‘ভ্রুণ হত্যা মানুষের ভেতর হত্যার প্রবণতা বাড়ায়’

আতাউর রহমান খসরু ।।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গুতম্যাকার ইনস্টিটিউট পরিচালিত এক জরিপে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে বছরে ১১ লাখ ৯৪ হাজার স্বপ্রণোদিত গর্ভপাতের ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ, দৈনিক গড়ে এ ধরনের গর্ভপাতের সংখ্যা ৩ হাজার ২৭১টি এবং মোট গর্ভবতী নারীর ১৮ শতাংশই স্বপ্রণোদিত গর্ভপাত করান। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৪ সালে এই জরিপ করেছিল। গবেষকদের ধারণা, ৫ বছরের ব্যবধানে গর্ভপাতের হার এখন আরও বেড়েছে। স্বপ্রণোদিত গর্ভপাতের বড় অংশই অবৈধ সম্পর্ক আড়াল করতেই করা হয়।

সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ভ্রুণ হত্যা, পরিত্যাক্ত অবস্থা থেকে মানবশিশুকে উদ্ধারের খবর বৃদ্ধি পেয়েছে। জামিয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া, মুহাম্মদপুরের মুহাদ্দিস ও রিসালাতুল ইসলাম বিডি-এর প্রধান মাওলানা তাহমীদুল মাওলা মনে করেন, সন্তানের দায়িত্বগ্রহণ করতে না চাওয়া এবং সন্তানের স্বীকৃতি লাভে ব্যর্থ হয়েই প্রধানত মানুষ ভ্রুণ বা নবজাতক হত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।

তার ভাষায়, প্রাচীনকাল থেকেই দেখা গেছে মানুষ নারী-পুরুষের সম্পর্ক উপভোগ করতে চায় কিন্তু সন্তান দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করতে চায় না। তারা এটাকে বোঝা মনে করে। এটা যেমন জাহেলি যুগেও ছিলো এবং এখনও আছে। দিনদিন তা বাড়ছে। তবে এ ক্ষেত্রে যে বিষয়টি বেশি দায়ী তাহলো, বিয়ে বহির্ভূত যৌনতা। স্বীকৃতিহীন সম্পর্কের কারণে সন্তান এলে মানুষ সেই সন্তানের দায়িত্ব আরও বেশি এড়িয়ে যেতে চায়।

বিষয়টি একটু বিশ্লেষণসহ উল্লেখ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ গোলাম রব্বানী। তিনি বলেন, ভ্রুণ হত্যা বাড়ছে দুইভাবেই। বৈধভাবে (বৈধ সন্তান উদ্দেশ্য) এবং অবৈধভাবে। মানুষ নিয়ন্ত্রণহীন আবেগের কারণে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে যাচ্ছে। সন্তান চলে আসছে। প্রথম কিছুদিনের চেষ্টা থাকে সন্তানের পরিচয় উদ্ধারের। যখন তা ব্যর্থ হয় তখন হয়তো গর্ভপাত করছে বা সন্তান জন্মের পর তা কোথাও ফেলে যাচ্ছে।

এজন্য তিনি সর্বত্র নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার সুযোগকে দায়ি করেন। ‘অবাধ মেলামেশা ক্ষতিকর। যে যাই বলুক, সবচেয়ে আমি মানুষ। আমাদের স্বাভাবিক চাহিদাগুলো অস্বীকার করার মতো না। তাই অবাধ মেলামেশাই মানুষকে বিপদগামী করছে।’

মাওলানা তাহমিদুল মাওলা তার সঙ্গে যুক্ত করেন আরও কয়েকটি বিষয়। যেমন, পশ্চিমা জীবনধারার অনুসরণ, ইসলামি জীবনব্যবস্থা থেকে সরে যাওয়া, বেপর্দা চলাফেরা, অশ্লীলতা। মানুষ অবৈধ যৌনাচারে উদ্বুদ্ধ হয় এমন সবকিছুই দিনদিন বাড়ছে।

তিনি কিছুটা ক্ষোভ ও হতাশা নিয়ে বলেন, আমরা দেখছি, অবাধ ও স্বাধীন সমাজের মানুষগুলো ভালো নেই, তারা দিনদিন ভয়াবহ পরিণতির দিকে যাচ্ছে। তবুও আমরা পশ্চিমা সমাজের অনুসরণ করছি আমরা।

উল্লিখিত পরিসংখ্যানের ব্যাপারেও সংশয় প্রকাশ করেন। তার যুক্তি হলো, বাংলাদেশের মতো একটি দেশে ঘটনার কতোটুকুই বা পরিসংখ্যানে আসে? সমাজের মানুষ এখনও অবৈধ সম্পর্ক ও সন্তান লুকাতে চান।

মাওলানা তাহমিদুল মাওলা আরও বলেন, জননিয়ন্ত্রণের অনেক ব্যবস্থা থাকার পরও যদি এই পরিমাণ সন্তান বা ভ্রুণ হত্যার ঘটনা ঘটে তবে ব্যবস্থা না থাকলে কী পরিমাণ ঘটতো কল্পনা করুন।

তার কাছে প্রশ্ন ছিলো, একবিংশ শতাব্দীতে এসে মানুষের স্বাধীনতার বিষয়টি অস্বীকার করার সুযোগ আছে? তিনি বলেন, কতোটা স্বাধীনতা মানুষের জন্য কল্যাণকর তা ভাবতে হবে। আমার সন্তান স্বাধীনভাবে বেড়ে উঠুক এটা আমরা সবাই চাই। কিন্তু আবার আমরাই কিন্তু তাদের শাসন করি। এটা শুধু পরিবার না সবক্ষেত্রেই মানুষের স্বাধীনতা সীমা আছে। সুতরাং নারী-পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও স্বাধীনতার সীমা থাকতে হবে। আজ স্বাধীনতার নামে আমাদের যে পথে আহবান করা হচ্ছে তা মূলত স্বাধীনতার নামে অন্যকিছু। যেখানে স্বাধীনতা যতো বাড়ছে সেখানে অপরাধের মাত্রা ততো বাড়ছে।

তিনি আরও বলেন, পশ্চিমা সমাজে মানুষ অবাধ যৌন স্বাধীনতা ভোগ করে। অথচ যৌন সহিংসতা সেখানে অনেক বেশি। আমি নিজে রিপোর্টে পড়েছি, আমেরিকায় বছরে ১৮ লাখ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। তাহলে কী বলা যায় স্বাধীনতা মানুষকে অসভ্য ও জন্তুতেও পরিণত করতে পারে।

মাওলানা তাহমিদুল মাওলা লেখক হুমায়ুন আহমদকে উদ্ধৃত করে বলেন, আমাদের দেশের কথাশিল্পী হুমায়ুন আহমেদ তার আত্মজীবনী ‘আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই’ বইতে নিজের আমেরিকা বাসের অভিজ্ঞা লিখতে গিয়ে কিছু বিষয় উল্লেখ করেছেন, যা থেকে বোঝা যায় অবাধ স্বাধীনতা মানুষকে পশুত্বের কোন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।

লেখকের ভাষায় মানুষ স্বাধীনতার নামে পরাধীন হয়ে যাচ্ছে। যেমন, এক লোক তার মেয়েকে জবাই করে ফ্রিজে রেখে দিয়েছে; এক দম্পতি তাদের সন্তানকে হত্যা করে টুকরা টুকরা করে কুকুর দিয়ে খাইয়েছেন যেন তারা হত্যার দায় থেকে মুক্তি পান। স্বাধীনতার চূড়ান্ত পর্যায়ে মানুষের পশুত্ব কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা এসব ঘটনা থেকে বোঝা যায়।

ভ্রুণ হত্যা, গর্ভপাত ও নবজাতক হত্যার ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে মুফতি গোলাম রব্বানী বলেন, ইসলামের দৃষ্টিতে বিচার করলে, প্রথমেই বলতে হবে সম্পর্কটা বৈধ কী না? ভ্রুণ বা মানব শিশু হত্যার পেছনে অধিকাংশ সময় অবৈধ সম্পর্কই খুঁজে পাওয়া যায়। তবে সম্পর্ক বৈধ হোক বা অবৈধ গর্ভে সন্তান চলে এলে তা হত্যা করা ইসলামের দৃষ্টিতেও অপরাধ এবং রাষ্ট্রীয় আইনেও অপরাধ। দুই আইনেই তাকে হত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে দুটো জঘণ্য অপরাধ হচ্ছে, এক. সন্তান চলে আসার মতো সম্পর্কে জড়ানো, দুই. হত্যা।

মাওলানা তাহমিদুল মাওলা বিষয়টার আরেকটু পেছন থেকে শুরু করেন, ভ্রুণকে কুরআন-হাদিসে ‘জানিন’ শব্দে উল্লেখ করা হয়েছে। শরিয়তে ‘জানিন’ হত্যা জঘণ্যতম অপরাধ। শরিয়ত একজন মানুষের মতোই অধিকার দিয়েছে। ধরুন! গর্ভবতী মাকে শরিয়তের বিধানে বেশ কিছু ছাড় দেওয়া হয়েছে। সেটা ভ্রুণের অধিকার রক্ষার জন্য। যেমন, রোজা না রাখার অনুমতি।
‘শরিয়তের দৃষ্টিতে নির্দিষ্ট কয়েকটি কারণ ছাড়া ভ্রুণ হত্যা বা নষ্ট করা হারাম বা নাজায়েয। তা চার মাস পূর্ণ করলে নষ্ট করা, ফেলে দেওয়া বা হত্যা করা মানব হত্যার মতোই অপরাধ। ফিকহে ইসলামির বিশাল অংশজুড়ে ভ্রুণের অধিকার ও পরিচর্যার উপর আলোচনা রয়েছে।’

তিনি দুঃখ করে বলেন, একটা কুকুর হত্যা করা হলেও মানুষ অনেক হৈ চৈ করে। কিন্তু মানব শিশু হত্যার ব্যাপারে তারা চুপ।

ভ্রুণ হত্যার পেছনে অবৈধ সম্পর্কই অধিকাংশ ক্ষেত্রে দায়ী স্বীকার করেই তাহমিদুল মাওলা বলেন, ‘হাদিসে এসেছে, একজন মাকে তার ব্যভিচারের শাস্তি প্রয়োগ করা হয়নি সন্তানের জন্য। রাসুল সা. নিজে সেই সন্তানের দায়িত্ব অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার পর মায়ের শাস্তি বিধান কার্যকর করা হয়। সুতরাং সন্তান অবৈধ হলেও ইসলাম তাকে রক্ষার বিধান দিয়েছে। তার সুস্থ স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার দিয়েছে।’

তারা উভয়েই মনে করেন, এই অপরাধ রোধ করতে না পারলে, মানুষের রক্তের পবিত্রতা নষ্ট হয়। এক সময় সমাজ বলতে পারবে না তার কতোজন সদস্য বৈধ। আর ইসলামি আইন ও অনুশাসনই এই অবৈধ কাজ থেকে মানুষকে পরিপূর্ণভাবে বিরত রাখতে পারে।

ইসলামি আইনের কাছেই কেন ফিরে যেতে হবে তারও ব্যাখ্যা করেন তারা। তারা বলেন, ইসলাম ভ্রুণ হত্যাকে মানুষ হত্যার সমতুল্য বলেছে। কেন? কারণ, এই ভ্রুণ হত্যা মানুষের অন্তর থেকে মানুষের মর্যাদা বিলুপ্ত করে, মায়া-মমতা হ্রাস করে, হত্যার প্রবণতা তৈরি করে। দেখুন! এক সময় মাকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় ভাবা হতো, কিন্তু এখন মায়ের হাতেও অসংখ্য শিশু নিহত হচ্ছে। অর্থাৎ পৃথিবীটা ধ্বংসের কাছাকাছি চলে যাবে, সমাজ ও পরিবার ব্যবস্থা হারিয়ে যাবে। অপরাধ বেড়ে যাবে। পৃথিবীর অনিরাপদ হয়ে যাবে।

এই ক্ষেত্রে উভয় ইসলামি চিন্তাবিদ নিজ প্রস্তবনাও তুলে ধরেন। ড. মুফতি মুহাম্মদ গোলাম রব্বানী বলেন, অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। স্বাধীনতার নামে সন্তান যেন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে না যায় সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। প্রত্যেকের নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতনতা তৈরির কাজ করে যেতে হবে। চেষ্টা করলে সুফল পাওয়া যাবে বলে আমি আশাবাদী।

মাওলানা তাহমিদুল মাওলার প্রস্তাব হলো, আমাদের দায়িত্ব সন্তানের জন্য মায়ের কোলকে নিরাপদ করতে হবে। শরিয়তের বিধি-বিধানগুলো মানুষের সামনে নিয়ে আসা। ব্যাপক সচেতনতা তৈরির জন্য কাজ করতে পারি। ইসলামি সমাজ গঠনের জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারি, সমাজের দায়িত্বশীল মানুষের কাজে যথাযথ ভূমিকা প্রত্যাশা করতে পারি।বিশেষত গণমাধ্যমের সহযোগিতা অনেক বেশি প্রয়োজন।

পূর্ববর্তি সংবাদআমেরিকায় ইতিহাস গড়লেন আইনজীবী ফয়েজ শাকির
পরবর্তি সংবাদচকবাজার অগ্নিকাণ্ডে ৭০ লাশ উদ্ধার, মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে: আইজিপি