৪৫ বছরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ফিলিপাইনে মুসলিম বাংশোমারো অঞ্চলের যাত্রা শুরু

ফিলিপিন মুসলিমদের আশা-আকাঙ্খার প্রতীক বাংশোমারো পার্লামেন্ট ভবন

আতাউর রহমান খসরু ।।

ফিলিপাইনে নতুন দিনের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে স্বায়ত্ব শাসিত মুসলিম বাংশোমারো অঞ্চল। দীর্ঘ ৪৫ বছরের আন্দোলন ও সংগ্রামের পর তারা অধিকতর স্বায়ত্ব শাসনের এই অধিকার লাভ করলো। গত ২১ জানুয়ারি ও ৬ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনে অনুষ্ঠিত গণভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে মুসলিম বাংশোমারো অঞ্চল আইনি ভিত্তি পেলো এবং মুসলিমরা নিয়ন্ত্রণের সাংবিধানিক অধিকার লাভ করলো।

জুলাই ২০১৮ সালে সরকার ও মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্টের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় ঐতিহাসিক এই গণভোটের আয়োজন করা হয়। এই চুক্তি ‘বাংশোমারো অরগানিক ল’ নামে পরিচিত। মুসলিম মিন্দানাওয়ের সীমানা বৃদ্ধি এবং স্বায়ত্বশাসনের পরিধি বিস্তারের প্রশ্নে এই গণভোটের আয়োজন করা হয়।

দুই দফায় আয়োজিত গণভোটে জানতে চাওয়া হয় তারা সম্প্রসারিত মুসলিম বাংশোমারো স্বায়ত্ব শাসিত অঞ্চলের সাথে একীভূত হতে চায় কী না?

মিন্দানাওয়ে অবস্থিত ফিলিপাইনের প্রধান মসজিদ

প্রথম দফায় (২১ জানুয়ারি) ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলের মিন্দানাও, লানাও দেল সুর, বাসিলান দ্বীপপুঞ্জ, কোটাবাটো ও ইসাবেলার শহর তাওটি-তাওটি ও সুলুতে এবং দ্বিতীয় দফায় কোটাবাটোর ৬৭টি গ্রাম ও ৭টি শহরে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।
প্রথম দফায় অনুষ্ঠিত গণভোটে মুসলিম বাংশোমারোর পক্ষে বিপুল সংখ্যক ‘হ্যা’ সূচক ভোট পড়ে।

দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয় সেসব অঞ্চলে যা মুসলিম অধুষ্যিত হওয়ার পরও সেখানে বিপুল সংখ্যক অমুসলিম রয়েছে। এজন্য এসব অঞ্চল বাংশোমারোর সঙ্গে একীভূত হওয়ার জন্য দুই তৃতীয়াংশ ভোট লাভের শর্ত করা হয়। শর্তানুযায়ী ৬৭ গ্রামের মধ্যে ৬৩টি এবং ৭ শহরের ১ শহর বাংশোমারোর অন্তর্ভূক্ত হয়। কোটাবাটো সিটি হবে নতুন মুসলিম অঞ্চলের রাজধানী। যা ২১ জানুয়ারির ভোটে বাংশোমারোর সঙ্গে একীভূত হয়।

গত বৃহস্পতিবার ফিলিপাইনের নির্বাচন কমিশন গণভোটের ফলাফল ঘোষণা করেন এবং কোটাবাটোর ৬৩টি গ্রাম ও ১টি শহর মুসলিম বাংশোমারোর অংশ হতে যাচ্ছে বলে জানান। ফিলিপাইন সরকার ও জনগণ গণভোটের রায়কে স্বাগত জানিয়েছে।
গণভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে ফিলিপাইনের ৫টি প্রদেশ, ৩টি মহানগর, ১১৬টি পৌরসভা, ২৫৯০টি গ্রাম বাংশোমারোর অংশে পরিণত হয়েছে। এখন আয়তনের হিসেবে ফিলিপাইন কংগ্রেসে ৮জন মুসলিম প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পাবেন।

গণভোটের ফলাফল দেখছেন মুসলিমরা

এই গণভোটের মাধ্যমে ১৯৭০ সাল থেকে ফিলিপাইনি মুসলমানের রক্তাক্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের অবসান ঘটলো বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও ১৯৭৬ সাল থেকে নামমাত্র স্বায়ত্বশাসন ভোগ করে আসছিলো মিন্দানাওয়ের মুসলিমরা। নামে স্বায়ত্বশাসন থাকলেও কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছিলো অত্যন্ত কঠোর। এ সময় ম্যানিলা সরকারের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামীদের দমনের নামে ব্যাপকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে বারবার।

সর্বশেষ গণভোটের ফলে ফিলিপিন মুসলিমরা মিন্দানাওয়ের বাইরে সম্প্রসারিত অঞ্চলে অধিকতর স্বায়ত্বশাসনের সুযোগ লাভ করবে। কর-ট্যাক্স, খনিজ ও বৈদেশিক সম্পর্ক ছাড়া বাকি সব বিষয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে তারা। এমনকি ম্যানিলার আপত্তি না থাকলে স্বল্প পরিসরে বৈদেশিক বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে ভিনদেশি কোনো পক্ষের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে পারবে বাংশোমারো কর্তৃপক্ষ।

ইতিমধ্যে জাপানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ‘কারো কোনো’ মিন্দানাও সফর করেছেন। তিনি মোরো ইসলামিক লেবারেশন ফ্রন্টের চেয়ারম্যান মুরাদ ইবরাহিমের সঙ্গে দেখা করে বাংশোমারোর অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ আগামী দিনের অংশীদার হতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তারা ১০ ফেব্রুয়ারি মিন্দানাও-এর ডাভাও শহরে বৈঠক করেন।

গণভোটে বাংশোমারোর পক্ষে রায় দেওয়ায় জনগণকে স্বাগত জানান মুসলিম নেতারা

ধারণা করা হচ্ছে, মুসলিম বাংশোমারো অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় আইনি প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও ৩ বছর সময় লেগে যাবে। এই সময়ে ১২০ সদস্যের একটি কমিটি –যা পরে সংকুচিত করে ৮০ সদস্যে নামিয়ে আনা হবে- বাংশোমারোর সংবিধান প্রণয়নের কাজ করবে।

১২০ সদস্যের মধ্যে ৪০ জন ম্যানিলা সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাদের কাজ হলো, দেশের মূল সংবিধানের সাথে বাংশোমারোর সংবিধানের সংগতি থাকছে কি না, তা নিশ্চিত করা। বাংশোমারো ট্রাঞ্জিশন অথরিটি (বিটিএ) নামক এই বিশাল কমিটির বর্তমান চেয়ারম্যান গাজালি জাফর।

আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০২২ সালে বাংশোমারো পার্লামে্ন্ট নির্বাচনের কথা রয়েছে। তখন বাংশোমারোর জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন পার্লামেন্টের ৬০ জন সদস্য। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সদস্যরাই বাংশোমারোর জন্য একটি শরিয়াহ ভিত্তিক বিচারিক ব্যবস্থা প্রণয়ন করবেন। এদের নিয়ে গঠিত হবে মন্ত্রীসভা। বাংশোমারোর প্রধানমন্ত্রী বা সরকার প্রধানের উপাধি ‘ওয়ালি’ বা অভিভাবক। ধারণা করা হচ্ছে, মোরো ইসলালিক লিবারেশন ফ্রন্টের প্রধান হাজি মুরাদ ইবরাহিমই হবেন বাংশোমারোর প্রথম ওয়ালি।

মুসলিম বাংশোমারো কর্তৃপক্ষ আইন-শৃংখলা রক্ষায় একটি নিয়মিত বাহিনী (অসামরিক) গঠন করতে পারবে। তবে নিয়মিত বাহিনী গঠনের আগ পর্যন্ত স্বাধীনতাকামী ‘দ্য মোরো ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট’ এবং ‘মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্ট’ যৌথভাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজ করবে।

বাংশোমারো পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর ম্যানিলা সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। তবে প্রেসিডেন্ট বাংশোমারোর ‘ওয়ালি’ বা সরকার প্রধানকে বরখাস্ত করতে পারবেন এবং সরকারও ভেঙ্গে দিতে পারবেন। হ্যা, তিনি সরাসরি কেন্দ্রের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না।

মানচিত্রে বাংশোমারো

পার্লামেন্ট নির্বাচনের এখনও ৩ বছর বাকি খাকলেও বাংশোমারোর পার্লামেন্ট ভবন নির্মাণের কাজ ৯০ ভাগই শেষ। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে পার্লামেন্ট ভবনের কাজ শেষ হয়ে যাবে।

তবে এখন থেকে বাংশোমারোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের কাজ শুরু করতে চান বাংশোমারোর নেতারা। এবং তারা তা শুরুও করে দিয়েছেন। প্রথমে বাংশোমারোর শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন তারা। ইসলামি মূল্যবোধ ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে তা ঢেলে সাজাতে চান তারা।

সাথে সাথে বাংশোমারো যেন স্বতন্ত্র ইসলামি অর্থব্যবস্থা চালু করতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও আইনি সংস্কারের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট চেচিলিয়া বোরোমিওকে আহবান জানিয়েছেন তারা।

সম্প্রতি ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রাদ্রিগো দুয়ার্তে দেশের নাম পরিবর্তনে বাংশোমারো নেতাদের সমর্থন চেয়েছেন। তিনি ফিলিপাইনের নাম পরিবর্তন করে মাহারলিকা রাখতে চান (কারণ, উপনিবেশিক স্পেন রাজা ফিলিপ ২য়-এর নামানুসারে এই অঞ্চলের নাম ফিলিপাইন রাখেন) এবং এ ক্ষেত্রে বাংশোমারো নেতাদের সমর্থন প্রত্যাশা করেন।

ফিলিপাইনের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রেসিডেন্টের এই সমর্থন চাওয়া বাংশোমারোর রাজনৈতিক স্বীকৃতির সমতুল্য। অবশ্য বাংশোমারো নেতারাও দুয়ার্তের প্রস্তাবকে সমর্থন করেন। আর কেনই বা করবেন না, যখন স্পেনের হাতেই মুসলিম ফিলিপাইন স্বাধীনতা হারিয়েছিলো। পরাজিত রাজশক্তি হিসেবে ফিলিপাইনের মুসলিমরাই সবচেয়ে নির্যাতিত ছিলো স্পেনের এই উপনিবেশে।

জাপানি পররাষ্ট্র মন্ত্রী ‘কারো কোনো’র সাথে বৈঠকে মুরাদ ইবরাহিম

সাম্প্রতিক এই গণভোট অত্র অঞ্চলের মুসলিমদের মনে ব্যাপক আশার আলো সঞ্চার করেছে। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে স্থানীয় মুসলিমরা সুখ, স্বস্তি ও সমৃদ্ধ বাংশোমারোর ব্যাপারে ব্যাপক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তারা আশা করছেন, ষোলশো শতকের শেষভাগে স্পেনের হাতে স্বাধীনতা হারানোর পর থেকে তাদের অব্যাহত সংগ্রামের অবসান হবে আগামীর দিনে এবং তাদের সন্তানরা সুখী ও সমৃদ্ধ বাংশোমারোতে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবে।

সূত্র : উইকিপিডিয়া, আল জাজিরা, ফিলস্টার গ্লোবাল, ম্যানিলা বুলেটিন ও এবিসি নিউজ

পূর্ববর্তি সংবাদকাশ্মীরে ফের হামলা, ৪ ভারতীয় সেনা নিহত
পরবর্তি সংবাদরাজধানীতে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত গ্যাস থাকবে না