বাড়ছে ইউটিউবের প্রভাব, আলেমদের উপস্থিতি কেমন হওয়া উচিত?

আতাউর রহমান খসরু ।।

ভিডিও শেয়ারিং সাইট ‘ইউটিউব’ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচার মাধ্যমে পরিণত হচ্ছে। বর্তমানে পৃথিবীর ১৩০ কোটি মানুষ ইউটিউব ব্যবহার করেন। বছরে ৩০ মিলিয়ন মানুষ ইউটিউব দেখেন। ইন্টারনেটে নিয়মিত এমন প্রতি ১০ জনের ৬ জনই ইউটিউব দেখেন। আর ইউটিউবের মোট ভিউয়ারের প্রায় অর্ধেকই উঠতি বয়সী তরুণ ও যুবকরা।

বাংলাদেশের তরুণ-তরুণী ও যুব সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয় এই ভিডিও শেয়ারিং সাইটটি। তাই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং তার মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের জন্য অনেকেই অশ্লীল, অশালীন ও নৈতিকতা বিবর্জিত উপাদান ছড়িয়ে দিচ্ছে জনপ্রিয় এই সাইটে।
সম্প্রতি অশ্লীলতা প্রসারে অভিযোগে সালমান মুক্তাদির ও অভিনেত্রী সানাই মাহবুব সুপ্রভাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকেছেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা।

সরকারের এমন উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন, বিশিষ্ট ইসলামি আলোচক মুফতি শামসুদ্দোহা আশরাফী। তিনি বলেন, সরকার সম্প্রতি দুইজন ইউটিউবারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকেছে। তাদের বিরুদ্ধে ইউটিউবে অশ্লীল ও অশালীন ভিডিও শেয়ারের অভিযোগ রয়েছে। আমি মনে করি, এটা একটা ভালো উদ্যোগ।

তবে তার পরামর্শ হলো, এই উদ্যোগ ইউটিউবে সীমাবদ্ধ না রেখে সব সামাজিক মাধ্যমের ব্যাপারেই নেওয়া যেতে পারে এবং নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হতে পারে।

তিনি দুঃখ করে বলেন, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় বিষয়ে রাষ্ট্র ও সরকার যতোটা কঠোর, ইসলাম ও মুসলমানের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকার ও রাষ্ট্র ততোটাই উদাসীন। তা কিছুতেই কাম্য হতে পারে না।

বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের সহ-সভাপতি ও জামিয়া ইসলামিয়া হোসাইনিয়া, গহরপুরের প্রিন্সিপাল হাফেজ মাওলানা মুসলেহুদ্দীন রাজুও মনে করেন, ইউটিউবের উপর সরকারের ইতিবাচক নিয়ন্ত্রণ হতে পারে। কারণ, বর্তমান সময়ে ইউটিউবের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। এক সময় এদিকে মানুষের তেমন আগ্রহ ছিলো না। যেহেতু মানুষের আগ্রহ বাড়ছে, তাই সমাজ ও রাষ্ট্রের অভিভাবকদেরও এদিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। যেন মানুষ বিপথে চলে না যায়।

তিনি ইউটিউবের প্রভাব তুলে ধরে বলেন, এক সময় ধর্মীয় ভাবাপন্ন পরিবারগুলো খুব সহজেই গান-বাদ্য ও হারাম বিনোদন থেকে বেঁচে থাকতে পারতো। কারণ, টেলিভিশন ছিলো একমাত্র হারাম বিনোদন উপকরণ। এখন ইউটিউবের মতো সাইটগুলো টেলিভিশনের অভাব দূর করে দিচ্ছে। দ্বীনদার অভিভাবকরা সন্তানদের এসব থেকে চাইলেও ফেরাতে পারছেন না।

মুফতি শামসুদ্দোহা আশরাফীও ইউটিউবের অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে তার প্রস্তাব হলো, আমরা যেহেতু মানুষকে ফেরাতে পারছি না তাই আমাদের উচিৎ তাদের জন্য ভালো কিছু প্রস্তুত করা। তার ভাষায়, ইউটিউবে মানুষ আসছে এবং আসবে। আমরা যদি সেখানে ভালো কিছু না দেই, তবে মানুষ ভালো থেকে বঞ্চিত হবে। দ্বীনি বিভিন্ন বিষয়ে গোছালো আলোচনা, আমাদের সামাজিক ও দ্বীনি খেদমত, দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় বিষয়ে আলোচনা দেওয়া যেতে পারে ইউটিউবে।

ইউটিউবকে দ্বীন প্রচারের মাধ্যম হিসেবে কেন গ্রহণ করতে চান? তার উত্তরে তিনি বলেন, এখন মানুষ কোনো বিষয়ে জানার জন্য যে কয়েকটি জায়গায় যায় তার মধ্যে ইউটিউব অন্যতম। এখানে রান্না-বান্না থেকে শুরু করে প্রযুক্তির জটিল জটিল বিষয়ে টিউটরিয়াল আছে। যা থেকে মানুষ শিখছে, উপকৃত হচ্ছে। তাহলে মানুষ ইসলাম সম্পর্কে জানতে পারবে না কেন? অন্যান্য মুসলিম দেশের উলামায়ে কেরাম ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে দ্বীন ও দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে কাজ করছেন। আরব বিশ্বের উলামায়ে কেরাম এ ক্ষেত্রে এগিয়ে। ভারত-পাকিস্তানের উলামায়ে কেরামের দ্বীনি আলোচনাও ইউটিউবে পাওয়া যায়।

মাওলানা মুসলেহুদ্দীন রাজু এই ক্ষেত্রে একটু রক্ষণশীল মনোভব পোষণ করেন। তার কথা হলো, ইউটিউবে ভালো উপাদানের চেয়ে মন্দ উপাদনই বেশি এবং অন্যায় ব্যবহারই বেশি। ইউটিউবের প্রতি নেশাগ্রস্থও হয়ে পড়ছেন অনেকে। আমি এমন মানুষের কথাও জানি, যার সারা রাত কাটে ইউটিউবে। তাই সার্বিক বিবেচনায় আমার মনে হয়, ইউটিউবের প্রতি উৎসাহী হয় এমন কাজ আমাদের করা উচিৎ নয়। যদিও সেখানে জ্ঞান ও শিক্ষার অনেক উপকরণ বিদ্যমান আছে। পৃথিবীর বিখ্যাত বিখ্যাত মনীষীর বক্তব্যও সেখানে শোনা যায়।

তিনি তার ভয়ের দিকগুলো তুলে ধরেন, আমাদের ছেলেদের মধ্যে যারা ইউটিউবে কাজ করছেন তাদের অনেকে ভালো কাজ করলেও বড় একটি অংশই ইসলাম, শরিয়ত ও ইসলামি মূল্যবোধের ব্যাপারে সঠিক ধারণা না নিয়েই কাজ শুরু করেছে। ফলে তাদের দ্বারা মৌলিক অনেক বিচ্যূতিও হচ্ছে।

অবশ্য এমন সমস্যা হচ্ছে বলেও স্বীকার করে নেন মুফতি শামসুদ্দোহা আশরাফী। তিনি বলেন, অনেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও নির্দেশনা ছাড়াও ইউটিউবে তৎপর হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা বিভ্রান্তিও ছড়াচ্ছে। সেটা রোধ করার খুব বেশি সুযোগ আমাদের হাতে নেই। এ ক্ষেত্রে আমাদের উদ্যোগ ও তৎপরতা বাড়ানো যেতে পারে। তাতে মানুষ সঠিক বিষয়টিও পাবে। তার প্রভাবও পড়বে।

তিনি আরও বলেন, ইসলামের নামে বিভিন্ন গ্রুপ -যাদের অনেক কিছুই শুদ্ধ না- শিক্ষিত সমাজ ও তরুণদের মাঝে আপনি তাদের ব্যাপক প্রভাব দেখতে পাবেন।

ইসলামের পক্ষে ইউটিউবে যারা কাজ করতে চান তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে মাওলানা মুসলেহুদ্দীন রাজু বলেন, ইসলামের অনুসারীদের অভ্যন্তরীণ বিতর্ক ইউটিউবে না করাই ভালো। কারণ, একদিকে অমুসলিমদের সমালোচনার সুযোগ বাড়ে, অন্যদিকে আমাদের (আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাত) আয়োজন, প্রস্তুতি এবং অনেক ক্ষেত্রে সামর্থ্যও অনেক সীমিত। এতে আমাদের ব্যাপারে মানুষের ভুল ধারণা তৈরি হবে। ঘরোয়া বিতর্ক পরিহার করে আমরা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার প্রসারের চেষ্টা করতে পারি, ইসলামের প্রকাশ্য শত্রু -এমন অমুসলিমদের তৎপরতার ব্যাপারে সচেতনতা তৈরির জন্য কাজ করতে পারি।

পূর্ববর্তি সংবাদবেগম জিয়াকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে নেয়া হচ্ছে
পরবর্তি সংবাদশেষবেলার বইমেলা: সুখ-দুঃখের কড়চা