নেতা ও গণমাধ্যমের মিথ্যাচার গুরুতর: বিশিষ্ট আলেমদের চোখে

আতাউর রহমান খসরু ।।

হ্যা, আমি এখন ফার্মগেট আছি। আর বিশ মিনিট লাগবে আসতে। মোবাইল ফোনে জনৈক ব্যক্তিকে নিজের অবস্থানের কথা জানাচ্ছিলেন একজন বাসযাত্রী। তার পাশের সিটে বসা অপর যাত্রী এই ফোনালাপ শুনে মুচকি হাসলেন। আলাপকারীও ফোন রেখে মুচকি হাসলেন। তাদের দুইজনেরই এই হাসির রহস্য ‘মিথ্যা’। কারণ, গুলিস্তানগামী বাস এখনও মহাখালী পার হয়নি। বাসযাত্রীর এই মিথ্যাচারটি আরও দুয়েকজন শুনলেও কারো ভেতর কোনো প্রতিক্রিয়া হয়নি। যেন এ আর ব্যতিক্রম কি?

তাহলে কী মিথ্যার প্রতি ঘৃণাবোধ এবং সামাজিক প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি লোপ পাচ্ছে আমাদের ভেতর থেকে? মিথ্যায় অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে সমাজ?

দেশের বিশিষ্ট আলেম ও জামিয়া ইসলামিয়া লালমাটিয়া, ঢাকার প্রিন্সিপাল হাফেজ মাওলানা ফারুক আহমদ মনে করেন, সমাজে মিথ্যার বিস্তার ও চর্চা বেড়ে যাওয়ায় মানুষ মিথ্যায় অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। ফলে তারা যেমন মিথ্যা বলতে দ্বিধা করছে না, তেমনি মিথ্যা শুনে তার প্রতিবাদ করারও প্রয়োজনবোধ করছে না। প্রয়োজন ও অপ্রয়োজনে মানুষ মিথ্যা বলে, যার সঙ্গে বলছে সেও বিষয়গুলো মেনে নিচ্ছে।

তিনি মনে করেন, মানুষের ভেতর আল্লাহর ভয় ও তাকওয়া না থাকার কারণে অকপটে মিথ্যা বলে যাচ্ছে। হাদিসে এসেছে, ‘সবকিছুর মূল আল্লাহর ভয়’। আল্লাহর ভয় নেই এর অর্থ হলো পরকালীন জবাবদিহির চিন্তা না থাকা।

টঙ্গী দারুল উলুম মাদরাসার প্রিন্সিপাল মুফতি মাসউদুল করীম এর সঙ্গে নৈতিকতা ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া, দুনিয়ার মোহ বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি যোগ করেন। তিনি বলেন, নৈতিক মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণে মিথ্যা বলার পর মানুষের ভেতর অপরাধবোধ কাজ করে না। অন্যদিকে সামান্য স্বার্থসিদ্ধির জন্য মানুষ মিথ্যা বলছে। কারণ, সে পরকালের চেয়ে ইহকালকে বড় করে দেখছে।

তিনি মিথ্যার পরিণতি তুলে ধরে বলেন, ইসলামের মৌলিক একটি শিক্ষা হলো মিথ্যা পরিহার করা। রাসুল সা. মিথ্যাকে চরমভাবে ঘৃণা করতেন। হাদিসে এসেছে, যখন কোনো মানুষ মিথ্যা বলে তার মুখ থেকে এমন দুর্গন্ধ বের হয় যে ফেরেশতা মাইল পরিমাণ দূরে সরে যায়।মিথ্যার উপর যার ভিত্তি হবে তার পরিণতি ভয়াবহ। মিথ্যার মাধ্যমে অর্জিত বিষয়টিও মন্দ ফলাফল বয়ে আনে।

সমাজে মিথ্যার চর্চা বেড়ে যাওয়ার পেছনে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের মিথ্যাচারকেও দায়ী মনে করেন এই দুই আলেম। মাওলানা ফারুক আহমদ বলেন, মিথ্যার পাপ সবার জন্যই সমান। তবে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ও অনুসরণীয় ব্যক্তির মিথ্যাচার সমাজ ও রাষ্ট্রকে অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে। এতে মানুষের ভেতর অপরাধবোধ লোপ পায়।

আর মুফতি মাসউদুল করীম বলেন, বড়দের কাছ থেকে ছোটরা শেখে। যেখানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা মিথ্যা বলে এবং মিথ্যাকে সত্য বলে প্র্রচার করে সে সমাজে মিথ্যার সয়লাব হবে এটাই স্বাভাবিক।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, গত শুক্রবার (১ মার্চ) একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত বিবৃতিতে একজন মন্ত্রী বলেন, সিটি নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে প্রচণ্ড ভীড় ছিলো। ঠিক তার নিচেই এক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয় ভোটকেন্দ্রগুলো ভোটারশূন্য ছিলো। নির্বাচন কমিশন বিষয়টি স্বীকার করেছে এবং তারা বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিবোধ করছে বলেও জানিয়েছে। তাহলে বলুন, জাতি কী শিখবে?

সমাজ মিথ্যাচারে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার পেছনে কিছু কিছু গণমাধ্যমেরও দায় আছে বলে মনে করেন এই আলেম। তার মতে, কিছু কিছু গণমাধ্যম স্বার্থ রক্ষার জন্য মিথ্যার প্রচার করে এবং সেটা তারা সচেতনভাবেই করে। জাতি তাদের মিথ্যাচার সম্পর্কে অবগত জানার পরও তারা মিথ্যা প্রচার করে যায়। আবার এক শ্রেণির মানুষ মিথ্যা বলাকে পাপ মনে করে। কিন্তু তার প্রচার ও লেখাকে পাপ মনে করে না। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ মিথ্যা শুনতে শুনতে এবং তা পড়তে পড়তে মিথ্যায় অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে।

মাওলানা ফারুক আহমদও বিষয়টিকে গুরুতর বলে আখ্যা দেন। তার ভাষায়, গণমাধ্যমের মিথ্যাচার গুরুতর। কারণ, তা মানুষের ভেতর ভুল চিন্তার বিস্তার ঘটায়। জেনে বুঝে মিথ্যার প্রচার করলে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

উভয় আলেম চান সমাজ ও জাতি এই ক্ষতিকর প্রবণতা থেকে বের হয়ে আসুক। কেননা, এই প্রবণতা অত্যন্ত ক্ষতিকর। কোনো সমাজে এই প্রবণতা তৈরি হলে পুরো সমাজের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়ে।

মুফতি মাসউদুল করীম মিথ্যাচার ও মিথ্যার প্রবণতা থেকে বের হওয়ার উপায়ও বলে দেন। তিনি বলেন, মানুষের ভেতর থেকে দুনিয়ার মোহ, স্বার্থচিন্তা ও অন্ধ আনুগত্য বের করতে না পারলে মিথ্যাচার রোধ করা যাবে না। আর সেটা করা সম্ভব হবে মিথ্যাচারের ব্যাপারে সমাজের সব পর্যায়ে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা হলে। এর ভয়াবহতা তুলে ধরলে।

পূর্ববর্তি সংবাদসেনাবাহিনী এ দেশের সম্পদ ও বিশ্বাসের মূর্ত প্রতীক : প্রধানমন্ত্রী
পরবর্তি সংবাদওবায়দুল কাদেরের অবস্থা সঙ্কটজনক, হাসপাতালে প্রধানমন্ত্রী