মাহফিলে এসে দীর্ঘ কথা বলেন না। যারা বলেন, তাদেরকে বলে ফেরানো যাবে না। বরং কোথাও বলতে গেলে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

তার পরামর্শ হলো, বক্তারা এই বিষয়ে কথা না বলাই ভালো। বিশেষত বয়সে যারা নবীন তারা বিষয়টি অবশ্যই এড়িয়ে যাবেন। তা না হলে পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। বরং মাহফিলের আয়োজকরা চেষ্টা করবেন জনপ্রতিনিধিসহ আলেম নন এমন ব্যক্তি যেন দীর্ঘ আলোচনায় না যান এবং ধর্মীয় বিষয়ে চুপ থাকেন।

মুফতি মনোয়ার হোসাইনও একই পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, মাহফিলের আয়োজকদের প্রথম থেকেই সতর্ক থাকতে হবে। নাম দেওয়ার মতো বিষয়গুলোও এড়িয়ে যেতে হবে। নাম দিলে, সহযোগিতা নিলে পরবর্তীতে তাদের আপত্তিকর বক্তব্যও মুখ বুজে শুনতে হয়।

অনেক সময় বিশেষ ব্যক্তির নাম না থাকলে মাহফিলের অনুমতি পাওয়া যায় না –এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমার মনে হয়, মাহফিলের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ইসলামি আকিদা-বিশ্বাস ও মূল্যবোধের বিরুদ্ধে কথা বলতে দেওয়ার চেয়ে মাহফিল না হওয়া ভালো।

পূর্ববর্তি সংবাদমদিনার বিশিষ্ট আলেম শায়েখ আল-আমারীকে ‘বিষ’ প্রয়োগে হত্যার অভিযোগ
পরবর্তি সংবাদআসামিদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ, দুদক পরিচালক ফজলুল হক বরখাস্ত