অনলাইনে থেমে নেই কাদিয়ানীদের প্রচার তৎপরতা!

আবু তাশরীফ ।।

বাহ্যিক প্রচার-প্রচারণার চেয়ে অনেক গুণ বেশি ছড়িয়ে আছে কাদিয়ানীদের অনলাইন তৎপরতা। তাদের বিশ্বব্যাপী ইংরেজি ভার্সনের একটি ওয়েবসাইটের পাশাপাশি আরবি-উর্দু ও বাংলায় ভিন্ন ভিন্ন ওয়েবসাইট রয়েছে। স্বতন্ত্র লোক নিয়োগ করে তারা এ বিষয়ক কার্যক্রম চালিয়ে থাকে। মিথ্যা নবুওয়তের দাবিদার মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীকে ‘নবী’ প্রমাণের জন্য অনলাইনে নানামুখি প্রচারণা তারা চালিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমাদের সঙ্গে গভীর সখ্য রক্ষাকারী কাদিয়ানীরা বিভিন্ন মুসলিম দেশেও পর্দার আড়ালে থেকে ঈমানবিধ্বংসী মিথ্যা `নবুওয়তের’ পক্ষে জনমত সংগ্রহের চেষ্টা করে যাচ্ছে। প্রশাসনের অসচেতনতার কারণে মুসলিম দেশগুলোতেও কোনো রকম বাধার মুখোমুখি তাদের হতে হচ্ছে না।

কাদিয়ানীদের তৎপরতা বিষয়ে খোঁজখবর রাখা আলেম-দাঈ মাওলানা আবু সালমানের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। কাদিয়ানীদের বিস্তৃত ও অশঙ্কাজনক অনলাইন তৎপরতার একটি খতরনাক চিত্র তার আলাপে ফুটে উঠেছে।

কাদিয়ানীদের প্রচার কৌশল সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ঢাকার একজন আলেম জানান, ইংরেজি, বাংলা আরবি ও উর্দুতে কাদিয়ানীরা স্বতন্ত্র ওয়েবসাইট পরিচালনা করে। তাদের একটি টিভি চ্যানেলও আছে। ওটার আবার ইউটিউব একাউন্টও আছে। আন্তর্জাতিকভাবে কাদিয়ানীদের যে ইংরেজি ভার্সনের ওয়েবসাইটটি রয়েছে, সেটির নাম ও স্পেলিং এতটাই ‘নিরীহ’ ও প্রতারণাপূর্ণ যে, যেকোনো মানুষ ইসলাম সম্পর্কে জানতে প্রাথমিকভাবে সার্চ দিলে সেই সাইটের নাম কোনো না কোনোভাবে সামনে চলে আসে। এতে বহু মানুষ প্রতারিত হয়। অনেক মুসলমানও তাদের বক্তব্য-ভাষ্যে প্রথম পর্যায়ে প্রতারণার শিকার হয়ে যায়।

কাদিয়ানীদের অনলাইন তৎপরতার নানা ধরন উল্লেখ করে ওই আলেম বলেন, ইংরেজি, উর্দু ও বাংলা ভিডিও ভাষ্যসহ লেখা কন্টেট প্রায় প্রতিটি কাদিয়ানী সাইটে ভরে আছে। সেইসব সাইটের যুক্তি ও ভাষ্যগুলো অনুসরণ করে বিভিন্ন দেশে তাদের প্রচারকর্মীরা ফেসবুক-ব্লগে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী যুক্তিতর্কে নেমে যায়। অনলাইনের মাধ্যমে যেখানে সুযোগ পায়- সেখানেই নিজেদের ভ্রান্তিকর বক্তব্য সাঁটিয়ে দেয়। ফেসবুকের কিছু একাউন্ট থেকেও তাদের বক্তব্য তারা মিশনের অংশ হিসেবে ছড়িয়ে দেয়। বিভিন্ন ওয়েবসাইটের ফেসবুক পাতায় তারা খতমে নবুওয়তের সত্যতা কিংবা কাদিয়ানীদের মিথ্যাচার বিষয়ক কোনো লেখা বা রিপোর্ট দেখলেই নিচে কমেন্ট করতে চলে আসে। নিজেদের বক্তব্য সেখানে সংযুক্ত করে দেয়। জানা যায়, ফেসবুক-ইউটিউব ও বিভিন্ন ভার্চুয়াল দেয়ালে কমেন্ট করে কাদিয়ানীদের বক্তব্য প্রচারের জন্য তাদের আলাদা লোকই নিয়োগ করা আছে।

কাদিয়ানী কারা? পাঞ্জাবের মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর অনুসারীদের পরিচিতিই হলো- কাদিয়ানী। তারা নিজেদের পরিচিয় দেয় ‘আহমদিয়া মুসলিম জামাত’ নামে। গোলাম আহমদ কাদিয়ানীর জন্ম পাঞ্জাবের গুরুদাসপুরে। সে নিজেকে মাসিহ, ঈসা এবং শেষ পর্যায়ে ‘নবী’ হিসেবে দাবি করেছে। তার অনুসারীরাও তাকে ‘নবী’ হিসেবে মান্য করে থাকে।

ইসলামের শ্বাশত বিশ্বাস ও আকীদা হচ্ছে হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হচ্ছেন শেষ নবী। তার পরে দুনিয়াতে আর কোনো নবী আসবে না। যে বা যারা শেষ নবীর পরও নতুন করে নবুওয়তের দাবি করবে এবং যারা সে দাবি বিশ্বাস করবে তারা হবে কাফের-অমুসলিম। পবিত্র কোরআনের আয়াত ও হাদীস শরীফের দলিলে সমৃদ্ধ এই সিদ্ধান্তটির বিষয়ে ইসলামের সূচনা থেকে আজ পর্যন্ত ইসলামের সব চিন্তা ও দর্শনের বিশেষজ্ঞরা একমত। কাদিয়ানীদের অমুসলিম হওয়ার বিষয়ে মুসলমানদের কোনো অংশের মধ্যেই কোনো দ্বিমত নেই।

মাওলানা আবু সালমান জানান, কাদিয়ানীরা তাদের অনলাইন প্রচারনায় বিশেষভাবে কয়েকটি বিষয়ে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করে থাকে। এক. তারা বলে থাকে- মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পরও নবুওয়ত জারি আছে। দুই. ঈসা (আ.) মৃত এবং ঈসা হচ্ছেন কাদিয়ানী । তিন. এসব বিষয়ে কুরআন-হাদীসের স্পষ্ট আলোচনার অপব্যাখ্যা ও খণ্ডন।

মাওলানা আবু সালমান বলেন, ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় এ কাজগুলো কাদিয়ানীরা করে থাকে। তারা চতুরতার সাথে নবুওয়তকে ৩টি ভাগে ভাগ করে উপস্থাপন করে এবং দাবি করে- এক হচ্ছে, শরীয়তবাহী নবী, দুই. শরীয়তবিহীন সরাসরি নবী, তিন শরীয়তবিহীন আনুগত্যের মাধ্যমে নবী। কাদিয়ানীদের দাবি হচ্ছে- তৃতীয় প্রকার নবুওয়তের দরজা খোলা আছে। গোলাম আহমদ কাদিয়ানী সেই তৃতীয় প্রকার নবী (নাউযুবিল্লাহ)। তারা তাদের বানানো এই তৃতীয় প্রকারের ‘নবুওয়ত পাওয়া নবী’কে বলে বুরুজী নবী- যিল্লি নবী। (প্রতিবিম্ব নবী- ছায়া নবী)।

কিন্তু কোরআন ও হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী নবুওয়তের এ জাতীয় প্রকার বানানোর কিংবা শেষ নবী (সা.)-এর পরে দুনিয়াতে কোনো রকম নবী আসার সম্ভাবনার কোনোই সুযোগ নেই। এটা চূড়ান্ত পর্যায়ের ভণ্ডামি, মিথ্যাচার ও প্রতারণা।

মাওলানা আবু সালমানের তথ্য হলো, কাদিয়ানীরা সব সময় তাদের কথিত ‘নবী’ মির্জা কাদিয়ানীর জীবনী নিয়ে আলোচনা করতে নিরুৎসাহী। অত্যন্ত ঘৃণিত ও চরিত্রহীন ব্যক্তিত্ব ছিল মির্জা কাদিয়ানীর। কাদিয়ানীরা তাদের ‘নবীর’ জীবনের অন্ধকার দিক আড়াল করতেই ‘যিল্লি নবুওয়ত’ ও ‘মৃত ঈসা’ বিষয়ে আরোপিত ভুয়া বিতর্কের সূত্রপাত ঘটায়। কিন্তু সরলপ্রাণ বহু মানুষ তাদের অনলাইন প্রচারণায় প্রাথমিকভাবে ধোঁকায় পড়ে যায়। অনেকে তাদেরকে ইসলামের আওতাভুক্ত একটা ফেরকা মনে করে বসে থাকে। অথচ কাদিয়ানীদের বিশ্বাস সম্পূর্ণভাবে ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, ইসলামের মূলে কুঠারাঘাতের শামিল।

তিনি বলেন, কাদিয়ানীরা প্রকাশ্য মিটিং-প্রোগ্রামের চেয়ে অনলাইন তৎপরতায় বেশি সক্রিয়। এ জন্য অনলাইনে কাদিয়ানী তৎপরতার মুখোশ খুলে দিতে এবং সঠিক যুক্তিটি তুলে ধরতে মুসলিমদের পক্ষেও সক্রিয় ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একদল মানুষের অংশগ্রহণ খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। অনলাইনে কাদিয়ানীদের উসকে দেওয়া বিতর্ক কিংবা মিথ্যাচারের জবাব অনলাইনে চালিয়ে যেতে হবে। তা না হলে দীনের গভীর জ্ঞান না থাকা অনলাইনে বিচরণশীল সরল শিক্ষিত বহু মুসলিম তাদের ফাঁদের শিকার হয়ে যেতে পারেন।

এক প্রশ্নের জবাবে মাওলানা আবু সালমান জানান, কাদিয়ানীদের বিস্তৃত অনলাইন তৎপরতা সম্পর্কে দেশের খুব কম সংখ্যক আলেমই জানেন। যারা কিছু কাজ এ বিষয়ে করেন- শুধু তারাই কিছু জানেন। বাকিরা একদম অন্ধকারে। অথচ অনলাইন তৎপরতার ফাঁদে ফেলে বহু মুসলমানের খতমে নবুওয়ত বিষয়ক আকীদা ধ্বংস করার প্রোগ্রাম চলছে । কাদিয়ানীদের অনলাইন ফাঁদ থেকে মুসলমানদের বাঁচতে হলে অনলাইনে নিমগ্ন সংঘবদ্ধ ও প্রশিক্ষিত কিছু খতমে নবুওয়তের সৈনিক দরকার। এ অঙ্গনটাই এখন কাদিয়ানীদের জন্য সবচেয়ে ফাঁকা ময়দান। তারা একপক্ষ হয়ে লড়ে যাচ্ছে এবং সম্পূর্ণ ঈমানবিধ্বংসী কথাবার্তা ছড়িয়ে যাচ্ছে। কাদিয়ানীদের খন্ডন ও খতমে নবুওয়তের দাওয়াতের সঙ্গে জড়িত দাঈ-আলেমদের এ অঙ্গনটির দিকে মনোযোগ দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

পূর্ববর্তি সংবাদবাংলাদেশ-নেপাল দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি স্বাক্ষর
পরবর্তি সংবাদপুলওয়ামায় নিহত ভারতীয় সেনা-পরিবারকে ১১০ কোটি রুপি দেবেন মুসলিম ব্যবসায়ী!