আবরার আবদুল্লাহ ।।
অমর একুশে বইমেলায় ইসলামি ধারার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতি নিয়ে পাঠক-দর্শকদের অভিযোগ বেশ পুরাতন। কিন্তু আশার কথা হলো, মেলায় ইসলামি ধারার লেখকদের উপস্থিতি বাড়ছে দিনদিন। প্রতি বছরই বাড়ছে তাদের উপস্থিতি। এর বড় অংশই তরুণ। তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ায় আশাবাদী অগ্রজরাও। তারা আশা করছেন, এক সময় হয়তো ইসলামি ধারার তরুণদের প্রতিনিধিত্ব অস্বীকার করার সুযোগ থাকবে না কথিত প্রগতিশীলদের।
ইসলাম টাইমস-এর সম্পাদক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ তরুণ লেখকদের এই পথযাত্রাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, তরুণদের এই সূচনা এবং একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়াই অভিনন্দনযোগ্য। তাদের আজকের এই প্রচেষ্টা তাদেরকে আগামীদিনের আরও দীনদীপ্ত কোনো সোনালী সময়ে পৌঁছে দেবে ইনশাআল্লাহ!
অমর একুশে বইমেলা ২০১৯-এ ইসলামি ধারার বেশ কয়েকজন তরুণের বই প্রকাশিত হয়েছে। এসব বইয়ের যেমন রয়েছে ছড়া-গল্প-কবিতা তেমন আছে প্রবন্ধ-উপন্যাস ও সিরাতগ্রন্থ। এবারের বইমেলায় প্রকাশিত তরুণ লেখকদের কয়েকটি বইয়ের পরিচিতি তুলে ধরা হলো।
তানভীর এনায়েত-এর কাসিদায়ে আফরিঁ
তানভীর এনায়েত সত্ত্বায় একজন শিল্পী। তার শিল্পের কারুকাজ কখনও প্রকাশ পায় রঙ-তুলির রেখায় আর কখনও প্রকাশ পায় কালি-কলমের লেখায়। তরুণ এই শিল্পী ও কবির প্রথম কাব্য গ্রন্থ ‘কাসিদায়ে আফরিঁ’ প্রকাশিত হয়েছে কালো থেকে।
কাসিদায়ে আফরিঁ-তে রয়েছে ছন্দ, তাল, লয় ও বিষয়ের বৈচিত্র। তার লেখায় স্থান পেয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহ, মানবের প্রতি মমতা, মানবিকতা, মৃত্যুচিন্তা, বিরহ ও কাতরতা। আবার আছে স্রষ্টার প্রেমে আশ্রয় ও তওবার সওগাত লাভের প্রার্থনা। সবমিলিয়ে কাসিদায়ে আফরিঁকে লেখকের কাব্যভূবনের একটি স্থিরচিত্রই বলা যায়।
রোকন রাইয়ান-এর দুই বই
এক সময়ের ছড়াকার, এখনকার পুরোদস্তুর সাংবাদিক রোকন রাইয়ানের গল্প লেখার হাত যে মোটেও কাঁচা না তার প্রমাণ তিনি বিভিন্ন সময়ে দিয়েছেন। এবারের বইমেলায় তার ভ্যারাইটি গল্পের বাহার নিয়ে এসেছে ‘ভ্যারাইটিজ স্টোর’ গল্পগ্রন্থ। সামাজিক নানা অনুষঙ্গকে উপজীব্য করে লেখা তার ১৮টি গল্প ও অণুগল্প। লেখক এসব গল্পে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অনাচার এবং ধর্মের আড়ালে অধর্মচর্চার মুখোশ উন্মোচনের চেষ্টা করেছেন। বইটি প্রকাশ করেছে সাহস পাবলিকেশন্স।
এছাড়াও ‘লাইফ সাপোর্ট’ আত্মোন্নয়নমূলক একটি প্রবন্ধের বইও প্রকাশ করেছে বুক শেলফ। এ বইয়ে তিনি চলমান দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে সাফল্যের পথ দেখিয়েছেন। জীবন কিভাবে দামি হয়, হতাশার মোড়ক থেকে বের করে সোনালি পালকে যুক্ত করা যায় তারই দৃশ্যায়ন করেছেন লেখক।
সাব্বির জাদিদ-এর ভাঙনের দিন
গল্প-উপন্যাসে ক্রমেই হাত পাঁকিয়ে নিচ্ছেন কুষ্টিয়ায় ছেলে সাব্বির জাদিদ। দেশের মূলধারার সংবাদপত্রের সাহিত্যপাতায়ও স্থান পাচ্ছে তার গল্পগুলো। এবারের বইমেলায় ঐতিহ্য থেকে প্রকাশিত হয়েছে তার উপন্যাস গ্রন্থ ভাঙনের দিন।
উপন্যাসে লেখক পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থা মানুষের জীবন ও সমাজকে কীভাবে বদলে দিচ্ছে তা দেখানোর চেষ্টা করেছেন। লেখক সাব্বির জাদিদ যেমন জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির উৎকর্ষ দেখিয়েছেন, তেমনি স্পষ্ট করেছেন পৃথিবীর পতনের ধারা, সামাজিক দ্বন্দ্ব ও বিভক্তি।
পঞ্চাশ তরুণের সংসার ‘তারুণ্যের গল্পমালা’
ইসলামি ধারার পঞ্চাশ তরুণের গল্প নিয়ে একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে ‘তারুণ্যের গল্পমালা’। বইটির সযত্ন সম্পাদনায় ছিলেন মাসিক পত্রিকা ‘ইসলামী বার্তা’র নির্বাহী সম্পাদক এমদাদুল হক তাসনিম এবং সাহিত্য সাময়িকী ‘প্রতিভা’র সম্পাদক উবায়দুল হক খান। প্রকাশ করছে ‘প্রহর প্রকাশন’।
ভিন্ন ভিন্ন লেখকের প্রতিটি গল্পেরই আছে নিজস্ব স্বাদ, দৃষ্টিভঙ্গি ও পাঠকের প্রতি বার্তা। আছে ভালোলাগা ও নেওয়ার মতো অনেক কিছু।
বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে অগ্রজ লেখক মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন, শরীফ মুহাম্মদ, মাওলানা মুহাম্মদ মুফীজুল ইসলাম, মুহাম্মদ আতীক উল্লাহ ও রশীদ জামীলকে।
নকীব মাহমুদ-এর মুস্তফা
‘মুস্তফা’ অদ্ভূত মধুমাখা এক নাম। যে নামের শোভা, সৌন্দর্য্য ও সম্মোহনী শক্তির কোনো তুলনা হয় না। তাই এ নাম ও নামের চর্চা পৃথিবী থেকে মুছে যাবে না কোনো দিন। বরং প্রতি যুগে তা চর্চিত হবে নতুন আঙিকে, নতুন ভঙিতে, নতুন কোনো শৈল্পিক রূপে।
নবী মুহাম্মদ সা.-এর সিরাতচর্চায় নতুন মাত্রা যোগ করার চেষ্টা করেছেন তরুণ লেখক নকীব মাহমুদ। গল্গে গল্পে এঁকেছেন নবীজীবনের চিত্র। পুরো বইজুড়ে আছে ভালোবাসা আর যত্নের ছাপ। একজন তরুণের হাতে হলেও সিরাতচর্চায় এটি একটি মূল্যবান সংযোজন হয়ে থাকবে। মুস্তফা বইটির প্রকাশক বাংলার প্রকাশন।
ওমর শাহ-এর যে জীবন আসমানের
‘যে জীবন আসমানের’ নান্দনিক নামে প্রবন্ধ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তরুণ লেখক ও সাংবাদিক ওমর শাহ-এর। মূল্যবান এই প্রবন্ধ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে লেখকের চল্লিশটি প্রবন্ধ। যাতে তিনি সমকালীন প্রয়োজন ও সংকটগুলোর সাবলীল ভাষায় ইসলামি সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
‘যে জীবন আসমানে’র বইয়ে স্থান পাওয়া প্রবন্ধের মধ্যে রয়েছে, ঈমানের সম্পদে সাজাও জীবন!, মন এক দেহঘরি, মনের ঘরে শান্তি পেতে, যিকিরে আত্মার শান্তি, সমালোচনা থেকে আত্মসমালোচনাই উত্তম, মন রাখুন ইতিবাচক, ঘরের দেয়ালে চিত্রশিল্প : কী বলে ইসলাম, কবিতা আবৃত্তি হারাম নয়, ভ্রমণে খুঁজুন স্রষ্টাকে মতো প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে।
একুশে গ্রন্থমেলায় বইটি পরিবেশন করেছে বাংলার প্রকাশন।
মাহমুদুল হক জালীস-এর স্বর্গীয় গন্দম
`স্বর্গীয় গন্দম’ নামেই ছড়িয়ে আছে কবিতার মৌ মৌ গন্ধ। আর এই গন্ধের কারিগর তরুণ কবি মাহমুদুল হক জালীস। মেলায় গন্ধ ছড়ানোর আয়োজন করেছে ঘাঁসফুল। বইয়ের কবিতাগুলোয় রয়েছে আমাদের যাপিত জটিল জীবনের সরল রেখাপাত। সহজ বর্ণবুননে যেন আমাদের জীবনের গল্পগুলো বলেছেন তরুণ এই কবি।
শাহনূর শাহীন-এর হামসাফার
শাহনূর শাহীন মূলত একজন ছড়াকার। কিন্তু তিনি যে গদ্যও লিখতে জানেন তারই জানান দিলেন ‘হামসাফার’-এর মতো মস্ত এক উপন্যাস লিখে। রোমান্টিক উপন্যাস হলেও শাহনূর শাহীন বইটি লেখার সময় তার সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা ভুলে যাননি। ভুলেননি সমাজচিত্র তুলে ধরে তা থেকে পাঠককে সবক দিতে। সাথে সাথে পারিবারিক জীবনের মাধুর্য ও জটিলতাগুলো স্পষ্ট করেছেন লেখক। সামাজিক উপন্যাস ‘হামসাফার’ প্রকাশ করেছে বাড কম্প্রিন্ট।
যেসব বইয়ের আলোচনা আমাদের সামনে এসেছে এবং যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে তাদের বইয়ের আলোচনাই এখানে স্থান পেয়েছে। নতুবা ইসলামি ধারার তরুণদের আরও কিছু বই একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে বলে জানতে পেরেছি।
















